ভ্যালেরিয়া ইস্যুতে প্রশ্নবিদ্ধ ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৯, ০৩:১২ এএম

নদী পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে গিয়ে এল সালভাদরের অস্কার আলবার্তো মার্টিনেজ (২৫) ও তার ২৪ মাসের মেয়ে অ্যাঞ্জি ভ্যালেরিয়ার মৃত্যুতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত অভিবাসন নীতি। এই নীতির প্রভাব পড়েছে দেশটিতে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের ওপর। দীর্ঘ সময় ধরে গ্রিন কার্ডের আশায় দেশটিতে থাকা বাংলাদেশিরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে কর্মক্ষেত্রে যাচ্ছেন না। এমনকি পরিচিতজনরাও তাদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। দুই সপ্তাহের জন্য অভিযান বন্ধ থাকার পরও গত ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রবাসী আহমেদ হোসেনের বহিষ্কারের ঘটনায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী কয়েক বাংলাদেশি এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। এদিকে ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির ওপর অসন্তোষ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আপিল আদালতে বিবৃতি পাঠিয়েছেন আশ্রয় কর্মকর্তারা। তাদের হয়ে ৩৭ পৃষ্ঠার নথিটি পাঠায় একটি শ্রমিক ইউনিয়ন।

গত সোমবার নিউইয়র্কে অভিবাসন ইস্যুতে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিও ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করেন বলে গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটন পোস্টসহ কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ করা হয়। পেলোসি অভিযোগ করেন, অভিবাসন ইস্যুতে ট্রাম্পের নীতি মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্টকে আমি বলেছি, আমার পাঁচ ছেলেমেয়ে, ৯ নাতি-নাতনি। পারিবারিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার নীতি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। পারিবারিক পুনর্মিলন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মূল্যবোধ। এ থেকে ব্যত্যয় ঘটলে তা হবে অনুচিত কাজ।’ তিনি বলেন, ‘রিপাবলিকান অনেক প্রেসিডেন্টই অভিবাসীদের পক্ষে কাজ করেছেন। যেমন রোনাল্ড রিগ্যান। কিন্তু ট্রাম্প সবদিক থেকেই ব্যতিক্রম। অভিবাসন ইস্যুতে রাজনৈতিক ফায়দা লুটছেন তিনি।’

হাউজের স্পিকার বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই করে যাচ্ছেন ডেমোক্র্যাটরা। যুক্তরাষ্ট্রে সবাই বসবাস করতে পারে। সব অভিবাসীরই সেই অধিকার রয়েছে। সংবিধান সবাইকে সেই অধিকার দিয়েছে। সীমান্তে বর্তমান পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা দেওয়া জরুরি বলে মনে করি।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কাগজপত্রবিহীন অভিবাসীদের ধরতে ২৩ জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে চিরুনি অভিযান শুরু করার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করেন ট্রাম্প। কিন্তু স্থগিতাদেশের মধ্যেই বাংলাদেশি আহমেদ হোসেনের বহিষ্কারাদেশ দেওয়া হয়। বহিষ্কারাদেশ নিয়ে আদালতে হাজিরা দিতে গেলে গত ১৮ জুন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট তাকে বহিষ্কার করে। তিনি ৩০ বছর ধরে দেশটিতে বসবাস করে আসছেন।

আদালতের দ্বারস্থ মার্কিন আশ্রয় কর্মকর্তারা : অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জোর করে মেক্সিকোতে রাখতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রয় কর্মকর্তারা। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মসূচি স্থগিত করতে স্থানীয় সময় বুধবার তারা কেন্দ্রীয় আপিল আদালতকে তাগিদ দিয়েছেন। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সীমান্তে অভিবাসনপ্রত্যাশী বাবা-মেয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করেছে বিভিন্ন মহল। সেই নীতি বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তারা বলেন, এর মাধ্যমে অভিবাসীদের জীবন হুমকিতে ফেলা হয়েছে। এটি ‘মূলগতভাবে আমাদের দেশের নৈতিক গঠনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’।

ওই আশ্রয় কর্মকর্তারা এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের মাইগ্রেন্ট প্রটেকশন প্রটোকলসের (এমপিপি) সমালোচনা করেছেন। এ কর্মসূচির মাধ্যমে জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ১২ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীকে মেক্সিকোতে পাঠানো হয়েছে। নতুন নীতির মাধ্যমে অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে আসা ঠেকানো হয়েছে। যদিও তাদের আশ্রয়ের বিষয়টি এখনো সুরাহা হয়নি আদালতে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আমেরিকান ফেডারেশন অব গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ লোকাল ১৯২৪ নামের সংগঠনটি বলেছে, ট্রাম্পের নীতি আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থীদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীত। তাদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে থেকে নিজ দেশে নিপীড়িত মানুষের জন্য আশ্রয়স্থল ছিল যুক্তরাষ্ট্র। আদালতে জমা দেওয়া নথিতে তারা আরও বলেছে, অভিবাসন নীতির মাধ্যমে শপথ নেওয়া কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক ও কেন্দ্রীয় আইনের ‘নির্বিচার লঙ্ঘনে’ বাধ্য করা হচ্ছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আশ্রয় ও শরণার্থী কর্মকর্তা হওয়ার সময় এমনটি করার কথা ছিল না তাদের।

আশ্রয় কর্মকর্তাসহ মার্কিন কেন্দ্রীয় সরকারের আড়াই হাজার কর্মীর এই ইউনিয়ন ক্যালিফোর্নিয়ার নাইনথ সার্কিট আপিল আদালতে ৩৭ পৃষ্ঠার আবেদনে বলে, ‘ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়প্রত্যাশীদের নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দিতে দায়িত্বগতভাবেই বাধ্য আশ্রয় কর্মকর্তারা। তাদের বিভাগীয় এমন নির্দেশনার প্রতি সম্মান দেখাতে বাধ্য করা উচিত নয়, যা আমাদের দেশের নৈতিক গঠন এবং আমাদের আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আইনি বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, আগের নীতি অনুযায়ী, অভিবাসন প্রক্রিয়া ঝুলে থাকা অবস্থায় আশ্রয়প্রত্যাশীরা যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে পারত।

ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির ব্যাপক সমালোচনা করেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির আইনপ্রণেতা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। চলতি বছরের এপ্রিলে সান ফ্রান্সিসকোর কেন্দ্রীয় জেলা জজ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিজ দেশে পাঠানোর বিধান বাতিল করে দেন। তবে আপিলের পর নাইনথ সার্কিট আপিল আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেয়। অন্যদিকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বিষয়টি সুরাহার জন্য আদালতকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত মাসে আগের আদেশের সময়সীমা বাড়িয়েছে আপিল আদালত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত