জাতীয় দলে কোচের বেতন ছিল না

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৯, ১১:৫১ পিএম

এখনো বিকেএসপি আমাদের খেলা শেখার প্রধান কেন্দ্র। এখানে প্রথম থেকে টানা সাড়ে ১০ বছর ক্রিকেট কোচ, বাংলাদেশের চারটি পেসার হান্ট কার্যক্রমের উদ্যেক্তা ও প্রধান কোচ, বাংলাদেশের প্রথম টেষ্ট কোচ; দুর্জয়, সাকিবের মূল শিক্ষক সরোয়ার ইমরান। তার ক্রিকেট জীবন বর্ণিল। সেটিই তার ভাষায় কথা বলে লিখেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন অভীক সারওয়ার

ততদিনে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে লেখাপড়া শেষ। সরকারি কর্মচারী বাবা অবসরে যাবেন, আজিমপুর কলোনির পুরনো বিরাট বাসা ধরে রাখতে তিনি আমায় সরকারি চাকরির জন্য চাপ দিচ্ছেন। আমি খেলা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারছি না এই অবস্থায় ‘পাতিয়ালা স্কলারশিপ’র বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল। পাঞ্জাব ও হরিয়ানার রাজধানী ‘চ-িগড়ের রাজা’ কপিল দেব ভারতকে সে বছর ১৯৮৩ সালে বিশ্বকাপের স্বাদ এনে দিয়েছেন। ফার্স্ট বোলিং ও ক্রিকেট কোচিং শিখব বলে পত্রিকায় দেখে আবেদন করলাম। পাঁচ বছর প্রথম বিভাগ লিগে খেলার অভিজ্ঞতা, লেখাপড়ার সনদ জমা দিলাম। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে মামা, চাচা না থাকলে এ বৃত্তি তখন পাওয়া যেত না, খেলোয়াড় বলে আমার জন্য পরিবারের কেউ বলবে নাÑ এ অবস্থায় আবেদন করলাম। ন্যাশনাল স্পোর্টস কাউন্সিল (এনসিসি)’র সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা শামসুল হক সাহেব খেলার বৃত্তান্ত ও শিক্ষাগত যোগ্যতায় জোর সুপারিশ করলেন। ক্রিকেট থেকে একমাত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ভারতের পাঞ্জাব গেলাম। ফুটবলে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড় গোবিন্দদা, মোহামেডান ও পরে বিকেএসপি কোচ, কৃতী ফুটবলার জসিম উদ্দিন জোসি, জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার বিজয়ী ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড অ্যাথলিট, ক্রীড়া সংগঠক, কোচ ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বিচারক শামীমা সাত্তার মিমুও এই দলে ছিলেন। ১৭টি খেলার ওপর ভারত সরকার বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয় ও কলেজের পড়ার জন্য বৃত্তিটি দিয়েছিলেন। আমরা মোট ১০ জন। জিমনাসটিকসে ৩, সুইমিং, হকিতে ১, ক্রিকেটে আমি, ফুটবলে দুইজন, আরও দুটি খেলা ছিল। স্পোর্টস সায়েন্সের বায়োমেকানিকস, স্পোর্টস সাইকোলজি ইত্যাদি পড়ে ‘লেভেল ১’ কোচিং করলাম। হাতে-কলমে, বৈজ্ঞানিকভাবে ক্রিকেট কোচিং শেখা হলো। ১৯৮৪ সাল পাঞ্জাবেই কাটল। ক্রিকেটের গণজোয়ার দেখে, কপিলের অবিশ^াস্য সম্মান জেনে ক্রিকেটার তৈরি করতে হবে, আমাদেরও বিশ^কাপ আনতে হবে বোধ হলো। বাড়িও মেনে নিয়েছে। বড় ভাই তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর পদের কর্মকর্তা, মেজ ভাই ব্যাংকার। শুরু হলো প্রধান জীবন। কোচ ও ক্রিকেটার হিসেবে আবার গুলশান ইয়ুথে যোগ দিলাম। অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের ক্রিকেট কোচ হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু হলো। ১৯৮৫-’৮৬ মৌসুমে গুলশান ইয়ুথে ছিলাম। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত খেলার মৌসুমে ঢাকার প্রিমিয়ার লিগ ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছি। ১৯৮৭ সালে ইসকান্দার ভাই (এখন প্রয়াত), ভালো পেস বোলার; আমার ‘গুরু’, বোলিংয়ের অনেক কিছু শিখিয়েছেন। দুই দিকে সুইং (ইন সুইং, আউট সুইং), বোলিংয়ের খুঁটিনাটি হাতে ধরে জানিয়েছেন। তখন মোবাইল ছিল না; খুঁজে পাননি বলে কয়েকবার বাসায়ও গিয়েছেন; পরে জেনে তাকে খুঁজেও পাইনি। দেখা হলো। বললেন, ‘তোমাকে রকিবুল ভাই (হাসান) খুঁজছেন। মোহামেডান ক্লাবে গিয়ে দেখা করো।’ চমকে গেলাম। পাকিস্তান আমলে তাদের দলের বাঙালি হিসেবে সুযোগ পাওয়া, জাতীয় দলের কিংবদন্তি খেলোয়াড় কেন আমাকে ডাকছেন? বলেই বসলাম, ‘কী ব্যাপার?’ ‘সাভারে গত বছর একটি স্কুল হয়েছেস বিকেএসপি মানে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ছেলেদের ক্রিকেট কোচ নেই, কোচ নেবে। তুমি চাকরি খুঁজছ; দেশে ডিপ্লোমা কোর্স করা ক্রিকেট কোচ নেই। আন্তর্জাতিক মানের কোর্স করা অভিজ্ঞ খেলোয়াড় বলে তোমার নাম বলেছি, রকিবুল ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে হয়ে যাবে।’ সাভার যাব কি যাব না ভেবে দোনমনা করলাম। দুই-তিনদিন পর মোহামেডানে গিয়ে রকিবুল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি দেখেই বললেন, ‘সারওয়ার, তুমি বিকেএসপিতে যাও।’ বাধ্য হয়ে বললাম, ‘ভাই সাভারে গিয়ে স্কুলে চাকরি করব?’ তিনি বললেন, ‘আমি বলছি, তুমি যাও।’ বাংলাদেশের বিখ্যাত ক্রীড়া সংগঠকের মুখের ওপর কথা বলতে আর সাহস হলো না। তিনি একবার দেখে বললেন, ‘তার আগে এক কাজ করো, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মর্যাদায় বিকেএসপির পরিচালক রশীদ সাহেবের সঙ্গে আমি কথা বলে রাখছি; বাসায় গিয়ে দেখা করো। এই নাও ঠিকানা; পরে বিকেএসপিতে যেও।’ দেখা করলাম। আমাকে দেখে তিনি হাতে চাঁদ পেলেন।

সাভার বাজারের পাশে বাংলাদেশের ক্রীড়া শেখার একমাত্র বিদ্যালয়। বিকেএসপি শুরু হয়েছে। জুন কী জুলাইয়ে প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে বিরাট এই সাজানো সংসার ও তাদের উপকরণগুলো দেখেই ভালো লাগল। এমন সুবিধা আমরা পেলে কোথায় চলে যেতাম! ঢাকার বাইরে চাকরি করার বাসনাই ছিল না। তবে ৩৩টি ক্রিকেট ছাত্র বেঁধে ফেলল। আমি তাদের প্রথম কোচ, বিকেএসপিরও প্রথম ক্রিকেট কোচ। সেখানে জিমনেশিয়ামের পাশে রাস্তার ওপাশে অ্যাথলেটিক ট্র্যাক। ট্র্যাকের পাশে ক্রিকেটারদের নিয়ে নেমে অনুশীলনে নামলাম। আলাদা ব্যবস্থা তখনো গড়ে ওঠেনি। ক্রিকেটের মাঠও ছিল না। এক নম্বর মাঠটি পুকুর, বর্ষাকালে মাটি ফেটে পানি ওঠে। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে পানি শুকালে মাঠ হিসেবে পাই। বাকি সময় অন্যদের মাঠে খেলি। প্রথম দিন শাটল রান, ফুটবল ইত্যাদি চর্চা করিয়ে পার করলাম। এতগুলো শিশুর মায়ায় আস্তে আস্তে বিকেএসপিতে থাকতে শুরু করলাম। শুক্রবারের ছুটিতেও ঢাকায় আসতাম না। আমার প্রথম ব্যাচের ছাত্রÑ পরে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক ও এখন সংসদ সদস্য নাঈমুর রহমান দুর্জয়, অনুপ, গৌতম, আল-আমিন, সাফ গেমসে স্বর্ণজয়ী শ্যুটার রিংকু ছিল। তাদের কেউ জাতীয় দল, কেউ ‘এ’ দল, কেউ প্রিমিয়ার লিগে খেলেছে। পরে বাংলাদেশ দলের কোচ সালাহউদ্দিন প্রথম ব্যাচে আমার ছাত্র। সাজ্জাদ আহমেদ শিপনও জাতীয় দলে খেলেছে। তাদের বন্ধু রাবিদ ইমাম এখন বিসিবির মিডিয়া ম্যানেজার। প্রিমিয়ার লিগ, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার। বাকি আরও নয়টি ব্যাচেও এমন অনেক ভালো ছাত্র পেয়েছি। সবার কথা মনে পড়ছে না বলে খুব খারাপ লাগছে। আমাদের ক্রিকেটারদের তখন এই একটিই উন্নতির ক্ষেত্র ছিল। বিসিবির তো তখন তেমন কোনো অবস্থা ছিল না, যেহেতু আমরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়মিত দেশ নই; টেস্টের যোগ্যতা অর্জন করিনি। ফলে তারা বড়জোর বছরে একবার ‘অনূর্ধ্ব ১৯’ ক্যাম্প করে ভালো খেলোয়াড়দের বাছাই করে আলাদা করত। পরে তাদের গড়ে তোলা হতো। আরও কটি ক্যাম্প তখন হতো, কিন্তু বছরজুড়ে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট শেখার একমাত্র কেন্দ্র তখন এটিই। দুঃখজনকভাবে এখনো তাই। আজকের মতো সপ্তম শ্রেণিতে ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হতো