বিলেতি চোখে বাঙালি বিস্ময়

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০১৯, ১১:১৫ পিএম

চোখ ভরা আগুন। বুক ভরা সাহস। কেউ বলে মনে তার সীমাহীন ‘অহংকার’। বাঙালি কিশোরের বুক পকেটের ক্রিকেট খাতায় যে উপাধি সেখানে লেখা বিশ্বসেরা। ইংলিশ রাজ্যের বিশ্বকাপ যে পরিচয়টা রেখে গেল, সেটি তার চেয়ে বেশি কিছু।

একজন সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশের এযাবৎকালের সেরা ক্রিকেটার। ২০১৯ বিশ্বকাপে নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য এক উচ্চতায়। গোটা ক্রিকেট বিশ্ব তার বন্দনায় মেতেছে। ইংল্যান্ডের রাস্তায় তাকে নিয়ে গান গাইছে তরুণরা। স্কুলপড়ুয়ারা বায়না ধরছে, তাকে দেখবে বলে।

আসরের শেষ ম্যাচেও সাকিব ছিলেন নিজের মতো। পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলেছেন ৬৪ রানের ইনিংস। ৮ ম্যাচে মোট রান ৬০৬, উইকেট ১১টি। এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে এমন সাফল্য আর কারো নেই!

টেমস নদী পার হয়ে উড়ে আসার সময় সাকিব কী ছাপ রেখে ফিরবেন, সেটি সাদা চোখে অনেকেই আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। একটা দেশের নির্দিষ্ট খেলা তখনই উন্নতির শিখরে উঠতে থাকে, যখন তার নিজস্ব সমৃদ্ধ ইতিহাস থাকে। সাকিব সেই ইতিহাসই লিখে ফেলেছেন।

বিকেএসপির যে রুমে মুশফিক, তামিমদের সঙ্গে তিনি খেলা দেখতেন, সেই রুমটা এই সন্ধ্যায়ও নিশ্চয়ই কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। সাকিব যেদিন বৃদ্ধ বিছানায় চলে যাবেন, সেদিন ওই রুমে থাকা কেউ একজন কোনো বিশ্বকাপে লাল-সবুজের জার্সি পরে উইকেটে থাকবে। সে আজ জেনে গেল ৬০৬ রানের পাশাপাশি ১১ উইকেট নেওয়া অসম্ভব কিছু নয়। তারই কোনো বড় ভাই-ই তো সেটি করে দেখিয়েছেন।

এভাবেই হয়। শচীনের দেশে যখন কোনো বিরাটের জন্ম হয়, ব্র্যাডম্যানের দেশে যখন একজন পন্টিংয়ের জন্ম হয় তখন তারাও ওই একই সম্ভবের কথা শুনে শুনে বড় হয়। তখন ১০০ সেঞ্চুরিও তাদের কাছে অসম্ভব মনে হয় না।

সাকিবের কাছে বাংলাদেশ ক্রিকেট কীভাবে ঋণী হয়ে থাকল, এটি তারই সারাংশ। তিনি কী দিয়েছেন, কী দেবেন সেটি ভাবসম্প্রসারণ।

ব্যক্তি সাকিব কেমন মানুষ, সেটি নিয়ে দেশে নানা ধরনের ‘মিথ’ আছে। প্রতিদিন বিসিবি পাড়ায় পা রাখা সাংবাদিকেরাও মাঝে মাঝে তাকে ‘অহংকারী’ বলে থাকেন। আসলে কী তাই?

কাছের মানুষেরা বলে থাকেন সাকিবের সব আচরণ মূলত প্রকৃতি প্রদত্ত। মাঠে যখন হাঁটেন, দেখলেই মনে হয় বিশ্বসেরা। ইগোকে জিইয়ে রেখে প্রায়ই তিনি জেতার চেষ্টা করেন। মাঠের বাইরে খুব সহজে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে চান না বা মিশতে পারেন না। সব কিছু জিততে চান কঠিন মানসিকতার জোরে।

এবার বিশ্বকাপের আগে দলের সঙ্গে ছবি না তোলায় তাকে নিয়ে শুরু হয় তুমুল সমালোচনা। অন্য কোনো ক্রিকেটার হলে সেই সমালোচনায় ভেসে যেতেন। কিন্তু তিনি যে সাকিব!

ক্রিকেটার সাকিব কেমন তা নিয়ে খুব বেশি কিছু বলার নেই। ‘ঘরের মানুষই জানে ব্যক্তির আসল চেহারা’ এই কথা যদি সত্য হয়, তবে ক্রিকেটার সাকিবের চেহারা দারুণ ভয়ংকর!

জাতীয় দলের এক ক্রিকেটার একবার মিরপুরে দাঁড়িয়ে সাকিব সম্পর্কে কথা বলছিলেন। তার চোখেমুখে যে বিস্ময় সেদিন ফুটে উঠছিল সেটি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির দক্ষতাকেও হারিয়ে দিতে পারে, ‘সাকিব ভাই যেদিন উইকেট পান না কিংবা খারাপ বল করেন, সেদিন ড্রেসিংরুমে তার সঙ্গে কথা বলা যায় না। দারুণ জেদ নিয়ে বসে থাকেন। ব্যাট হাতে ভালো কিছু করলে তবেই শান্ত হন। একইভাবে ব্যাটিংয়ে খারাপ করলে আমরা বুঝতে পারি আজ তিনি বোলিংয়ে কিছু একটা করবেন।’

ক্রিকেটার সাকিব সব সময় অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকতে চান। সতীর্থদের প্রায়ই বলেন বোলিংয়ে নিজস্ব ‘অস্ত্র’ ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টেকা যাবে না। এমন চিন্তা থেকে নিজের ‘আর্ম’ বলকে ব্র্যান্ড বানিয়ে ফেলেছেন। দিনরাত নিজেকে ভেঙে কাটশটে দক্ষ হয়েছেন। অন্য সবার আগে আত্মস্থ করেছেন ইংলিশ কন্ডিশন। তাও সেই নিজের ঢংয়ে।

ইংল্যান্ডের উইকেটে সনাতন চিন্তায় অন্যরা বিশেষ বিশেষ শট আয়ত্ত করার চেষ্টা করেছেন। করছেন। কিন্তু সাকিব নিজের শক্তির জায়গা খোঁজার চেষ্টা করে সফল হয়েছেন।

সাকিবের সামনের পায়ের কাজ বা ট্রিগার মুভমেন্ট খুব ছোট। আড়াআড়ি মুভমেন্টের কারণে সামনের কাঁধ কিছুটা চেপে আসে। এমন পজিশনে থেকে মিডঅফে ড্রাইভ করা কঠিন। গত চার বছরে মিডঅফ দিয়ে ১১ শতাংশ রান করা সাকিব এসব অন্তরে ধারণ করে এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে সাবধানী। পয়েন্টের প্রতি তার দুর্বলতা জেনে সবাই এই পজিশনে ফিল্ডার রেখেও তাকে আটকাতে পারছে না।

চলতি বিশ্বকাপে দেখা গেছে পেস বোলারদের লেংথ খুব দ্রুত বুঝতে পারছেন। যার কারণে বাউন্সারে খুব একটা বিপাকে পড়েননি।

বোলার সাকিব বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এখন আরও পরিণত। আর্ম বল তো আছেই। সাকিব নিজেকে ভেঙেছেন অন্য জায়গায়ও। আগের মতো বল ঘোরানোর চেষ্টা অতটা করছেন না। তার চেয়ে বরং বাতাসে গতির পরিবর্তনে বেশি মনোযোগী।

সাকিব এসব কীভাবে পারেন?

পারেন তার ওই ‘অহংকারের’ জোরে, পারেন একটা মস্তিষ্কের জোরে; যেখানে শুধু দুটো শব্দ লেখা-ক্রিকেট আর বিশ্বসেরা!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত