ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান ধাতু উদ্ধার করে তা ব্যবহার করা হবে। এজন্য কেন্দ্রীয়ভাবে ই-বর্জ্য নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় গবেষণাগারও স্থাপন করা হবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে হালকা প্রকৌশল শিল্পের উন্নয়নের উদ্যোগও নেওয়া হবে। ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরের উন্নয়ন ও ই-ওয়েস্ট প্রক্রিয়াকরণের সুবিধাদি সৃষ্টি’ বিষয়ে ইতিমধ্যে একটি প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)।
বাংলাদেশে ই-বর্জ্যরে পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। সময়ের সঙ্গে ব্যবহার উপযোগিতা হারানোসহ সব ধরনের ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস পণ্য বা পণ্যের অংশ বিশেষগুলোকে ই-বর্জ্য বলা হয়। ফেলে দেওয়া ডেস্কটপ কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, কিবোর্ড, নষ্ট মোবাইল ফোন সেট, ব্যাটারি ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত সব ইলেকট্রিক্যাল পণ্য ই-বর্জ্যরে অন্তর্ভুক্ত। উপাদানের বৈচিত্র্য অনুসারে ফেরাস, নন-ফেরাস, মেটালিক অ্যালয়, প্লাস্টিক, গ্লাস, প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড, সিরামিকস, রাবার সব কিছুই ই-বর্জ্য হিসেবে পাওয়া যায়। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) তথ্যানুসারে বিশ্বের বৈদ্যুতিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্যরে বড় অংশই চীন, হংকং, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালে বিশ্বে ই-বর্জ্যরে পরিমাণ ছিল ৪ কোটি ১৮ লাখ টন। ২০১৪ সালে এশিয়াতে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬০ লাখ টন। ওই বছর বাংলাদেশে উৎপাদিত ই-বর্জ্যরে পরিমাণ ছিল ১২৬ কিলোটন। ১ কিলোটন ৯০৭ মেট্রিক টনের সমান। এ হিসাবে বাংলাদেশে ২০১৪ সালে ই-বর্জ্যরে পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার ৩০৫ টন।
সুইডেনের প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন এসএসএনসির অর্থায়নে বাংলাদেশের বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) পরিচালিত ‘বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র : ই-বর্জ্য ২০১৪’ শিরোনামের গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে ২০১১-১২ অর্থবছরে ই-বর্জ্যরে পরিমাণ ছিল প্রায় ৫১ লাখ টন। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ১০ লাখ টন। এর মধ্যে শুধু মোবাইল ফোন থেকেই তৈরি হয়েছে ৫১ হাজার ৫০০ টন বর্জ্য। আর টেলিভিশন থেকে হয়েছে ৮ লাখ ৬০ হাজার টন ও কম্পিউটার বর্জ্য তৈরি হয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ টন। প্রতি বছর দেশের ই-বর্জ্যরে উৎপাদন প্রায় ২৮ লাখ টন। এ ছাড়া বাংলাদেশে জাহাজভাঙা শিল্পের জন্য আমদানি করা প্রতিটি জাহাজে বিভিন্ন প্রকারের অব্যবহৃত বৈদ্যুতিক পণ্য থাকায় এ থেকে তৈরি হওয়া বর্জ্যরে পরিমাণ ৯০ লাখ টনের কাছাকাছি। এর বাইরে সিএফএল বাতি, মার্কারি বাতি, থার্মোমিটারসহ নানা প্রকারের চিকিৎসা ও গৃহস্থালি যন্ত্র থেকে তৈরি হওয়া বর্জ্যরে পরিমাণ ২ লাখ ১০ হাজার ৩৩৬ টন।
বিসিএসআইআরের চেয়ারম্যান মো. ফারুক আহমেদ স্বাক্ষরিত প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে উৎপাদিত বিপুল ই-বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা না হলে তা পরিবেশের ওপর মারাত্বক হুমকি সৃষ্টি করবে। কারণ, ই-বর্জ্য ভারী ধাতু বহন করে, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ ছাড়া অনিয়ন্ত্রিত এবং অবৈজ্ঞানিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হতে পারে আরও ভয়ংকর। ঢাকার রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, গৃহস্থালি পণ্য থেকে ই-বর্জ্যরে ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি। অপচনশীল এসব বর্জ্যরে ধাতু ও রাসায়নিক মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে। এর প্রভাবে মানবদেহে ক্যানসার, শ্বাসকষ্ট, কিডনি ও লিভারের বিভিন্ন সমস্যা এবং মস্তিষ্ক ও রক্তনালীর বিভিন্ন রোগ হতে পারে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সঠিকভাবে ই-বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করলে মেটাল ও অ্যালয়ের ভালো উৎস হতে পারে। কারণ, কম্পিউটার হার্ডডিস্কের অন্যতম উপাদান অ্যালুমিনিয়াম ও স্টেইনলেস স্টিল। ড্রাইসেল ব্যাটারিতে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ জিঙ্ক পাওয়া যায়, যা জিঙ্কের ভালো একটি উৎস হতে পারে। মোবাইল ফোনের ব্যাটারি ও ল্যাপটপে লিথিয়াম আয়ন প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার হয়। এগুলো থেকে লিথিয়াম সল্ট প্রস্তুত করা সম্ভব। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে তিন কোটি মোবাইল ফোনসেট আমদানি করা হয়। এসব সেটের প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ডের (পিসিবি) জন্য সঠিক রি-সাইক্লিং প্রক্রিয়ার উন্নয়ন করা গেলে উচ্চমূল্যের ধাতব বস্তু বের করে আনা সম্ভব।
সাম্প্রতিক একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বিসিএসআইআর বলেছে, দেশের ই-বর্জ্যে থাকা পদার্থের মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো, টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৩১ হাজার ৪০০ কোটি। শহরে ধাতব ব্যবস্থাপনা বা আরবান মাইনিংয়ের মাধ্যমে মূল্যবান বস্তু আহরণ ও পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব। বর্তমানে ব্যক্তি উদ্যোগে স্বল্প আকারে ই-বর্জ্য সংগ্রহ, চূর্ণীকরণ ও বাছাই করা হচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় গবেষণার অভাবে ব্যাপক আকারে মূল্য সংযোজন করা যাচ্ছে না। ফলে বাছাই করা বর্জ্য নামমাত্র মূল্যে সিঙ্গাপুর, চীন ও ভারতে রপ্তানি হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রকল্পটির আওতায় ই-বর্জ্য নিয়ে গবেষণাগার স্থাপন করা হবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ভারী শিল্পাঞ্চল চট্টগ্রামে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেবাকেন্দ্র এবং ই-বর্জ্যরে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বাণিজ্যকেন্দ্র ঢাকায় দুটি গবেষণাগার স্থাপন করা হবে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পকেট অফিস স্থাপন করা হবে রাজশাহী, জয়পুরহাট ও সাভারে। এর মধ্য দিয়ে বৃহৎ ও ক্ষুদ্র শিল্পকারখানার মধ্যে সংযোগ স্থাপন, পেশাজীবীদের দক্ষতা উন্নয়ন সম্ভব হবে।