না। কেউ দশম, কেউ একাদশের ছাত্র। কাঠামো, এমনকি ভালো মাঠও ছিল না। ধীরে ধীরে সব হয়েছে। আমার ছাত্রও বেড়েছে। আল শাহরিয়ার রোকন, সাজিদ হাসান, নিয়ামুর রশীদ রাহুল জাতীয় দলে খেলেছে। রাহুল এখন ম্যাচ রেফারি। দ্বিতীয় ব্যাচের বেশির ভাগ ছেলে জাতীয় ও অনূর্ধ্ব ১৯ দলে খেলেছে। বিকেএসপিই কাঠামোগতভাবে ক্রিকেটের কাঠামোর পাশে এখন বিসিবির ঢাকাকেন্দ্রিক কাঠামো আছে। তবে বিভাগগুলোতে সেই সুবিধা নেই, সেগুলোতে ক্রিকেটের অবকাঠামো তৈরি করলে আমাদের ক্রিকেট খুব শক্তিশালী কাঠামো পাবে। আমরা বিশ^কাপ, সেরা দেশগুলোর সঙ্গে খেলছি, জিতছি বলে দেশে এখন অনেক ক্রিকেটার, তাদের সবাই ভালো খেলোয়াড় হতে চায়, জাতীয় দলে খেলতে চায়। সেজন্য যথেষ্ট সুবিধা ও অনুশীলন প্রয়োজন। বাকি সাত বিভাগেও ক্রিকেটের কারখানা থাকতে হবে।

আমার চোখে এই ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো দুর্বলতা নেই। সারা দেশ থেকে সব মেধাবীদের অনূর্ধ্ব ১৩ বছর বয়সে বেছে বিকেএসপিতে ভর্তি করা হয়। ছয় বছর শিখে তারা খেলতে যায়। বিকেএসপির কর্মকর্তা, কোচরা মানসম্পন্ন কি নাÑ সাড়ে ১০ বছর (১৯৮৭) থাকার পরও আমি বলার কেউ নই। সেখানে কাজের ভালো, খারাপ দুই অভিজ্ঞতাই হয়েছে। উপলব্ধি করেছি, কোচিং চাকরি হিসেবে নিলে বেশি দূর যাওয়া যায় না। ছেড়ে আসায় এখন কী অবস্থা জানি না। তবে শেষের দিকে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাইনি। সে সময়ের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার হাসান সাহেবের সঙ্গেই কথা কাটাকাটি হয়েছে। প্রতিষ্ঠান প্রধান হলেও তিনি সাধারণভাবে অধস্তন কর্মকর্তা, কর্মচারীদের সবাইকে চালাতেন। কাকে কীভাবে পরিচালনা করতে হয় জানতেন না। ফলে সমস্যা হয়েছে। কেন তারা সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রধান করেন, সেটি আমার চেয়ে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন। সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সিদ্ধান্তটি নেন বলে আমাদের মতো ক্রীড়াপ্রেমীদের কোনো বক্তব্য নেই।  

১৯৮৭ সালের শেষ দিকে বিকেএসপির চাকরি ছাড়লাম। ঢাকায় আসার সঙ্গে সঙ্গে বিসিবি বলল, অনূর্ধ্ব-১৩ দল পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি যাবে। তাদের কোচ হতে হবে। সেই প্রথম ভারতের কোনো টুর্নামেন্টে আমাদের কিশোররা খেলতে গেল। দীপু রায় চৌধুরী ম্যানেজার ছিলেন। খুব নিবেদিতপ্রাণ। আমরা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হলাম। এরপর কোনো চাকরি নেই বলে আবাহনী ক্রীড়া চক্রে কোচ হিসেবে যোগ দিলাম। সেই আয়ই সম্বল ছিল। ১৯৯০ সালে নিজ উদ্যোগে ইংল্যান্ডে গেলাম। লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায়, তার অফিসার কর্নেল লতিফ সাহায্য করে প্লেনের টিকিট জোগাড় করে দিয়েছেন। ‘কোচিং অ্যাওয়ার্ড কোর্স’ করলাম। মালভার্ন কলেজে দুই মাসের কোর্সে তেমন কিছু শেখা হয়নি। আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেট পাওয়া হলো। তবে লাভ হলো দেশেরÑ এক সূত্রে ভারতের ব্যাংকার দামজি হোদ্দার যোগাযোগ করলেন। তিনি তার দেশের দল নিয়ে ইংল্যান্ডে খেলতে গিয়েছিলেন। সব শুনে বললেন, বাংলাদেশ থেকে একটি দল নিয়ে ভারতে আসুন। আমরা আপনাদের পাঁচ তারকা হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে দেব, বাকি সব খরচ আপনাদের। বিদেশে খেলার সুযোগ খুব কম বলে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। ’৯০-এর ডিসেম্বর-৯১ সালের জানুয়ারি মৌসুমে তার আমন্ত্রণে ভারতের মুম্বাইয়ে গেলাম। আমাদের অনূর্ধ্ব-১৬ দলের অধিনায়ক ছিল দুর্জয়। দলে মনিরুজ্জামান মণি, শিপন ছিল। তারা সবাই পরে জাতীয় দলে খেলেছে। আমরা সেই প্রতিযোগিতায় খুব ভালো খেলেছি। মনে পড়ে, লিটল প্রিন্স শচীন টেন্ডুলকারের