২০ বছর আগের সুখস্মৃতি জাগাতে চান সাকিবরা

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০১৯, ০১:২৩ এএম

‘নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস’এই কথাটা অনেক শুনেছেন। কিন্তু সবসময় কি ঠিকঠাক তার মানে বুঝেছেন? এই কথাটার মানে এখন মর্মে মর্মে বুঝছে পাকিস্তান ক্রিকেট দল। এই বিশ্বকাপে নিয়তি তাদের নিয়ে কী নিষ্ঠুর খেলাটাই না খেলল! তাই বলে আজ লর্ডসে বাংলাদেশ কি আর মায়া দেখিয়ে পাকিস্তানকে ছেড়ে কথা বলবে? ইতিহাস বলে, একদমই না। পাকিস্তানকে হারাতে সবসময় মরিয়া থাকে বাঘের দল। জিতলে সেমিফাইনালে খেলতে না পারার দুঃখ হয়তো ঘুচবে না কিন্তু পাঁচ নম্বর দল হিসেবে বিশ্বকাপ শেষ করার গর্ব তো তাতে মিছে হয়ে যাবে না। জয় দিয়ে ২০১৯ বিশ্বকাপ শেষ করার সুযোগ এটি।

বুধবার নিউজিল্যান্ডকে ১১৯ রানে হারিয়ে স্বাগতিক ইংল্যান্ড উঠে গেল সেমিতে। হারলে ইংল্যান্ড বিদায় নিত। কিন্তু জিতে বাধিয়ে গেল ইতিহাসের অন্যতম হাস্যকর গোল। নির্ধারিত নয় ম্যাচ খেলে কিউইদের অর্জন ১১ পয়েন্ট। অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইংল্যান্ডের পর চতুর্থ দল হিসেবে সুপার ফোরে তাদের জায়গা প্রায় নিশ্চিত। নেট রানরেট +০.১৭৫। পাকিস্তানের -০.৭৯২।

বাংলাদেশকে হারালে সরফরাজ

 

আহমেদের দলের হবে ১১ পয়েন্ট। আর নেট রানরেটে নিউজিল্যান্ডকে পেছনে ফেলে সেমিতে উঠতে ‘মিশন ইম্পসিবল’ তাই। ৩৫০ রান করলে অন্তত ৩১১, ৪০০ করলে ৩১৬, ৪৫০ করলে ৩২১ রানে জিততে হবে। কিন্তু টস জিতলে তো বাংলাদেশ আগে ব্যাট করবে। তেমনটা হলে? তাহলে খেলা মাঠে গড়ানোর আগে পাকিস্তান বাদ। নিষ্ঠুর নয়?

বাস্তবতা হলো, পাকিস্তানের সঙ্গে শেষ চার দেখাতেই মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার দল জিতেছে। চিরশত্রুদের বিপক্ষে বাংলাদেশের ৩৬ ম্যাচে ৫ জয়। একটি সেই ১৯৯৯ বিশ্বকাপের ঐতিহাসিকটি। ইংল্যান্ডেই। এরপর ২০১৫ হোম সিরিজে পাকিস্তানকে ৩-০-তে হোয়াইটওয়াশ করেছে। গেল এশিয়া কাপে এদের হারিয়েই ফাইনালে খেলেছে। হ্যাঁ, পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের ২৩৩ রানের একটা হার আছে। কিন্তু সেটা ২০০০ সালে। সেই বাংলাদেশ আর এই বাংলাদেশে আকাশ-পাতাল ফারাক।

ওই হারটা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হারার লজ্জা। কিন্তু সেটাও ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হারের তালিকার ১৫ নম্বরে। সর্বোচ্চটা ২৯০ রানের। নিউজিল্যান্ড ২০০৮ সালে হারিয়েছিল আয়ারল্যান্ডকে। পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয় ২৫৫ রানের। ২০১৬ সালে আয়ারল্যান্ড ছিল প্রতিপক্ষ। ক্রিকেট ইতিহাসে ৩০০ রানে কোনো দলের জয়ের রেকর্ড নেই। তাছাড়া পাকিস্তান তো টস জিতলেও সব হারা দল হিসেবে মাঠে নামবে!

কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গেও কি নিয়তি কম খেলল এই বিশ্বকাপে? দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ হিসাবে-নিকাশে গোলমাল পাকিয়ে দিয়ে ৩৩০ করে মাশরাফীরা জয় দিয়ে শুরু করলেন। সেমিফাইনালে খেলার স্বপ্ন নিয়ে তাদের বিশ্বকাপ শুরু। ওই জয়ে সেটা বাস্তব লাগছিল। কিন্তু ক্রিকেট বিধাতা অলক্ষ্যে হাসেন। বাংলাদেশ তাদের টার্গেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আফগানিস্তানকে ঠিক হারাল। কিন্তু আরেক টার্গেট শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বৃষ্টিতে ম্যাচ পয়েন্ট ভাগ হয়ে গেল। আবার নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে মুশফিকুর রহিমের ভুলে কেন উইলিয়ামসন রান পেলেন। শেষে একটুর জন্য জিতল না বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাব্বির রহমানের ভুলে ডেভিড ওয়ার্নার সেঞ্চুরি করে ম্যাচ কেড়ে নিলেন। আর ভারত জিতল শুরুতে তামিম ইকবাল ক্যাচ ছাড়ায়। রোহিত শর্মা জীবন পেয়ে সেঞ্চুরিতে ম্যাচের চিত্র বদলালেন। তাও সুযোগ ছিল। কিন্তু মাহমুদউল্লাহ ম্যাচটাতে খেলতে পারেননি। থাকলে ভিন্ন কিছু হতেও পারত শেষে।

ভাগ্য একটু সহায় হলে বাংলাদেশের এবারের বিশ্বকাপ গল্পটা ভিন্ন হয়। যেহেতু পাকিস্তানকে শেষ চার ম্যাচে হারানোর রেকর্ড তাই আজকের ম্যাচে তো না জিততে পারার কারণ নেই। তাহলে ৯ পয়েন্টের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার কাছে হারানো ১ এবং হারা তিন ম্যাচের যেকোনোটি ভাগ্যের জয়ে ২ হলে হতো মোট ১২। এখন ১০ পয়েন্ট হাতে থাকলেও তো শেষ ম্যাচটিতে অন্য প্রেরণায় ঝাঁপানোর যথেষ্ট কারণ থাকত।

তা পাকিস্তানের বিপক্ষে অবশ্য বাংলাদেশের কখনো প্রেরণার অভাব হয় না। একটা ছোট দলের কাছে হারলেও অতটা অপমানিত বোধ করেন না এ প্রজন্মের ক্রিকেটাররা যতটা করেন পাকিস্তানের কাছে হারলে। সবচেয়ে বড় দলের বিপক্ষে জেতার চেয়েও পাকিস্তানের সঙ্গে একটা জয় তাদের আকাশ ছোঁয়ার আনন্দ দেয়। এই একটা ম্যাচ তাদের কাছে যুদ্ধের চেয়েও বেশি।

সেই যুদ্ধে কীভাবে গা আলগা করবে বাঘের দল? নেই নেই করেও প্রেরণার অভাব নেই। একেবারে নিজেদের ব্র্যান্ড ক্রিকেট খেলে মাশরাফীর দল বিশ্বে এবার সমর্থক বাড়িয়েছে অনেক। বাংলাদেশের বিপক্ষে কারও জয়ের নিশ্চিত গ্যারান্টি নেই। শেষ পর্যন্ত লড়ে জিততে হবে। একেবারে লেজের দিকে ব্যাট হাতেও সাব্বির রহমান-মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনরা তা খুব বুঝিয়েছেন সেদিন বিরাট কোহলিদের। সেখানে পাকিস্তান তো মানসিকভাবে পিছিয়ে আজকাল। তাদের চেয়ে ভালো খেলছে বাংলাদেশ। নিয়মিত। ধারাবাহিকভাবে।

চোটে এক খেলা মিস করে মাহমুদউল্লাহর আজ ফেরার কথা। অফ স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ নিশ্চয়ই জায়গাটা ফেরত পাবেন। মোসাদ্দেক হোসেন, রুবেল হোসেন তাহলে বাইরে? সবার আক্ষেপ, এই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় সাকিব আল হাসানের সেমিফাইনাল ও ফাইনাল খেলা হচ্ছে না। আট ম্যাচের সাতটিতে পারফরম করার সুযোগ পেয়ে ৫৪২ রান ও ১১ উইকেটের স্বপ্নযাত্রা তার। শেষ এখানে। ক্রিকেটের মক্কা লর্ডসে। কোন উচ্চতায় উঠবেন বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার?

কিংবা পারফরম করার শেষ সুযোগ আজ তামিম ইকবাল-মাশরাফীর মতো পারফরমারদের যারা নিজেদের নামের ওপর একরকম অবিচার করে চলেছেন। আর শেষটায় প্রবল এক গর্জনে বাংলাদেশের তো এটাও প্রমাণ করার ‘শেষ ভালো যার, সব ভালো তার’।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত