হোপ-হেটমায়ার-পুরানে উইন্ডিজের ভবিষ্যৎ

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০১৯, ১১:০১ পিএম

মারলন স্যামুয়েলস, উইন্ডিজ ক্রিকেটের বড় নাম। কিন্তু ২০১৭-এর পর থেকে এই ক্যারিবিয়ানের ব্যাটিং গড় নেমে যায় ২২-এ, স্ট্রাইক রেট ৬৩-তে। তাই গত বছরের শেষে বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলা সিরিজ হয়ে দাঁড়ায় ৩৮ বছরের তারকার শেষ সিরিজ। তার খালি জায়গা দখল করেন ২৩ বছরের নিকোলাস পুরান। বিশ্বকাপের মাত্র তিন মাস আগে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেক এ বাঁহাতির। অথচ বিশ্বকাপে পুরানই হয়েছেন উইন্ডিজদের বড় ভরসার নাম। স্যামুয়েলসকে বসিয়ে পুরানকে আনার এ সিদ্ধান্ত আপাতদৃষ্টিতে বিশাল কিছু নয়। তবে উইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড ভালো করে দেখলে অবশ্য এর মাঝে আলোর দেখা পেতে পারেন। দলের স্বার্থে এমন পরিবর্তন বড্ড প্রয়োজন।

ব্রিজটাউনে অভিষেক ম্যাচে পুরান করেন শূন্য। ওই শূন্যের অভিজ্ঞতা নিয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে বিশ্বকাপে অভিষেক হয় এই তরুণের। সেই পুরানই আসরে দলের পক্ষে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকারী। নয় ম্যাচ থেকে ৫২.৪২ গড়ে করেছেন ৩৬৭। নিজের প্রথম বিশ্বকাপ শেষ করেছেন আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৪৩ বলে ৫৮ রানের ইনিংসে। শেই হোপ ও শিমরন হেটমায়ারের দাঁড় করানো ভিতের ওপর শেষ পরশ বুলিয়ে দেন পুরান। এভাবে দলের ব্যর্থ বিশ্বকাপ যাত্রার মাঝেও উইন্ডিজকে একটা আশার আলো দেখান পুরান ভবিষ্যতের জন্য।

অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ক্যারিবীয় এবং বর্তমানে দুর্দশাগ্রস্ত উইন্ডিজ নিয়ে সবাই কথা বললেও তাদের ভবিষ্যতের দিকে কয়জনই বা নজর দিয়েছেন। কিন্তু বিষয়টি চোখ এড়ায়নি সদ্য বিশ্বকাপ থেকে অবসরে যাওয়া ক্রিস গেইলের। তাই যখন তিনি নিজে সব বোলারকে সতর্ক করে দেন পুরান-হেটমায়ার-হোপকে নিয়ে, তখন কিন্তু নড়েচড়ে বসতেই হয়। এছাড়া এক সংবাদ সম্মেলনে যখন কার্লোস ব্রাফেট বলেন, ‘হোপ-হেটমায়ার-পুরানে ভর করে দল খেলার পরিবর্তন আনবে। ভয়ডরহীন ক্রিকেট ফিরিয়ে আনবে উইন্ডিজে। তখন এই উইন্ডিজ আপনার মাথায় জায়গা করে নিতে বাধ্য।’

তবে এটা এখন আর কথামালার মধ্যে নেই। কারণ মাত্র ২৫, ২২ এবং ২৩ বছরের হোপ, হেটমায়ার আর পুরানই কিন্তু উইন্ডিজের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রানের তালিকার সেরা তিনজন। নিজেদের ক্যারিয়ারের শুরুতে দলের ব্যর্থতা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত মাইলফলক অর্জন বা ভালো খেলা তাদের জন্য অনেক বেশি অনুপ্রেরণামূলক। তারা পালাক্রমে ৩, ৪ এবং ৫ নম্বরে ব্যাটিং করেন দলের প্রয়োজনে। তিনজনের খেলার ধরন কিছুটা ভিন্ন। কিন্তু খুব সুন্দর করে তারা সেই মিশেল ঘটিয়ে নেন দলের প্রয়োজনে।

শুরুতে পুরানকে নিয়ে আলোচনা করা যাক। কারণ তিনি দলে এসেছেন বাকি দুজনের পর এবং ব্যাটিংয়ে নামেনও তাদের পরে। পুরানের যোগ হওয়াটা দলের ব্যাটিংয়ে আলাদা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কারণ তিনি দলের অবস্থা বিবেচনায় চাইলে সব ধরনের খেলা খেলতে পারেন। প্রয়োজনে ইনিংস এগিয়ে নেওয়া থেকে ঝড়ো ব্যাটিং সবই রয়েছে পুরানের ভা-ারে। এজন্য আইপিএলে পুরানের অধিনায়ক রবিচন্দ্রন অশ্বিনও তার দলের ব্যাটিং সাজিয়েছিলেন এই ত্রিনিদাদের ওপর ভিত্তি করে। যা তার জন্য অনেক বড় পাওনা।

