বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন

সরকারি ব্যয়ের ৭% করে স্থানীয় সরকার

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৯, ০৩:৪২ এএম

বাংলাদেশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হতে গেলে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের মতো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন জরুরি বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির ওপর সংস্থাটির পরিচালিত এক সমীক্ষায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের পক্ষে ‘লোকাল গভর্নমেন্ট পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক এ সমীক্ষা করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সমীক্ষাটি করা হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে সমীক্ষা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। ওই অনুষ্ঠানের অতিথিরাও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, আইনকানুন থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরতা থাকায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে নাগরিকরাও কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না। এসব প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে তারা সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণের পরামর্শ দিয়েছেন।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের ব্যয়ের ৭ শতাংশ ব্যয় করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ ব্যয়ের গড় ১৯ শতাংশ। আর শিল্পোন্নত দেশগুলোতে সরকারের ব্যয়ের গড়ে ২৮ শতাংশ ব্যয় হয় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। এ থেকে প্রমাণিত হয় বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি।

অনুষ্ঠানে সমীক্ষা প্রতিবেদনের সারাংশ তুলে ধরেন পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের বার্ষিক বাজেট থাকলেও তার ব্যবস্থা বেশ দুর্বল। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাজেট থাকে না। বাজেটের পরামর্শ ব্যবস্থাও দুর্বল এবং তার কোনো দালিলিক ভিত্তি থাকে না। বাজেট প্রক্রিয়ার কোনো কার্যকর মূল্যায়নও হয় না। বাজেট বাস্তবায়নে অনেক অনিশ্চয়তা থাকে। এর অন্যতম কারণ নিজস্ব রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা ও দুর্বল কর আদায় প্রক্রিয়া। এ ছাড়া সরকার যে অর্থ সরবরাহ করে তাতে অনেক সময় লেগে যায়। অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ার কারণেও অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হয়। কেনাকাটা প্রক্রিয়াতেও অনেক দুর্বলতা রয়েছে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের লেনদেনের দালিলিক প্রমাণ সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করে। কিন্তু কাজটি এখনো হাতেকলমে হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের হিসাব (অ্যাকাউন্টিং) জাতীয়ভাবে অনুসরণ করা আইবাস প্লাস প্লাস পদ্ধতিতে হয় না। যে কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর অডিটে নানা ধরনের আপত্তি ওঠে, যা নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় লেগে যায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অর্থ ব্যয়ের পর্যাপ্ত ক্ষমতা না থাকায় বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সেবাও সীমিত পর্যায়ের। এর অন্যতম কারণ সম্পদের দুর্বলতা। কর্মী ও দক্ষতার অভাবও রয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোতে। সম্প্রতি স্থানীয় সরকারের আয় বেড়েছে। বিভিন্ন ধরনের ফি ও চার্জ বৃদ্ধি করায় স্থানীয় সরকারের আয় বাড়ছে।

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, উন্নয়নের জন্য প্রশাসনিক ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো জনসেবার মাত্র ১০ শতাংশ দিয়ে থাকে। আর ৯০ শতাংশ সেবা দেয় কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ফলে জনগণেরও স্থানীয় সরকারের প্রতি প্রত্যাশ ও দায়িত্ববোধ দুটোই কম। স্থানীয় সরকারের সেবা বাড়ানো হলেই জনগণও তাদেরকে রাজস্ব দিতে আগ্রহী হবে। এজন্য বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই। তবে সরকার এরই মধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, আরও কাজ করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর দানদান চ্যান বলেন, বিশ্বব্যাপী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণকে মৌলিক সেবা দেওয়ার কাজ করছে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করছে এসব প্রতিষ্ঠান। এজন্য প্রশাসনিক ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ দরকার।

পিআরআইয়ের ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমেদের সঞ্চালনায় এতে আরও বক্তব্য দেন আইজিসি বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা সুলতান হাফিজ রহমান, স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব বেগম রোকসানা কাদের ও বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট মোহাম্মদ রিয়াজউদ্দিন চৌধুরী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত