মানুষ যা করে তা কেন করে

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৯, ১০:২৮ পিএম

‘সমগ্র জীবনে, আমাদের অবধারিতভাবে বিভিন্ন ব্যক্তিকে মোকাবেলা করতে হয়, যারা বিভিন্ন প্রকৃতির সমস্যার জন্ম দেয় আর আমাদের জীবনকে করে তুলে কঠিন এবং অপ্রীতিকর। এই ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ নেতা বা অফিসের বস, কেউ সহকর্মী এবং কেউ বন্ধু। তারা আক্রমণাত্মক বা পরোক্ষ-আক্রমণাত্মক হতে পারে; কিন্তু  বরাবরই তারা আমাদের আবেগ নিয়ে বাজনা বাজায়। আর এই কাজে তারা মাস্টার। খুবই আত্মবিশ্বাসী, মনোমুগ্ধকর, উদ্যমী হিসেবে তারা আমাদের সামনে হাজির হয় এবং এতে আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যাই তাদের প্রতি। কেবল একটু দেরিতেই আমরা আবিষ্কার করব যে তাদের প্রতি আস্থা অযৌক্তিক এবং তাদের ধারণাগুলো দুর্নীতিগ্রস্ত। সহকর্মীদের মধ্যে থাকা সে সকল ব্যক্তি গোপন ঈর্ষা থেকে আমাদের কাজে এবং ক্যারিয়ারে নাশকতা করে। অথবা তারা তাদের হতাশা প্রকাশ করার মাধ্যমে আমাদের স্টেপিং স্টোন হিসেবে ব্যবহার করে।’

 

১৯৫৯ সালে আমেরিকান মুল্লুকে জন্ম নেওয়া লেখক রবার্ট গ্রিন তার ‘দ্য লজ অব হিউম্যান নেচার’ বইটি শুরু করেছেন এই কথাগুলো দিয়েই। প্রাচীন জ্ঞান এবং দর্শন শাস্ত্রকে তার বইয়ের অনুকরণীয় বিষয় করে তুলে, রবার্ট গ্রিন লক্ষাধিক পাঠকের কাছে একজন পদপ্রদর্শক হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হয়েছেন। ২০১৮ সালের ২৩ অক্টোম্বর ভাইকিং প্রকাশনী হাউজ থেকে  ‘দ্য লজ অব হিউম্যান নেচার’ বইটি প্রকাশিত হয়। প্রায় ১৮ অনুচ্ছেদে বিভক্ত ৬৯০ পৃষ্ঠার এই বইটি পড়তে পড়তে পাঠক নিজেকে নার্সিসিস্ট হিসেবে আবিষ্কার করতে পারেন কিংবা পাঠকের মনে হতে পারে যে, রবার্ট অনেকটা সিগমুন্ড ফ্রয়েডের আদলে কিছু মনোজাগতিক বিষয়ের ব্যাখ্যা জুড়ে দিয়েছেন এখানে। বইটির প্রত্যেকটা অনুচ্ছেদ কিছু ছোট ছোট খ-ে বিভক্ত। পুরাতন অনুকরণীয় গল্প এবং সে-সবের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে লেখক বইটির বিষয়াদিকে করেছেন আরও বেশি সহজপাঠ্য। সামাজিক প্রাণী হিসেবে মানুষ অন্যান্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করবে, এটা সাধারণ বিষয়। তবে আমরা যা করি তা কেন করিÑ ব্যাপারটা জানা বা জানতে চাওয়া কিন্তু মামুলি বিষয় নয়! আর এই ব্যাপারটা বোঝাতে লেখক পাঠকদের নিয়ে যাবেন পেরিকেন্স, কুইন এলিজাবেথ দ্য ফার্স্ট, মার্টিন লুথার কিংয়ের মতো সব বড় বড় ব্যক্তিদের জীবনচক্রে।

 

এই আমেরিকান লেখক, পাঠক তথা আমাদের বোঝাতে চানÑ কীভাবে আমরা আমাদের স্ব স্ব আবেগ নিয়ে আলাদা হতে পারি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণে মাস্টার হয়ে উঠতে পারি, কীভাবে সহমর্মিতা জাগ্রত করতে পারি, যা আমাদের পরিচালিত করবে পরিজ্ঞানের দিকে; কীভাবে মুখোশ পরা মানুষের ভেতরের মানুষকে চিনতে পারব এবং কীভাবে নিজের উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে দৃঢ় থাকতে পারব। 

 

‘দ্য লজ অব হিউম্যান নেচার’ বইটি পাঠককে সাহায্য করার নিমিত্তে অপরাপর ব্যক্তি এবং তাদের আবেগগুলো জানার ক্ষেত্রে সহায়তা করে। আমাদের মানুষ প্রজাতির এটি একটি নিষ্ঠুর ব্যবচ্ছেদ। লেখক এখানে তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণের স্বার্থে জগদ্বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনকাহিনী এনেছেন এবং আমরা কীভাবে অপর মানুষের আচরণ বুঝতে পারব তার সুরাহা করতে চেয়েছেন। সব মানুষের জীবনেই কিছু কিছু খারাপ মানুষের উপস্থিতি থাকে। আর তাই রবার্ট গ্রিনের সাধারণ অভিপ্রায় এই যে, তিনি আমাদের খারাপ মানুষ চেনার কৌশল শেখাতে চান,  যাতে করে আমরা সে সব ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলতে পারি। একজন ব্যক্তি যেমন, তাকে সেভাবেই গ্রহণ করা উচিত। আমরা হয়তো সব সময় চাই অপর ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট নিয়মে চলুক; কিন্তু তা কখনো সম্ভব নয়। পৃথিবীর প্রত্যেক ব্যক্তিরই আছে ভিন্ন ভিন্ন সত্তা যা আমরা রাতারাতি পরিবর্তন করতে পারি না। আর তাই আমাদের অন্তরদৃষ্টির মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তিকে বুঝতে হবে এবং তাদের আগ্রহের বিষয়সমূহের ব্যাপারে প্রশ্ন করতে হবে।

 

বইটি পড়তে গিয়ে পাঠকের মধ্যে বেশ কিছু প্রশ্ন জন্ম নেবেÑ আমরা কে বা কারা? কোন জিনিসটা আমাদের পরিচালিত করে? কেন আমরা অপর কোনো ব্যক্তির আবেগসমূহ একটা নির্দিষ্ট উপায়ে বোঝার চেষ্টা করি? আমরা কি আসলে অন্য ব্যক্তিকে বুঝি? কিংবা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এই যে, আদৌ আমরা নিজেরা নিজেদের কতটুকু বুঝি সত্যিকার অর্থে?

রবার্ট গ্রিনের এ বইটি পড়ে পাঠকের মধ্যে পাঁচটি পরিবর্তন আসতে পারেÑ

পাঠক কৌশলগত পর্যবেক্ষকে পরিণত হতে পারেন।

মানুষের আচরণ দেখে বিচার-বিশ্লেষণ করার দক্ষতা অর্জন করতে পারেন।

মানসিক সমস্যা মোকাবিলায় যথেষ্ট পারদর্শী হয়ে উঠতে পারেন।

অন্য কোনো ব্যক্তিকে অনুপ্রাণিত করতে পারার ক্ষমতা অর্জন করতে পারেন।

সর্বোপরি, নিজের ভেতরে থাকা নেগেটিভ এনার্জি বা নেতিবাচক প্রবণতাগুলো দূর করায় মনোযোগী হতে পারেন।

 

রবার্ট গ্রিনের ‘দ্য লজ অব হিউম্যান নেচার’ বইটি থেকে কয়েকটি উদ্ধৃতি দিয়ে এই লেখা শেষ করতে চাই।   

‘মৃত্যু একটি অচলাবস্থাÑ ক্ষয় ছাড়া আর কিছুই ঘটে না তাতে। মৃত্যুর মাধ্যমে আমরা একে অন্যের থেকে পৃথক হই এবং একাকী থাকি। অপরদিকে, ‘জীবন মানে গতিময়তা, অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে যোজন এবং বৈচিত্র্য।’

‘কখনো কখনো সর্বোত্তম ক্রিয়া হচ্ছে অকার্যকর ক্রিয়াÑ গতিশীল খেলাকে বুঝতে যা সাহায্য করে।’

 

পরিশেষে একজন পাঠক হিসেবে বলতে চাই, ‘দ্য লজ অব হিউম্যান নেচার’ বইটি পাঠকদের সেরা পাঠের একটি হয়ে উঠতে পারে এবং তাদের জীবনযাপনের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে সহায়তা করতে পারে। লেখক

সাংবাদিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত