অনেক সূচকের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো হলেও বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ পরিস্থিতি খুব একটা ভালো না। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতিতে এখন যে কয়টা সংকট বিদ্যমান, তার মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ অন্যতম। সাধারণত সরকারি বিনিয়োগ বাড়লে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ার কথা। কিন্তু দেখা গেছে, সরকারি বিনিয়োগ যে পরিমাণ বেড়েছে, সে তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়েনি। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জায়গাটির উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। আমরা জানি, বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে। যেহেতু বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, সেহেতু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির তেমন কোনো সুযোগও সৃষ্টি হয়নি।
আবার এটাও সত্য যে, দেশে বিনিয়োগ কোনোভাবেই বাড়ছে না, তা নয়। তবে এ ক্ষেত্রে যে গতির দরকার, সেটা নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাথমিক হিসাবে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে বিনিয়োগ হয়েছে ৮ লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি, যা তার আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ হয়েছে ৫ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যা প্রবৃদ্ধির ১৩ শতাংশ। কিন্তু বিনিয়োগ জিডিপির ২৭-২৮ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সেই পরিমাণ লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না। ফলে বলা যায়, কাক্সিক্ষত পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়ছে না।
বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত হারে না বাড়ার কারণ মূলত অবকাঠামোগত নানা সমস্যা। যেমন উদ্যোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী শিল্প উপযোগী জমির অভাব, আবার জমির বাড়তি মূল্য, এমনকি বিভিন্ন সেবা পেতে ঘুষ কিংবা বাড়তি অর্থ ব্যয় করে লাইসেন্স গ্রহণের মতো পরিস্থিতিও অনেকাংশে দায়ী। আবার ব্যাংকের বাড়তি সুদ কিংবা নতুনদের চেয়ে পুরনোদের মধ্যে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর আগ্রহও নতুন বিনিয়োগের জন্য বড় বাধা। ফলে বিনিয়োগ কিছু শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে বিনিয়োগ পুঞ্জীভূত হওয়ার প্রমাণ বিভিন্ন সংস্থার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে লক্ষ করা যায়। যেমন ২০১১-১২ অর্থবছরে মেয়াদি ঋণের ৬২ শতাংশ ছিল বড় শিল্পে। সর্বশেষ অর্থবছরে সেটা ৭৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। পক্ষান্তরে এ ক্ষেত্রে মাঝারি শিল্পের হিস্যা ৩১ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশে নেমেছে (সূত্র : প্রথম আলো ৮/৬/২০১৯ ইং)।
আবার বিবিএসের উৎপাদনমুখী শিল্প জরিপে বলা হয়েছে, গত ৬ বছরে মাঝারি কারখানার সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে। এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বিপণন এখন এক ধরনের নেটওয়ার্কের মধ্যে চলে গেছে। যেখানে বড় বড় শিল্প উদ্যোক্তারা পুরো নেটওয়ার্ক নিজেদের মতো করে নিতে পারলেও মাঝারিদের পক্ষে সেটা সম্ভব হয় না। উল্লেখ্য, দেশের রপ্তানি আয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় পোশাক খাত। পরিসংখ্যান মতে, গত ৫ বছরে এ খাতের বড় গ্রুপগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে। কিন্তু মাঝারি ও ছোটরা তেমন একটা ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতের একটি শিল্প গ্রুপের চেয়ারম্যান কে এম রেজাউল করিম হাসনাত বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর পোশাক কারখানাগুলোকে অগ্নি ও কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এই খাতে বিনিয়োগ করতে পারলেও মাঝারি ও ছোট পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের পক্ষে সেটা করা সম্ভব হয়নি।
বাস্তবতা হচ্ছে, বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত পর্যায়ে না হওয়ায় কর্মহীন মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত বছর শ্রমশক্তি জরিপ সম্পন্ন করে তা প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৭ লাখ, যা আগের বছরের চেয়ে ১ লাখ বেশি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘এশিয়া প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০০ সালে বাংলাদেশে বেকারের হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, এ হার ২০১৭ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, তরুণ বেকারদের হার সাত বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। অর্থাৎ ২০১৭ সালে এ হার ছিল ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে একটি বড় অংশ নিষ্ক্রিয়, যারা শিক্ষায় নেই, আবার প্রশিক্ষণেও নেই। ফলে দেশের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ বেকারত্ব নিয়ে বসে বসে অলস সময় পার করছে। যাদের অনেকেই বিপথগামী হচ্ছে। এদের কেউ কেউ মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। আবার অনেকেই নিঃসঙ্গতার শিকার হয়ে পরিবারের ও রাষ্ট্রের বোঝা হচ্ছে। এ কারণে কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে সরকারকে অবশ্যই জোর দিতে হবে। যে কোনো মূল্যেই হোক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে শিক্ষিত, আধা শিক্ষিত বেকার শ্রমশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
এত প্রতিকূলতার মাঝেও স্বস্তির জায়গাটি হচ্ছে, বৈশ্বিক বিনিয়োগপ্রবাহে ভাটা পড়লেও বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ (এফডিআই) বেড়েছে। ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আঙ্কটাড) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহ বেড়েছে ৬৮ শতাংশ। যদিও এ পরিমাণ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় নগণ্য, তবুও বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। আর প্রথম অবস্থানে রয়েছে ভারত।
বিশেষ করে আগেই বলেছি, দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি বড় শিল্প গ্রুপগুলোর অনুকূলে। যাদের অনেকেই উপার্জিত অর্থ দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশে বিনিয়োগ করা কিংবা বিদেশের ব্যাংকে গচ্ছিত রাখাকেই নিরাপদ মনে করেন। ফলে কালো টাকা সাদা করার শর্তে বিনিয়োগ বাড়ানোর ঘোষণা জাতীয় বাজেটে দেওয়ার পরও কাক্সিক্ষত পরিমাণ বিনিয়োগ হয় না। উল্টো কালো টাকা বিভিন্ন কৌশলে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। ফলে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হচ্ছে না।
অতিসম্প্রতি সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের সঞ্চয় বেড়েছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশিদের মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্র্যাংক। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। এ পরিমাণ অর্থ কমপক্ষে দেশের ১২টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের সমান। অথচ মাত্র এক বছর আগে ২০১৭ সালে এ পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। এ হিসাবে সেখানে এক বছরে ১ হাজার ২৩৪ কোটি টাকার সঞ্চয় বেড়েছে। শতকরা হিসাবে যা প্রায় ২৯ শতাংশ। উল্লিখিত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, প্রতি বছরই দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। অর্থ পাচারের মতো অনৈতিক কাজ শুধু যে বাংলাদেশই হচ্ছে, তা নয়। এ প্রবণতা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ ভারতেও বেশ প্রবল।
যদিও অর্থপাচার রোধ ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে, যেমনÑ বিনিয়োগ বাড়াতে কর অবকাশ সুবিধার মেয়াদ পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ পাঁচ বছরের মধ্যে শিল্প কারখানায় বিনিয়োগ করলে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন হারে কর ছাড় দেওয়া হবে। তবে ঢাকা, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি ছাড়া অন্যত্র বিনিয়োগ করলে ১০ বছরের স্থলে ৫ বছর পর্যন্ত কর ছাড়ের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অবশ্য এ সুবিধা পেতে হলে সরকার নির্ধারিত শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগ করতে হবে। যে সব শিল্পে বিনিয়োগ করলে কর অবকাশ সুবিধা পাওয়া যাবে তার মধ্যে রয়েছেÑ অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস্ ইনগ্রেডিয়েন্ট ও রেডিও ফার্মাসিউটিক্যালস,
কৃষি যন্ত্রপাতি, অটোমেটিক ইটভাটা, অটোমোবাইল, রেজিস্টার, বাইসাইকেল, বয়লার, কম্প্রেসার, কম্পিউটার, হার্ডওয়্যার, ফার্নিচার, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, কীটনাশক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, এলইডি টিভি, দেশে উৎপাদিত ফল ও সবজি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, মোবাইল ফোন, পেট্রোকেমিক্যালস, ওষুধ, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং, টেক্সটাইল মেশিনারিজ, খেলা ও টায়ার শিল্প।
এসবের বাইরে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলার কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। যেখানে প্রায় ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। আমরাও আশাবাদী, গোটা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক জোন চালু হলে বিপুল পরিমাণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
লেখক
সাবেক ছাত্রনেতা ও কলামনিস্ট