অভিষেকে শূন্য মারা সত্ত্বেও পুরানের বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়ার পেছনে বড় কারিগর সহকারী কোচ রডি এস্টউইক। এ বছর আইপিএলের আগে অনূর্ধ্ব-১৯-এর হয়ে এক ম্যাচে পুরান করেছিলেন ১৪৩। যেখানে দলের রানই ছিল ২০৮। পুরান সেই ম্যাচে একই সঙ্গে রক্ষণাত্মক আর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেছেন। নবম উইকেট জুটিতে তুলেছিলেন ১৩৬। বড় খেলোয়াড় হতে চাওয়ার পথে যেটা ছিল তার প্রথম বার্তা। ‘আমার সবসময় পুরানের ওপর আস্থা ছিল। তার প্রতিভায় অবাক নই বরং মুগ্ধ। তবে আমাকে অবাক করেছে যে, নিজেকে মেলে ধরার জন্য সে বেছে নিল এত বড় মঞ্চ’Ñ কোচের প্রশংসাবাণী।

তারপরই আসে শেই হোপের কথা। ব্যাটিংয়ে দলের অন্যতম নির্ভরতার নাম। নিজের যে বেঞ্চমার্ক তিনি তৈরি করেছেন সে অনুযায়ী তার বিশ্বকাপ ভালো কাটেনি। যেখানে ক্যারিয়ার গড় প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই সেখানে মাত্র ৩৪ গড়ে করেছেন ২৭৪। টুর্নামেন্টের ব্যাটিং লাইনআপে স্থির জায়গা পাননি তিনি। ইভিন লুইসের ইনজুরির কারণে ওপর-নিচ করে খেলতে হয়েছে তাকে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে নিজেকে প্রমাণ করেছেন আবারও। শুরুতে কিছুটা নার্ভাস থাকলেও রশিদের বদান্যতায় জীবন পেয়ে দলে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। হোপ মাঠে থাকলে অন্য খেলোয়াড়রা মেরে খেলার সাহস পেয়ে থাকেন। কারণ হোপের প্রান্ত নিয়ে ভাবতে হয় না।

আর চার নম্বরে খেলা হেটমায়ার হলেন হোপ আর পুরানের মাঝে খেলার জন্য সবচেয়ে ভালো পছন্দ। মাঝের ওভারগুলোতে বিপক্ষের স্পিনকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে তার। স্পিনে ভালো হওয়ায় স্পিন আক্রমণের বিপক্ষে বড় ওষুধ হেটমায়ার। স্পিনে দারুণ স্বচ্ছন্দ। গত বছর ভারতের সঙ্গে টেস্ট ম্যাচে কুলদিপের বলে খাবি খাওয়া হেটমায়ার ওয়ানডেতে এসে নিজেকে বদলে ফেলেছিলেন। মাঝের ওভারে কুলদিপকে এতটাই পিটিয়েছেন যে, ভারত অধিনায়ক বাধ্য হয়েছিলেন বুমরাহ-ভুবনেশ্বরকে ফিরিয়ে আনতে।

আফগানিস্তানের সঙ্গে ম্যাচ শেষে হোপের কাছে এই ত্রয়ী সম্বন্ধে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার মনে হয় আমরা একে অন্যকে অনেক সাহস জুগিয়ে থাকি। আমরা এখনো শিখছি। চেষ্টা করছি যত দ্রুত সম্ভব শিখতে। আমাদের সবার খেলার ধরন আলাদা তবে যদি আমরা এই আক্রমণকে মিশিয়ে শক্তভাবে গড়ে তুলতে পারি, বিশ্বাস করি ভবিষ্যতে আমরা বিশ্বের দরবারে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারব।’

উইন্ডিজের অন্তর্বর্তীকালীন কোচ ফ্লয়েড রেইফারও আশা করছেন এই ব্যাটিংত্রয়ী ২০২৩ বিশ্বকাপে উইন্ডিজের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়াবে। ‘বলতে চাই আমাদের জন্য ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। এই বিশ্বকাপে আমাদের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক হলো ৩, ৪ এবং ৫-এ হোপ, হেটমায়ার ও পুরানকে পাওয়া। আমরা আবার উইন্ডিজের ক্রিকেটীয় ধারা ফিরিয়ে আনছি তাদের হাত ধরে, আর ভবিষ্যতে তা বজায় রাখব।’ কোচ আরও যোগ করেন, ‘বড় বড় খেলোয়াড়রা একই সঙ্গে টেস্ট এবং টি-টুয়েন্টিতে ভালো খেলছে। এটা আসলে মানিয়ে নেওয়ার ব্যাপার। আমাদের এখনকার খেলোয়াড়রা যদি এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে মানিয়ে যেতে পারে তাহলে চার বছর পর আমরা নিজেদের যেখানে দেখতে চাই সেখানে দেখব।’

শুধু সময় বলতে পারবে গেইল, ব্রাফেট, এস্টউইক বা রেইফারের কথা কতটাই বা প্রমাণিত হয়। উইন্ডিজদের এখন অনেক দূরের পথ পাড়ি দিতে হবে। আর এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ভবিষ্যতে তাদের আশার আলো হোপ-হেটমায়ার-পুরান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত