বিভিন্ন জটিলতায় গতি পাচ্ছে না ভারতীয় ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম। প্রতিবেশী দেশ থেকে তিনটি লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় পর্যায়ক্রমে ৬৮৬ কোটি ২০ লাখ ডলার সমপরিমাণ ঋণে ৪৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) দেরি ও প্রকল্প অনুমোদনে ভারতের গড়িমসিসহ বিভিন্ন কারণে এগুলোর বাস্তবায়ন গতি পাচ্ছে না। বিদ্যমান জটিলতা কাটাতে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আজ বুধবার। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ইআরডি কার্যালয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষের মধ্যে এই বৈঠক হবে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, ২০১০ সালে প্রথম এলওসির আওতায় ৮৬ কোটি ২০ লাখ ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি ছিল ভারতের। প্রতিশ্রুতির ৯ বছরে অর্থ ছাড় হয়েছে মাত্র ৫২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ১৫টি প্রকল্পের আওতায় এ অর্থ দেওয়ার কথা ছিল। ২০১০ সালের ৭ আগস্ট ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ইআরডির ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়। পরে এই এক বিলিয়ন ডলারের ঋণ থেকে ২০ কোটি ডলার অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেয় ভারত। প্রথম এলওসিতে অতিরিক্ত অর্থ হিসেবে আরও ৬ কোটি ২০ লাখ ডলার ঋণ দেয়।
দ্বিতীয় এলওসির আওতায় ভারতের দেওয়ার কথা ছিল ২০০ কোটি ডলার। কিন্তু চুক্তির আড়াই বছর পার হয়ে গেলেও কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে যেতে পারেনি। ২০১৬ সালের ৮ মার্চ এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে এ সংক্রান্ত চুক্তি সই হয়েছিল। ১৬টি প্রকল্পের অধীনে এই অর্থ ব্যয় করবে বাংলাদেশ।
একই অবস্থা তৃতীয় এলওসির অর্থায়নের প্রকল্পগুলোরও। তৃতীয় পর্যায়ে ৪৫০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা। গত বছরের ৪ অক্টোবর ভারতের সঙ্গে তৃতীয় এলওসির ঋণচুক্তি সই হয়। এখন প্রকল্পগুলো নিয়ে ভারতের সম্মতির অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে এলওসির আওতায় থাকা মোট প্রতিশ্রুত ঋণের ছাড় খুবই কম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (এশিয়া) জাহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে ঋণচুক্তি হয় প্রকল্প অনুমোদনের পর। আর ভারতীয় ঋণের চুক্তি হলেও আমাদের বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করতে পারে না। এজন্য প্রকল্প বাস্তবায়নে
যেতে দেরি হয়েছে। তবে এখন প্রকল্প অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বেশ অগ্রগতি আছে। বাস্তবায়নে গতি আসবে।’
ইআরডির ত্রিপক্ষীয় সভার জন্য তৈরি করা কার্যপত্র থেকে জানা যায়, প্রথম এলওসির তিন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। বাকি ১২টি বাস্তবায়ন শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় এলওসির ১৬ প্রকল্পের মধ্যে একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। তবে ১৩টি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পেয়েছে। দুটি প্রকল্পের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভা হয়েছে। একটির বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। জুন পর্যন্ত চারটি প্রকল্পের অধীনে বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
তৃতীয় এলওসির অর্থ ব্যয় হবে ১৬টি প্রকল্পে। এর মধ্যে দুটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। ছয়টির পিইসি সভা হয়েছে। বাকি আট প্রকল্পের ডিপিপি তৈরি করা হচ্ছে।
প্রথম এলওসি অর্থায়নের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর আওতায় ১৫ প্রকল্পের মধ্যে ৩ বছরের মধ্যে শেষ হয়েছে ৮টি। এগুলো ছিল ভারত থেকে বাস ক্রয় এবং রেলের বগি ও ইঞ্জিন ক্রয়সংক্রান্ত। এরপর আরও চারটি প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হয়। সব মিলিয়ে প্রথম এলওসির ১৫ প্রকল্পের মধ্যে শেষ হয়েছে ১২টি। গত জুন পর্যন্ত প্রথম এলওসির অর্থ ছাড় হয়েছে ৫২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। প্রথম এলওসিতে অর্থ ছাড় তার আগের বছরের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুন পর্যন্ত ছাড় হয়েছে ১১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। তার আগের অর্থবছরে ছাড় হয়েছিল ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
প্রথম এলওসিতে অবকাঠামো খাতের সবচেয়ে বড় তিন প্রকল্প এখন বাস্তবায়নাধীন। যদিও জুন পর্যন্ত এ তিন প্রকল্পে খুব বেশি অর্থ ছাড় হয়নি। এর মধ্যে খুলনা থেকে বাগেরহাটের মোংলা বন্দর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮০১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা দেবে ভারত। প্রকল্পটির ব্রিজ ও ট্র্যাক নির্মাণের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয় ২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি।
ঢাকা-টঙ্গী ডুয়েলগেজ লাইন ও টঙ্গী-জয়দেরপুর সেকশন ডুয়েলগেজ লাইন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভারত দেবে ৯০২ কোটি টাকা। অন্যটি হলো কুলাউড়া-শাহবাজপুর ডুয়েলগেজ রেললাইন প্রকল্প। ২০১৫ সালের ২৬ মে একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে সংশোধনী এনে এর ব্যয় ধরা হয় ৬৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২২ কোটি টাকা দেবে সরকার। বাকি ৫৫৬ কোটি টাকা বাংলাদেশকে ঋণ হিসেবে দেবে ভারত।
