দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাময়িক বরখাস্ত থাকা পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরও যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন বলে জানিয়েছেন দুদকের একাধিক কর্মকর্তা। তারা বলেছেন, এনামুল বাছিরের সঙ্গে ডিআইজি মিজানের ঘুষ লেনদেনের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। পাশাপাশি অডিও রেকর্ডের দুই কণ্ঠ বাছির-মিজানের বলেও এনটিএমসির পরীক্ষায় প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফলে দুদকের তদন্তেই এনামুল বাছির অভিযুক্ত হচ্ছেন। বিষয়টি ফৌজদারি অপরাধ হওয়ায় এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হবে। এই মামলার পরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। একই কারণে তিনি স্থায়ীভাবে বরখাস্ত হতে পারেন বলেও দুদক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের মুখপাত্র প্রণব কুমার ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে (এনামুল বাছির) আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। অভিযোগের অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর সুপারিশের আলোকে কমিশন ব্যবস্থা নেবে।’
গত ২৪ জুন দুদকের মামলা পর হাইকোর্টের নির্দেশে গত সোমবার ডিআইজি মিজানকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার নিম্ন আদালতে তাকে হাজির করে জামিন আবেদন করলে তা না-মঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত। গত ২৫ জুন ডিআইজি মিজানকে সাময়িক বরখাস্তের প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মিজান-বাছির ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদক টিমের প্রধান শেখ মো. ফানাফিল্যা এরমধ্যে ইমিগ্রেশন কর্র্তৃপক্ষের কাছে লেখা চিঠিতে এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দুদক প্রধান কার্যালয়ের সাময়িক বরখাস্ত থাকা পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন ও মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগের অনুসন্ধানের সত্যতা প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।’
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এনামুল বাছির ও ডিআইজি মিজানের অভিযোগটি মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ছাড়া ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১৬৩, ১৬৪, ৪২০, ১৬৫ (ক)সহ বিভিন্ন ধারায় বর্ণিত অপরাধের মধ্যে পড়ে। কোনো সরকারি কর্মচারী দায়িত্ব পালনকালে কাউকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে ঘুষ (পারিতোষিক) নেওয়া, নেওয়ার চেষ্টা করা, বা নিতে সম্মত হওয়া সবই ১৬৩ ধারায় বর্ণিত অপরাধ। এই অপরাধে দায়ী ব্যক্তি এক বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের বিনাশ্রম কারাদণ্ডে অথবা অর্থদণ্ডে অথবা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হবে।’
বিষয়টির ব্যাখ্যা করে দুদকের একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিআইজি মিজান ও এনামুল বাছিরের অডিও রেকর্ডের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর তিনি ঘুষ নিয়েছেন কি না তার প্রমাণ প্রয়োজন হবে না। তিনি ঘুষ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, এটাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।
ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পরই গত ২৬ জুন এনামুল বাছির ও তার স্ত্রীর বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। পাশাপাশি তার স্থাবর অস্থাবর সম্পদের বিবরণী ও ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে। এনামুল বাছির গত ১ জুলাই দুদকে হাজির হওয়ার কথা ছিল। তিনি অসুস্থ মর্মে বারডেম হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রসহ সময় চেয়ে আবেদন করেছেন। তাকে ১০ জুলাই পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ডিআইজি মিজান অভিযোগ করেন, দুদকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান থেকে বাঁচতে এনামুল বাছিরকে দুই দফায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন। এমন অভিযোগ ওঠার পর অনুসন্ধানের তথ্য ফাঁস ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এনামুল বাছিরকে গত ১০ জুন সাময়িক বরখাস্ত করে দুদক। একই সঙ্গে বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য দুদক পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্যাহর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়। অনুসন্ধান কমিটি মিজান-বাছিরের ঘুষ কেলেঙ্কারির ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য ন্যাশনাল টেলিকম মনিটরিং সেন্টারে (এনটিএমসি) পাঠায়। এনটিএমসির পরীক্ষায় দুজনের কণ্ঠ মিল থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
×