বিখ্যাত কোচ রমাকান্ত আচরেকারের স্কুল দলের সঙ্গে খেলা ছিল। টেন্ডুলকার তখন সবে জাতীয় দলে খেলা শুরু করেছেন। লিয়াজোঁ অফিসারকে খেলার আগে বলেছিলাম, ‘টেন্ডুলকারের কোচের সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’ দাঁড়িয়ে আছি, আচরকার তার খুদে খেলোয়াড়দের শেষ মুহূর্তের উপদেশ দিচ্ছেন। অনেকক্ষণ হলো, কিন্তু লিয়াজোঁ অফিসার তার সঙ্গে গিয়ে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। শুনলাম, তিনি দলকে বলছেন, তাড়াতাড়ি শেষ করবে; বিকেলে আবার আমরা অনুশীলন করব। খেলা কিন্তু ৫০ ওভারের। শুনেই মাথা খারাপ হয়ে গেল। অফিসারকে বললাম, ‘কথা বলার আর দরকার নেই, চলেন।’ দুপুর ২টার আগেই কিন্তু খেলা শেষ হয়ে গেল। তারা বাংলাদেশ দল (বিকেএসপি)’র কাছে সাত উইকেটে হারল। রোহান গাভাস্কারদের (সুনীল গাভাস্কারের ছেলে) দলটিকে আমরা হারিয়েছি। ইন্ডিয়ান অয়েল দলে রনজি দলের তিন-চারজন খেলোয়াড় ছিলেন। শেষ খেলায় ইন্ডিয়ান অয়েলকেও হারিয়েছি। দল নিয়ে বিদেশে গিয়ে এমন অনেক ভালো, খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে। ভারতে গিয়ে আরও দেখেছি, কলকাতায় গড়ের মাঠ, মুম্বাইতে শিবাজি পার্ক কয়েক মাইল লম্বা। একটি পর একটি পিচ; এখানে একটি; ওখানে আরেকটি ম্যাচ হচ্ছে। এই ফিল্ডার এখানে দৌড়াচ্ছে, আরেক ফিল্ডার আরেক পিচের পাশ দিয়ে বলের পেছনে ছুটছে। মাঝ দিয়ে নারী-পুরুষ খেলা দেখতে দেখতে অফিসে যাচ্ছেন; সবই চলছে। জীবনের কোনো স্বাদই থেমে নেই। এই হলো জীবনের গণতন্ত্র। তাদের ক্রিকেট বোর্ড এই পিচগুলো তৈরি করে দেয়, গ্রাউন্ডসম্যান আছে। তারা প্রতিদিন পিচ তৈরি করেন। সর্বনিম্ন হারে টাকা দিয়ে ওখানে সবাই ম্যাচ খেলেন। প্রতিদিন মাঠগুলোতে কমপক্ষে ১০-১২টি ম্যাচ হয়। আমাদের এখানে সেই সুযোগ কোথায়? তাহলে টেন্ডুলকার বা সাকিবের মাঠে খেলোয়াড় কীভাবে তৈরি হবে?

১৯৮৯ সালে ‘অনূর্ধ্ব ১৯’ দল ইংল্যান্ড গেল। মন্টু ভাই প্রধান কোচ, আমি সহকারী কোচ। তিনি মারা গেছেন। আমি যাইনি, মন্টু ভাই গিয়েছিলেন। বিকেএসপির নবম শ্রেণির দুর্জয়, অষ্টম শ্রেণির নাফিস ও অনুপ বাংলাদেশ দলে সুযোগ পেয়েছিল। দুর্জয় তখন রাজনীতি করত না। ভালো খেলত। পারফরম্যান্সই তার সব ছিল। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং মিলিয়ে ও অলরাউন্ডার। অফ স্পিনার, শক্তিশালী। মারকুটে ব্যাটসম্যান। মেধা, যোগ্যতায় জাতীয় দলের অধিনায়কও হয়েছে। সবাইকেই তো প্রশিক্ষণ দিয়েছি, কিন্তু সবাই তো দুর্জয় হতে পারেনি। সে আমার সবচেয়ে ভালো ছাত্র, খুব অনুগত ছিল।

এরপর ১৯৯১ সালে স্কলাস্টিকায় (স্কুল) যোগ দিলাম। বিকেএসপির তুলনায় পুরো আরামের চাকরি। সপ্তাহে একদিন যেতাম, বেতন পেতাম বিকেএসপির তিনগুণ। এটিই এই জীবনের মোটামুটি সচ্ছলতা ছিল। এজন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ইয়াসমিন মোরশেদকে তখনো এবং এখনো ধন্যবাদ জানাই। আমার হাত ধরে প্রথম বছর ঢাকা অঞ্চলে নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটে আমরা সেমিফাইনালে খেলেছি। উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের কাছে হেরেছি। ওই টিমে মেহরাব হোসেন অপি খেলেছে; তখন সে প্রিমিয়ার লিগের ক্রিকেটার। তখন সে কি স্কুলে পড়ে? জানি না (হাসি)। পরের বছর ফাইনালে খেলেছি। তার পরের বছর স্কুল পর্যায়ে ঢাকা ও পরে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। তখন তো স্কুল ক্রিকেট খুব জমজমাট। এখন নামও শুনি না। কারা খেলে, কখন খেলে জানতেও পারি না। তখন আট থেকে নয়শ স্কুল খেলত। স্কুল পর্যায়ে ক্রিকেট খেলাকে ছড়িয়ে দিতে পৃষ্ঠপোষক, পরিশ্রমী ও নিবেদিত কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। যখন টাকা ছিল না, কে জেড ইসলাম নির্মাণ স্কুল চালু করেছিলেন। সে প্রতিযোগিতার খেলোয়াড়রা প্রিমিয়ার লিগও খেলেছে।  ২০০৩ সাল পর্যন্ত স্কলাস্টিকায় ছিলাম। তখন স্কুল ক্রিকেটের অনেক গুরুত্ব ছিল, স্কুল ক্রিকেট নিয়ে সবাই ভাবতেন, কাজও করতেন। অনেক নামকরা খেলোয়াড় সেই ক্রিকেট থেকে তৈরি হয়েছেন। সে ধারা এখন একটু কমেছে। স্কুল ক্রিকেটের জোয়ার আর দেখি না। বিসিবি তখন স্কুল ক্রিকেট পরিচালনা করত। তারা এখন অনেক বেশি বিপিএল (বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ), জাতীয় দল কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। তারা আরও নানাকিছু নিয়ে ব্যস্ত, মূলত জাতীয় দলই তাদের প্রধান লক্ষ্য। বিপিএল তো লাগবেই ঠিক আছে। কে কোথায় ধান্দা করছেনÑ আমাদের বিষয় নয়। কোচ ও খেলোয়াড় হিসেবে আমরা দেখব বিপিএল আমাদের কী সুবিধা করে দিচ্ছে? জাতীয় দলের বাইরের খেলোয়াড়দের বিদেশের বড় খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলার সুযোগ করে দিচ্ছে। এটি বিরাট ব্যাপার; প্রতিযোগিতাও খুব কঠিন হয়। মানসম্পন্ন, আন্তর্জাতিক মানের লিগ হচ্ছে, যেখানে টিভি, রিপ্লে আছে বলে বিপিএল খেলায় ভুল কম হয়। দ্বিতীয়, তৃতীয় বিভাগ লিগে তো অনেক ভুল হয়।

এর মধ্যে বিসিবির সঙ্গে অনেক কাজ করেছি। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ আইসিসি জিতল। আমাদের ক্রিকেটে জোয়ার এলো। ১৯৯৮ সালে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এসিসি) ট্রফিতে নেপালে অংশ নিলাম। তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান গর্ডন গ্রিনিজ (প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ডে ইত্যাদি দেশে খেলে তার মোট ৩৭ হাজার রান ও ৯২টি শতরানের ইনিংস আছে, ইংল্যান্ড জাতীয় দলের খেলার উপযুক্ত বিবেচনা করা হলেও তিনি নিজের ওয়েস্ট ইন্ডিজের টুপিই বেছে নিয়েছিলেন) প্রধান কোচ, আমি তার সহকারী কোচ। আমরা অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হলাম। ১৯৯৯ বিশ^কাপ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত বছরখানেকের বেশি গ্রিনিজের সঙ্গে ছিলাম। তারপর আর পারিনি। জাতীয় দলে কাজ করলেও বেতন ছিল না। তারপর প্রিমিয়ার লিগ আরম্ভ হওয়ার আগে বিসিবিকে বললাম, আমি তো লিগ বাদ দিয়ে জাতীয় দলের জন্য কাজ করতে পারব না; যেহেতু কোনো টাকা নেই; লিগ থেকে আমি কিছু আয় করি; ফলে বিশ^কাপের চূড়ান্ত ক্যাম্পের সময় চলে আসতে হলো। লিগে কোচিং শুরু করলাম। গর্ডনের নিজেকে উৎসর্গ করার অসম্ভব ক্ষমতা আছে। তবে প্রচ- প্রশিক্ষণ দিতেন দেখেছি। পেশাদার কোচ হিসেবে তার কাছ থেকে তেমন কিছু নিতে পারিনিÑ আমার ব্যর্থতা হতে পারে। মেশিন বল, ভেজা বলে প্রশিক্ষণ দিতেনÑ এর ভালো, মন্দ দুই-ই আছে। তখন কিন্তু বাংলাদেশ ফিল্ডিং খুব খারাপ করত। ছেলেরা তো বলকে ভয় পেত। সেই সময়ের খেলোয়াড়রা আরও ভালো বলতে পারবে। ২০০০ সালের মেতে মাসে প্রিমিয়ার লিগে আমাদের আবাহনী চ্যাম্পিয়ন হলো। এডি বারলো (ষাটের দশকের বিশ^মানের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার) হঠাৎ অসুস্থ হলেন; বাংলাদেশের কোচ লাগবে; মে’তে এশিয়া কাপ, বৃষ্টিতে হবে; যেহেতু আবাহনী চ্যাম্পিয়ন, আমাকে কোচ বানিয়ে দেওয়া হলো। কোচ হিসেবে বেতন ছিল না। আবাহনীর কোচ হিসেবে কত পেতাম মনে নেই। তবে আগের চেয়ে এখন কোচের জীবন ভালো। আমাদের সময় তো কোনো পয়সাই ছিল না। আবাহনী, প্রিমিয়ার লিগের দলের কোচদের কিছু টাকা ছিল। অনেক নয়, অনেক কমই ছিল। তারপরও লেগে থাকার কারণÑ আমাকে তো কিছু করতে হবে, এটি তো নেশা।

বারলো’র পর কোচ হয়ে এলাম। ভারতের সঙ্গে আমরা ২৫২ রান করলাম। আড়াইশর বেশি রান করা বিরাট কিছু। ম্যাচটি জিততে পারিনি। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে নকআউট ওয়ার্ল্ড কাপ (এখন চ্যাম্পিয়নস ট্রফি) খেলতে আমরা কেনিয়াতে গেলাম। অনুশীলন ম্যাচে কেনিয়াকে হারালাম। শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে গেলাম। প্রথম খেলায় ইংল্যান্ডের কাছে ৫ উইকেটে হেরে গেলাম। কেনিয়া, জিম্বাবুয়ের মতো দেশ এক সময় আমাদের প্রবল প্রতিপক্ষ ছিল। এখন পিছিয়ে গেছে। হয়তো তাদের কাঠামো, খেলোয়াড় তৈরি হয়ে আসছে না। খেলোয়াড় ভালোভাবে তৈরি করতে না পারলে আমরাও আস্তে আস্তে হারিয়ে যাব। স্কুল, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট; কোচ, ফিজিও, সাইকোলজিস্ট, কম্পিউটার অ্যানালিস্ট, সৎভাবে খেলোয়াড় নির্বাচন সবই থাকতে হবে। আমাদের সুবিধাগুলো আরও ভালো করতে হবে। বয়সভিত্তিক দলগুলোর নির্দিষ্ট দুই-তিন বছরের কোচ থাকতে হবে। কারা খেলোয়াড় তৈরি করছেন, ভালো বা খারাপ কোচ, কীভাবে খেলোয়াড় তৈরি করতে হবেÑ সব বোঝার জন্য সময় তো দিতে হবে। আমাদের চারটি বয়সভিত্তিক দল, বিভাগ, জেলা সব জায়গাতেই কোচ, প্রতিযোগিতা থাকতে হবে। কোচদের সম্মান, সম্মানী, সুবিধা, পৃষ্ঠপোষকতা সবই দিতে হবে। তাহলে সব হবে। এখন হয়তো তিন থেকে ছয় মাসে কোচ বদলাচ্ছে। এই অবস্থায় থাকা যাবে না। আমাদের দেশেই তো কোচ তৈরি হচ্ছেন। ফিজিও, বোলিং, ব্যাটিং, ফিল্ডিংয়ে আলাদা কোচ, বিশেষজ্ঞ, ডাক্তার লাগবে। সাধারণ কোচ দিয়ে ভালো দল তৈরি হয় না। ক্রিকেটে তো আমরা আর গরিব নেই। আমাদের বোর্ডের পয়সা আছে। অন্য দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলেও আমরা খেলাটিতে এখন ধনী। অন্যান্য দেশের তুলনায় যদিও খেলায় পয়সা কম। বিশ^কাপে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে লড়াই করলে তাদের মানের বেতন তো খেলোয়াড়দের দিতেই হবে।

কেনিয়ার পর আমরা বাংলাদেশ থেকে গেলাম দক্ষিণ আফ্রিকায়। চার দিনের টেস্ট ও তিনটি একদিনের ম্যাচ খেলে ফিরলাম। এরপর বাংলাদেশ দলের প্রথম টেস্টে কে কোচ হবেন এই নিয়ে দীপু চৌধুরী ও আমার মধ্যে অনেক আলোচনা হলো। আমাদের কোনো সমস্যা ছিল না। পরে আমাকে কোচ নির্বাচন করল। ২০০০ সালের নভেম্বরে প্রথম টেস্টের কোচ হলাম। ভারতের সঙ্গে খেললাম। তখন আমিই কোচ, ট্রেইনার দক্ষিণ আফ্রিকার গ্যাভিন। আমার কাজ ছিল সাধারণ কোচিং, অনেকটাই তত্ত্বাবধায়কের কাজ।
২০০১ সালে বাংলাদেশের বিদেশি কোচ হয়ে অস্ট্রেলিয়ার ট্রেভর চ্যাপেল (১৯৯৬ সালে শ্রীলঙ্কা দলের ফিল্ডিং কোচ) এলেন। তার সহকারী হলাম। নেমে গেলাম না, আমাকে নামিয়ে দেওয়া হলো। কারণ বিসিবির তো বিদেশি কোচ দরকার। আমি কী পারি নাÑসেটি জানি না। তবে মনে হয়, সেই পদে কাজের সামর্থ্য ছিল। জাতীয় দলে আমার ছাত্ররাÑ আকরাম, দুর্জয়, অপি, গোল্লা, শান্ত, বিকাশ, মঞ্জু, রফিক, সুমন ভালো বলতে পারবে। বিশেষ কোচ বিশেষ কাজ করেন। সামান্য একটু টিউনিংয়ে অনেক কিছু হয়, সেই বয়সে অনেক কিছু বদলানোর সুযোগ, প্রয়োজন নেই। চ্যাপেলের সহকারী হিসেবে মূলত বোলিং দেখেছি। প্রথমে তো ব্যাটিংয়ে এক্সপার্ট ছিলাম। সেই দিকেই কোচিং করাতাম। পরে আমাকে বোলিংয়ে বিশেষজ্ঞ বানানো হলো। অস্ট্রেলিয়ান ট্রেভর নামকরা, তিন ভাই, খেলোয়াড় হিসেবে অস্ট্রেলিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছে (উইকিপিডিয়া বলছেÑ তারা অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক ভিক রিচার্ডসনের নাতি, ট্রেভর ইয়ান ও জর্জ চ্যাপেলের ভাই), ব্রাডম্যানের পরিবারের সঙ্গে লড়াই করা একমাত্র পরিবার। ট্রেভরের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। ফিল্ডিংয়ে খুব দক্ষ, প্রচ- একরোখা। কোনোকিছুর ধার ধারতেন না। মেজাজ এত কড়া যে তার কোচিং করানো খুব কঠিন। একবার বিকেএসপিতে আমরা ক্যাম্পে দুইজন দুটি দলে ফিল্ডিং করাচ্ছি। দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। তিনি ফিল্ডিং করাচ্ছেনই। আমার চেয়ে বয়সে বড় হলেও তার শারীরিক, মানসিক সক্ষমতা অনেক। তারপরও গরমে মাঠে মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। চেয়ারে বসিয়ে আমরা পানি ঢেলে তাকে সুস্থ করলাম। আবার ফিল্ডিংয়ে এলেন। আমরা সবাই মানা করছি, তারপরও কাজ থামাননি। আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। ২০০১ সালে ‘লেভেল টু কোচিং’ পাস করতে অস্ট্রেলিয়া গেলাম। তিনিই সাহায্য করেছেন। তার দেশের ক্রিকেটাররা আসলে বিজ্ঞান এত বোঝেন না। তবে তাদের ক্রিকেট লেভেল-১, ২, ৩ কোচিংয়ের মাধ্যমে অনেক এগিয়েছে। বিজ্ঞান এসেছে। ক্রিকেটে বিজ্ঞান অনেক পরে এসেছে, অস্ট্রেলিয়ানরাই এনেছে। ক্রিকেটে যে বায়োমেকানিকস, স্পোর্টস সায়েন্স, স্পোর্টস মেডিসিন আছে সবই তাদের আনা

। ইংল্যান্ডও বিজ্ঞানের এই শাখাগুলো নিয়ে অনেক ভাবছে। বায়োমেকানিকস খেলোয়াড় ও কোচদের আঘাতের হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। কম শক্তিতে ভালো ফল আনতে সাহায্য করে। প্রতিভাও কিন্তু প্রয়োজন। কোচ দুই রকমÑ হাই টেক ও হাই টাচ। হাই টেক কোচরা কম্পিউটার নিয়ে বসেন, সব নিয়মে বাঁধা; তথ্যপূর্ণ। প্রতিটি মুভমেন্টের তথ্য দিতে পারবেন। হাই টাচ কোচরা কষ্ট, ভালোবাসা, পরিশ্রমে খেলোয়াড় তৈরি করেন। শীর্ষ মানে গেলে দুই ধরনের কোচ খুব দরকার হয়। দুইটির সংমিশ্রণ লাগবে। ট্রেভরকে বিসিবি রাখেনি। ডেভ হোয়াটমোর (শ্রীলঙ্কার বিশ^কাপজয়ী কোচ, জিম্বাবুয়ের বরখাস্ত, এখন ভারতের কেরালার কোচ) এলেনÑ তিনি হাই টাচ কোচ। তখন কিছুদিন ছিলাম। এরপর ক্রিকেট বোর্ডের অনেক কাজ হলো। এইচপি স্কোয়াড হচ্ছিল। ২০০৩ সালে এ দলের সঙ্গে পাকিস্তান গেলাম। সেখানে অনেক মাঠ দেখেছি। পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণির খেলায় যোগ দিয়েছি। তাদের তাগড়া সব পেস বোলার। তাদের কোনো কাঠামো নেই। প্রথম শ্রেণির প্রতিটি দলের বিরাট মাঠ, ব্যায়ামাগার, অ্যাকাডেমি, ড্রেসিংরুম সব আছে। প্রথম শ্রেণির দলগুলোÑ হাবিব, ইউনাইটেড ব্যাংক, কাস্টমসÑ সবার আলাদা মাঠে গিয়েছি। তাদের সুইমিংপুল দেখেছি। হাবিব, ইউনাইটেড ব্যাংকের অ্যাস্ট্রোটার্ফও দেখেছি। তাদের সুইমিংপুল আছে। প্রত্যেকটি প্রথম শ্রেণির খেলা দলের আলাদা প্রশিক্ষণ সুবিধা আছে। পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণির লিগ, খেলার প্রতিযোগিতার মান সমান ভালো থাকে না। ২০০৪ সালে আমি ও শহীদুল আলম রতন শ্রীলঙ্কায় এইচপি (হাই পারফরমেন্স কোচিং) কোর্স করেছি। রতন এখন ইংল্যান্ডে। ২০০৫ সালে আমি, নাজমুল আবেদিন ফাহিম, রতন সিনিয়র কোচ হিসেবে বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার রিচার্ড ম্যাকিন্সের অধীনে যোগ দিলাম। কম্পিউটার অ্যানালিস্ট সবাই ছিল। আমাদের নিয়ে এইচপি কোচিং স্টাফ স্কোয়াড হলো। এই স্কোয়াডের অধীনে মুশফিক, সাকিবদের সবাইকে তৈরি করা হয়েছে। তারা তখন অনূর্ধ্ব ১৭ দলে খেলত। আমাদের এখানে যত খেলোয়াড় আছে, সবাই এইচপির অধীনে তৈরি। মাশরাফী থেকে শুরু করে সিনিয়র খেলোয়াড় খালেদ মাহমুদ সুজনও তখন ছিল। এইচপি শুরু হলো। ২০০৫ সালেই মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশকে নিয়ে শ্রীলঙ্কায় ত্রিদেশীয় প্রতিযোগিতা হলো। আমি দল নিয়ে গেলাম। আমার সহকারী ফরিদপুরের বাবু ভাই। আমরা শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। কলম্বোতে প্রতি মাইল পর পর একটি করে সুন্দর মাঠ আছে। প্রতিটি দেশের পেস অ্যাকাডেমি আছে, আমাদের নেই বলে ভালো ফার্স্ট বোলার তৈরি হচ্ছে না। কারখানা না থাকলে তো খেলোয়াড় তৈরি হয় না। যারা আছে, তাদের শোকেসে সাজিয়ে দেখালে লাভ নেই। অ্যাকাডেমিতে ১৫-২০টি ছেলে সারা বছর পেস বল করবে, নতুন বোলারও তৈরি হবে। অবশ্য শোয়েব আকতার, মাশরাফী, রুবেল হোসেন অ্যাকাডেমিতে তৈরি হয় না। আমাদের মাশরাফী, রুবেল তো জন্মগত প্রতিভা। যখন রুবেলকে আমি তুলে আনি তখন সে তৃতীয় বিভাগে খেলে। দেশে যতগুলো পেসার হান্ট হয়েছে, সব আমার করা। ২০০৫ সালে বিসিবির উদ্যোগে, গ্রামীণফোনের টাকায় পেসার হান্ট কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বোর্ডের চাকরি করি বলে তারা যেখানে আমাকে কাজ দিয়েছেন, করেছি। সেটিও আমি করেছি। পেসার হান্টের ভাবনা যতদূর জানি রিচার্ড ম্যাকিন্সের। আমাকে বলেছিলেন, এ তোমার প্রোগ্রাম। এইচপিতে পেস বোলিং দেখছি  প্রোগ্রামটি কীভাবে, কেমন করে করবে, করো। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আমরা ১৬টি ছেলেকে সংগ্রহ করে আটজনকে রেখে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। রুবেল, শুভাশিষ রায়, কামরুল ইসলাম রাব্বি জাতীয় দলে খেলেছে। তারা প্রথম ব্যাচের ছাত্র। ২০০৭ সালে পরের পেসার হান্ট হয়েছে। দুই বছর পর জমা হওয়া প্রতিভা আমরা জোগাড় করেছি। প্রতি বছর প্রতিভা অন্বেষণ করলে তো পয়সা নষ্ট হয়। এক বছরের মধ্যে ভালো পেস বোলার তৈরি হয়ে যাবে এমন আশা ঠিক নয়। পরের হান্টে আল আমিন ও তাসকিনকে (আহমেদ) পেয়েছি। এরপর রবি পেসার হান্ট ২০১৫ কী ১৬ সালে সর্বশেষ হয়েছে, আমিই করেছি।

আবার জাতীয় দল। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার টেস্ট ও একদিনের খেলায় বোলিং কোচ হয়ে দলে যোগ দিলাম। পরের বছরের পুরো সময় ছিলাম। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তখন খেলেছি। ২০১২ সালে বিসিবি চাকরি একবার ছেড়েছি। আমার নিয়োগপত্রে ছিলÑ এইচপি ও এ দলের কোচ। কিন্তু কোথাও তো ছিলাম না। কোথাও আমাকে কাজে লাগানো হয়নি। চেষ্টা করেও তাদের সঙ্গে কাজ করতে পারিনি। তারা আমার নিয়োগকর্তা, কেন কাজ দেয়নি তারা জানে। ২০১৪ সালে আবার কোচ হলামÑ ভারতের সঙ্গে তিনটি ওয়ানডে। চন্দ্রিকা হাথুরুসিংহের সহকারী। তারপর আবার আমাকে বাদ দেওয়া হলো। এ দল ও এইচপির প্রধান কোচ ছিলাম। এ দল সফরে গেলে অন্যরা গেল, যেতে না পারলেও এইচপির জন্য অপেক্ষা করলাম। নেওয়া হলো না। পরে বললাম, যেহেতু কোনো কাজে লাগছি না, বেতন দেওয়া ঠিক হচ্ছে না; পারস্পরিক সমঝোতায় চলে গেলাম। এরপর থেকে গুলশান ইয়ুথ ক্লাবসহ নানা জায়গাতে যখন যে কাজ পাচ্ছি, করছি।


আমাদের ছেলেমেয়ে নেই। ৪২ বছর ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেটে জড়িয়ে আছি। এই দেশের ক্রিকেটের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুরে মনে হয়েছেÑ এই কাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে। যাতে সব বিভাগে আন্তর্জাতিক সুবিধা ও সেবায় খেলোয়াড় তৈরি হতে পারে, তারা খেলতে পারে। সবাই ঢাকামুখী হলে ক্রিকেটের বেঁচে থাকা কঠিন। ঢাকায় অনুশীলনের জন্য এসে থাকার অসুবিধা হয়। আবার কম সুবিধায় নিজের জেলায় খেলে খেলায় বিকশিত হওয়া যায় না। খেলাকে বাঁচিয়ে রেখে কাঠামো দিয়ে বিশ^মানে নিয়ে যাওয়ার টাকা, বল আমাদের বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অনেক বেশি আছে। সব বিভাগে বিভাগীয় বোর্ড করতে হবে। ঢাকায় কেন্দ্রীয় ক্রিকেট বোর্ড থাকবে। তাতে কেন্দ্রের ক্ষমতা আমাদের মতো দেশে কমবে না। আমাদের তো কোনো ক্রিকেট মাঠই তো নেই। এখানে লোকে বলে জায়গা নেই; আসলে আমাদের অনেক জায়গা। সেগুলোতে তো বিপণিবিতান করছেন। বিপিএলের জন্য দল নেবে, ক্লাব দল করবে; কিন্তু কেউ মাঠ তৈরি করবে না, একটি পিচও তৈরি করবে না। খেলোয়াড় তৈরি, খেলোয়াড়দের অনুশীলনের জন্য কারও কোনো মৌলিক উদ্যোগ নেওয়া হবে না। খেলোয়াড়দের ভালো খেতে হয়। তাদের সক্ষমতা ও বৃদ্ধির জন্যই প্রয়োজন। আমাদের খেলোয়াড়রা কোথা থেকে আসছে? গ্রামগঞ্জ থেকে আসছে। তারা ভালো খাবার কোথায় পাবে? তাদের খাওয়াতে হবে। ওদের মতো শক্তি না হলেও আমরা তো টেকনিকে পারি, জেদে পারি।     রেকর্ড থেকে বাংলায় : ২২ জুন, ২০১৯, গুলশান ইয়ুথ ক্লাব, ঢাকা।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত