নীতিমালা হয়নি, রেমিট্যান্সে ভর্তুকি ঈদের আগে নয়

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৯, ০৩:১০ এএম

নতুন বাজেট বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে গত সোমবার থেকে। তবে ঘোষণা অনুযায়ী প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ২ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দেওয়া এখনো শুরু হয়নি। এ বিষয়ে কোনো নীতিমালা না থাকায় ঠিক কবে থেকে ভর্তুকি দেওয়া শুরু হবে, সেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে পারেনি অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিমালা প্রণয়নে দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চললেও তা প্রণয়নের কাজ এখনো শুরু হয়নি। ১৮ জুলাই অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল চীন থেকে দেশে ফেরার পর তার সঙ্গে আলোচনা করে নীতিমালা তৈরির পর তা জারি করা হবে। তাতে চলতি মাসে প্রণোদনা দেওয়ার কোনো সুযোগ দেখছেন না কর্মকর্তারা। ঈদুল আজহার আগে প্রণোদনা দেওয়া শুরু করা যাবে কি না, তা বলতে পারেননি মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, নীতিমালা জারি করতে আগামী মাস পর্যন্ত সময়  লাগতে পারে। যেদিন নীতিমালা জারি করা হবে, সেদিন থেকেই তা কার্যকর হবে।

প্রবাসীরা সাধারণত ঈদুল আজহার আগে দেশে বেশি পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান। আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এই ঈদ হওয়ার কথা রয়েছে। কোরবানির পশু কিনতে ঈদের দুই সপ্তাহ আগে থেকেই রেমিট্যান্স পাঠানো শুরু করেন তারা। নীতিমালা জারি করে ঈদের আগেই কার্যকর করা হলে ওই সময় বাড়তি ২ শতাংশ হারে ভর্তুকি পাবেন। তবে ঈদের আগেই প্রণোদনা দেওয়া সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে বলতে পারেননি অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, আগস্টের মধ্যেই এটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে নগদ প্রণোদনা পেতে কত দিন লাগতে পারে, এমন প্রশ্নে অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। আশা করছি, নীতিমালা তৈরি করে তা আগামী মাসের মধ্যেই জারি করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের বিপরীতে শতকরা ২ টাকা প্রণোদনা দেওয়ার জন্য ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো প্রবাসী বিদেশ থেকে বৈধ চ্যানেলে ১০০ টাকা পাঠালে ব্যাংক ওই অ্যাকাউন্টধারীকে ১০২ টাকা দেবে। বাজেট ১ জুলাই থেকে কার্যকর হলেও এই প্রণোদনা কীভাবে দেওয়া হবে, তার কোনো নীতিমালা না থাকায় ঘোষণা বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামালকে নীতিমালা প্রণয়নের পরামর্শ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফিরে গিয়ে এ বিষয়ে কাজ শুরু করতে অধীন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্টের একজন কর্মকর্তা গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডেপুটি গভর্নর নির্দেশনা দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছি। এখনো লিখিতভাবে নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু হয়নি।

তিনি বলেন, প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে প্রণোদনা দেওয়ার কাজটি খুবই জটিল। কারণ, সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের প্রায় ৮০ লাখ অ্যাকাউন্টে রেমিট্যান্স আসছে। ব্যাংক ছাড়াও মানিগ্রাম, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মতো প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় বিভিন্ন এনজিও এ কাজে সম্পৃক্ত। তাই রেমিট্যান্স সংগ্রহের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যাংক, এনজিও ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মতামত নিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠান কোন পদ্ধতিতে ভর্তুকি দিতে আগ্রহী হবে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, প্রবাসীদের প্রণোদনার জন্য অর্থ বিভাগের অনুকূলে বরাদ্দ থাকা ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা নীতিমালা করার পর বাংলাদেশ ব্যাংককে দিয়ে দেওয়া হবে। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স যে ব্যাংকের মাধ্যমেই আসুক না কেন, ওই ব্যাংক তাদের স্বজনদের রেমিট্যান্সের টাকা দেওয়ার সময় প্রণোদনার ২ শতাংশ অর্থ অতিরিক্ত পরিশোধ করবে। তারপর ওই ব্যাংক প্রণোদনা বাবদ দেওয়া টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেবে।

বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রবাসীদের প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো দেশ থেকে টাকা হুন্ডি বা পাচার হয়ে রেমিট্যান্স আকারে তা আবার দেশে ফিরতে পারে। এভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে কেউ যাতে সুবিধা নিতে না পারে, সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে উপযুক্ত উপায় বের করতে বলা হয়েছে। তাই এ-সংক্রান্ত নীতিমালায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধের বিষয়গুলোও সম্পৃক্ত করা হবে। এ ছাড়া এক শ্রেণির অসাধু রপ্তানিকারক পণ্য রপ্তানির টাকা রেমিট্যান্স আকারে দেশে আনার চেষ্টা করতে পারে। সেটি যাতে করতে না পারে, সে জন্যও কৌশল নির্ধারণ করা হবে। কোন ধরনের কৌশল নেওয়া হবে তা আমাদের পরিকল্পনায় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী দেশে ফেরার পর তাদের মতামতের ভিত্তিতে তা চূড়ান্ত করা হবে। চীনে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) বার্ষিক সম্মেলন শেষে ১৮ জুলাই অর্থমন্ত্রীর দেশে ফেরার কথা রয়েছে। আর দেশটিতে চলমান ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলন শেষে প্রধানমন্ত্রী ফিরবেন ৬ জুলাই।

অর্থ বিভাগের মনিটরিং সেলের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে বিভিন্ন খাতের রপ্তানির বিপরীতে নগদ সহায়তা দিচ্ছে সরকার। সে ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা রয়েছে। ওই নীতিমালা অনুযায়ী রপ্তানি পণ্যের মূল্য দেশে আসার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রত্যয়নসহ রপ্তানিকারকদের প্রণোদনা পেতে আবেদন করতে হয়। রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে প্রত্যন্ত এলাকার গ্রাহকদের পক্ষ থেকে এ ধরনের আবেদন করা সম্ভব নয়। তাই প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের সুবিধাভোগী যখন ব্যাংক বা অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে তুলে নেবেন, তখনই যাতে কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়া প্রণোদনার অর্থ হাতে পান, সে রকম সুবিধাসহ একটি নীতিমালা করা হবে। প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হতে পারে নীতিমালায়। আর গ্রাহককে ভর্তুকি দেওয়া অর্থ প্রতি মাসে বা তিন মাস অন্তর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পরিশোধ করা হবে।

হুন্ডিকারবারিরা ব্যাংকিং চ্যানেলের চেয়ে বেশি দাম দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রবাসীদের অবৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করে। হুন্ডিকারবারিরা প্রবাসীর কর্মস্থল বা থাকার জায়গায় গিয়ে টাকা সংগ্রহ করে। আর বাংলাদেশে থাকা হুন্ডি ব্যবসায়ীরা প্রবাসীর স্বজনদের কাছে মুহূর্তের মধ্যেই টাকা পৌঁছে দেয়। এই হুন্ডি বন্ধে ও বৈধভাবে প্রবাসীদের অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করতে বাজেটে প্রণোদনা রাখা হয়েছে। প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে বছরে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার পাঠিয়ে থাকেন। বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বৈধভাবে ১ হাজার ৬৪০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত