কুমিল্লা হাইস্কুল সারা দেশের ৫৫৭টি স্কুলকে হারিয়ে ১১ হাজার ১২০ জন খেলোয়াড়ের বিশাল আসরে সেরা হয়েছে। কীভাবে তারা হলো দেশের সেরা স্কুল ক্রিকেট দল? প্রাইম ব্যাংক ইয়ং টাইগার্স স্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় তাদের সেরা দল হয়ে ওঠার গল্প যে কারও জন্যই উদ্দীপনার। লিখেছেন দেলোয়ার হোসেন জাকির
বিসিবির (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড) এই উদ্যোগটির সঙ্গী হয়েছিলেন তারা ২০০৪ সালে। আজ থেকে ১৫ বছর আগে। তখন বাংলাদেশের খুদে খেলোয়াড়দের তৈরি করার এই কারখানার নাম ছিল ‘আন্তঃস্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগিতা’। বিভিন্ন জেলা শহরে এবারের প্রতিযোগিতার মতো খেলোয়াড়দের স্কুলগুলোর মাধ্যমে নিয়ে আসত জেলা ক্রীড়া সংস্থা। পরে তাদের জেলাভিত্তিক প্রতিযোগিতা হতো, বিভাগীয় প্রতিযোগিতা ও রাজধানী ঢাকায় সেরা দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় প্রতিযোগিতা হতো। ক্রিকেট খেলার এই আসরে ১৪১ বছরের পুরনো স্কুল শহরের কুমিল্লা হাইস্কুল সঙ্গী হলো সে বছরই। এই গল্প বললেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক হুমায়ূন কবীর। বলতে বলতে এই কৃতী শিক্ষক আরও জানালেন সেই সময়ের কথাÑ ‘অন্য স্কুলগুলোকে বিসিবি যেখানে বারবার অনুরোধ করে চিঠি পাঠালে জেলা ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় আসতে চাইত না, এখনো তাদের অংশগ্রহণের হার কম, সেখানে আমরা নিজে থেকেই বিসিবির অনুরোধে সাড়া দিলাম।’
সে বছর থেকেই তাদের অনুশীলন শুরু হলো। তখন স্কুলের মাঠটিও ছিল বেশ বড়। সকালে মেয়েদের ক্লাস হয়, দুপুর ১২টা থেকে ছেলেদের; সকালে ক্লাস করা যায় না; বিকেলে স্কুলের মাঠে ক্লাসের পর উৎসাহী খেলোয়াড়দের অনুশীলন শুরু হলো। খুব উৎসাহ নিয়ে তারা আন্তঃস্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় অংশ নিল। তবে প্রথমবারে খুব ভালো ফলাফল হলো না। তাতে অবশ্য ভেঙে পড়লেন না স্কুলের শিক্ষক ও অভিভাবকরা। তারা ঠিকই দলকে অনুশীলন করালেন নিয়মিত। প্রায় প্রতিদিন স্কুলের ছুটির পর তারা ক্রিকেট খেলতে নামত। নিজেদের পড়ালেখার অবসরে ব্যাট, বল আর উইকেট নিয়ে নেমে পড়ত যেকোনো পাড়ার গলিতে, আশপাশের মাঠে। এভাবেই চলতে লাগল তাদের খেলা। শিক্ষকরাও কোনো কোনো দিন তাদের খেলার সঙ্গী হন। কোনো তরুণ শিক্ষক নেমে যান ছাত্রদের উৎসাহ দিতে। ফলে পরের বছর ক্রিকেটে নেমে পড়ল কুমিল্লা হাইস্কুল দল। এবার তাদের ফলাফল হলো দ্বিতীয় রাউন্ডে উত্তীর্ণ। ফলে তাদের উৎসাহ বেড়ে গেল। ২০০৫ সালে তাদের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন আবদুল কাদের। তিনি ছিলেন পাঁচটি বছর, ২০১২ সালে অবসর নিয়েছেন। তবে কুমিল্লা হাইস্কুলের পুরো পরিবর্তন তার হাত দিয়েই শুরু হলো।
ভোরে পাশের কুমিল্লা স্টেডিয়ামে, পড়ালেখা শেষে স্কুলের মাঠে, কোনো কোনো দিন স্টেডিয়ামের বিশাল মাঠে; বন্ধের দিনে ঈদগাহ মাঠে অনুশীলন করতে লাগল দলটি।
তাদের গুছিয়ে দিয়ে স্কুলের উন্নয়নে হাত দিলেন প্রধান শিক্ষক। তখন মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ ছাত্রছাত্রী ছিল পুরনো এই স্কুলে। পাসের হার ২০ থেকে ৩০ ভাগের বেশি ছিল না। বড় একটি ভবন ছিল, সেটির অবস্থা খুব জীর্ণ ছিল। শিক্ষক ছিলেন, তবে তাদের বেতন, ভাতা কখনো হতো, কখনো হতো না। পাসের হার কম থাকায় তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পড়ানোর জন্য মা-বাবার উৎসাহ কম ছিল। তিনি করলেন কীÑ শিক্ষকদের সময়মতো স্কুলে আসা ও তাদের ভালোভাবে ক্লাসে পড়ানোর ব্যবস্থা করলেন। নিজে ঘুরে ঘুরে তারা ভালোভাবে ক্লাস নিচ্ছেন কি নাÑ দেখতে লাগলেন। শিক্ষকদের বেতন মাসেরটি মাসে ঠিকমতো দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে কথা বলে। ফলে তারাও ক্লাসে ভালোভাবে উপস্থিত হতে লাগল। আসার আগে নিজেরা অনুশীলন করে, পড়ে এলো। তাতে লেখাপড়ার মান বাড়ল। ছাত্রছাত্রীদের ফলাফল ও ভর্তির হার বেড়ে যেতে লাগল। শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে তিনি শিক্ষক, অভিভাবক, পাড়ার মানুষ সবাইকে নিয়ে বন্ধের দিনে আলাপ করে উন্নয়ন শুরু করলেন। তাদের সবার চেষ্টায় স্কুলের আশপাশের পরিবেশও ভালো হতে লাগল। এভাবেই বদলে গেল একটি স্কুল।
এখন তাদের নয়তলা একটি বিশাল ভবন আছে। যার পুরো নির্মাণ খরচ স্কুলের টাকাতেই দেওয়া হয়েছে। সেখানে লিফট আছে। ছাত্র ও ছাত্রী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আলাদা পরিবেশসম্মত টয়লেট আছে। বিদ্যুতের জন্য আলাদা জেনারেটর আছে এই স্কুলে। নিজেদের মসজিদ আছে। তারা আরেকটি ভবন তৈরি করার জন্য কাজ শুরু করছেন কয়েক দিনের মধ্যেই। পাঁচ হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রীর এই স্কুলের ১০০ শিক্ষককে স্কুলের বেতনের টাকাতেই বেতন দেওয়া হয়। সেই পরিবর্তন ধরে রেখেই স্কুলটি এত দূর এগিয়ে চলেছে বলে জানালেন প্রধান শিক্ষক। স্কুলের মাঠটি এখন অনেক ছোট হয়ে গেছে। ২০০ ফিট চওড়া, পাশে সেটি ৭০ থেকে ৮০ ফিট। ছাত্ররা ভালো করে খেলতে পারে না। তবে তাতে ভাবনা নেইÑ পাশের দুটি বিরাট মাঠ তো আছেই। আর তাদের জন্য ক্রিকেটের সব উপকরণÑ ব্যাট, বল, স্ট্যাম্প, উইকেট সবই স্কুলের স্যাররা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এখন তাদের আলাদা ক্রীড়া শিক্ষকও আছেন। বদলে যাওয়ার এই গল্পের হাত ধরে কুমিল্লা হাইস্কুল সব সময়ই ইয়াং টাইগার্স ন্যাশনাল ইন্টার স্কুল কমপিটিশনে অংশ নিয়ে চলেছে। পরে সেটির নাম বদলে হয়েছে নির্মাণ স্কুল ক্রিকেট। এখন প্রতিযোগিতার নাম ‘প্রাইম ব্যাংক ইয়ং টাইগার্স ন্যাশনাল স্কুল ক্রিকেট’।
তাতে কখনো ভালো করেছে, আবার কখনো চোখ দিয়ে জল ফেলতে ফেলতে চলে এসেছে কুমিল্লার এই স্কুল দল। তবে অংশগ্রহণ বা অনুশীলন ছাড়েনি কোনো দিন। ২০০৮-১০ সালটি তাদের ভালো কেটেছে এ আসরে। তাদের সাফল্যের শুরু হয় আজ থেকে চার বছর আগেÑ ২০১৫-১৬ সেশনে। সেবার সেমিফাইনালে গেছে কুমিল্লার এই স্কুল। চারটি সেরা দলের হয়ে খেলেছে ঢাকার আসরে। পরের বছর অবশ্য আগের বারের মান ধরে রাখতে পারেনি শত চেষ্টাতেও। কুমিল্লা জেলার রানারআপ হয়েই তাদের ফিরে আসতে হলো। পরের বছর জেলার আরেক সেরা দল মডার্ন হাইস্কুলকে হারিয়ে তারা হলো জেলা চ্যাম্পিয়ন। বিভাগীয় খেলা হয়েছে চট্টগ্রামে। সেখানে তাদের সাফল্য আসেনি। তাতে কী? এবার তো সারা দেশের সেরা হয়েছে তারা। এই ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের জাতীয় স্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে ৫৫৮টি স্কুল। খেলেছে নিবন্ধিত ১১ হাজার ১২০ জন খেলোয়াড়। নকআউট পর্বের ১২ রাউন্ডের এই ধাপে পুরো অপরাজিত থেকে চ্যাম্পিয়ন তারা। ১৬ কিশোরের এই স্কুল দলটি এখন সারা দেশের গর্ব। ভবিষ্যতের সাকিব, মাশরাফী তাদের এই দল থেকেই বেরিয়ে আসবেÑ নিশ্চিত। তবে তাদের লড়তে হয়েছে দেশের সেরা দল, বিরাট মাঠের খেলোয়াড়, বিকেএসপি বা জেলার চ্যাম্পিয়ন দলের খেলোয়াড়ের সঙ্গে। খেলাপাগল, অভিজ্ঞÑ জাতীয় কোচের কোচিংকেও হারিয়ে দিয়েছে তারা।
সবার আগে তাদের পাশে ছিলেন তাদের শারীরিক ক্রীড়া শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক আরবের রহমান। তার জীবনের মূল দর্শন হলোÑ ‘স্বাস্থ্যকর মনে স্বাস্থ্যকর শরীর। আর সে জন্য খেলার কোনো বিকল্প নেই।’ সেটিই তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন তার শিষ্যদের মনে। তাদের প্রতিদিন ফোন করে, তাদের মা-বাবাকে অনুরোধ করে, স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে আলাপ করে ছেলেদের খেলার মাঠে এনেছেন। এই স্কুলে তিনি যোগ দিয়েছেন ২০১৪ সালে, আজও তার দিনটি জ¦লজ¦ল করে চোখে ভাসেÑ নভেম্বরের প্রথম দিন। তাকে সব ধরনের সাহায্য করেছেন বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম ও স্কুলের প্রধান শিক্ষক হুমায়ূন কবীর। খেলাপ্রেমী ও গুরুত্ব বোঝা এই দুই মানুষ তাকে সব ধরনের সাহায্য করেছেন। অন্য শিক্ষকরাও তার পাশে থেকেছেন। নিজেরা মাঠে গিয়ে, সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এসেছেন। ফলে একটি ভালো ও সেরা খেলোয়াড়ের দল নিয়ে এগিয়েছেন আরবের রহমান। সেরা ১৬টি ছেলেকে দফায় দফায় ভাগ করে এনেছেন। স্কুল দলের হয়ে খেলার জন্য নির্বাচিত করেছেন। তাদের ক্রিকেটের নিয়মকানুন শিখিয়েছেন, খেলাধুলার গুরুত্ব জীবনে শিখিয়েছেন। কোনো কোনো সময় তাদের বকতে, ভালো খেললে আদর করতেও থামেননি। জেলা ক্রীড়া সংস্থাও যখন প্রয়োজন তাদের সাহায্য করেছে।
এবারের আসরের গল্প শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কুমিল্লার সব স্কুল দল, জেলার খেলাপাগল মানুষের জানা। এ বছরের ১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় এই প্রতিযোগিতার শুরু হলো। তাদের জন্য কোচ হলেন নুরুল্লাহ। তিনি কুমিল্লার স্টার ক্রিকেট অ্যাকাডেমির পরিচালক। খেলাপাগল, জাতীয় পর্যায়ের কোচ। আর তাদের খেলার শিক্ষক তো আছেনই পাশে। নড়েচড়ে বসলেন প্রধান শিক্ষক হুমায়ূন কবীর ও স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম। তারা সব ধরনের সহযোগিতা করতে নামলেন। এরপর যতগুলো খেলা তারা খেলেছেÑ সব সময় তাদের স্কুল দলে সঙ্গে শিক্ষক, অভিভাবকরা ছিলেন। তারা সবচেয়ে ভালোভাবে তাদের থাকার, খাওয়ার, অনুশীলনের ও খেলার ব্যবস্থা করেছেন। এই কাজে সবার আগে তাদের স্কুল দল হলো।
কমার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র সাব্বির আলম হলো তাদের অতিথি খেলোয়াড়, নিয়মানুসারেই। সে একজন ভালো অলরাউন্ডার। সে বাদে এই দলে ছিল আবু বক্কর, নাছিম, আকরাম, ফাহাদ, শরীফ, স্বপন, সৈকত, ইউসুফ, আকিব ও সৌরভের মতো খেলোয়াড়। টানা অনুশীলনে নেমে পড়ল কিশোর ক্রিকেটাররা। প্রতিদিন ভোরে তারা মা-বাবার ডাকে, কোচের তাড়ায় স্কুলে ব্যাট, প্যাড ও স্ট্যাম্প নিয়ে চলে আসত। দুপুর ১২টা পর্যন্ত অনুশীলন করত। পরে আবার বিকেলে খেলতে নামত। সন্ধ্যা পর্যন্ত খেলত।
তাদের খাওয়ার খরচ জোগানো হয়েছে স্কুল ফান্ড থেকে। সারাক্ষণ তাদের নিয়ে পড়ে থাকতে লাগলেন কোচ। দিন নেই, রাত নেই তিনি তাদের খেলায় ডুবিয়ে দিলেন। শেখালেন ক্রিকেটের নিয়মকানুন, কীভাবে ভালো খেলতে হবেÑ সব কৌশল । তিনি তাদের ভাই হলেন, বন্ধু হলেন। ওস্তাদও। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়Ñ ছাত্রদের মতো তাকেও দমাতে পারলেন না। খেলোয়াড়রাও দমেনি। সারা দিন কোচিংয়ের পর বাসায় ফিরে বিশ্রামের পর পরদিনের পড়া পড়তে হয়েছে। ক্লাস তো আর থেমে থাকে না। এই খেলোয়াড়দের পাশে সব সময় থেকেছে কুমিল্লা হাইস্কুল। তাদের খেলার জন্য জার্সি থেকে শুরু করে সবই দিয়েছে। তাদের ভালো খেলার আগে অনুশীলন ও খেলতে যাওয়ার জন্য আলাদা করে ক্লাস নেওয়া এবং ক্লাসের সময়সূচি বদল; পরীক্ষার সময় বিশেষ বিবেচনা এবং আলাদা পরীক্ষা নেওয়া; খেলার সময় মাঠে থাকা; পরে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং সাহায্য করা সবই তারা করেছেন।
প্রথম খেলাটি তারা খেলেছে কুমিল্লা বার্ডে (এটি পল্লী উন্নয়ন অ্যাকাডেমি)। আছে কুমিল্লার কোঠবাড়িতে। বিশাল সেই মাঠে জয় দিয়ে তাদের শুরু হলো। এরপর ধাপে ধাপে তারা জেলার সেরা হলো, অপরাজিত! তাদের একসময়ের জেলার সেরা ক্রিকেট দল মডার্ন হাইস্কুলকেও হারিয়ে দিয়েছে। হেরেছে তাদের ব্যাট-বলের নৈপুণ্যের কাছে কুমিল্লা পুলিশ লাইনস হাইস্কুল, এথনিকা হাইস্কুলÑ এমনকি কুমিল্লা জিলা স্কুলও। এরপর শুরু হলো দ্বিতীয় রাউন্ড। নকআউট মানে হারলেই বাদÑ এই আসরের হলো শুরু।
সেখানে খেলা শুরু করল বাংলাদেশের সেরা জিলা স্কুল ক্রিকেট দল। প্রথম খেলাটি হলো এই বছরের ১৫ মার্চ। এটি কুমিল্লা হাইস্কুল দলের ছয় নম্বর খেলা ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইডিয়াল স্কুল দলের মুখোমুখি হলো কুমিল্লার চ্যাম্পিয়ন দল। তাতে পাঁচ উইকেটে হেরে গেল ব্রাহ্মণবাড়িয়া। পরের খেলাতে চাঁদপুরের আল আমিন অ্যাকাডেমি স্কুল দলকে ১১ রানের উত্তেজনার মধ্যে খেলা খেলে হারিয়ে দিল কুমিল্লা হাইস্কুল দল। এরপর হলো কোয়ালিফায়েড রাউন্ড। সেটি হলো চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে। ও বলাই হয়নি, সবগুলো খেলাই কিন্তু হয়েছে স্টেডিয়ামে। তাতে স্কুল দলগুলোর ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, অভিভাবক, খেলাপাগল মানুষ সবাই ছিলেন। তারা মন ভরে কিশোর সাকিব, শচীনদের খেলা দেখেছেন। আট নম্বর খেলায় জয় এলো কুমিল্লা হাইস্কুল দলের চট্টগ্রামের এশিয়ান স্কুলের সঙ্গে। তবে দাঁতে দাঁত কামড়ানো এই লড়াইয়ের আসরে তারা ২৬ রানে মোটে জিতেছে। পরের খেলায় অবশ্য তারা কলাতলী হাইস্কুল, কক্সবাজারকে ৮৯ রানের বিশাল পার্থক্যে হারিয়ে দিল। আগে ব্যাট করে শক্তিশালী এই দলটি রানের পাহাড় গড়েছিল। এরপর তারা জাতীয় পর্যায়ে খেলার টিকিট পেয়ে গেল।
রংপুর ক্রিকেট গার্ডেনে হলো খেলা। তাতে ১০ নম্বর ম্যাচ খেলতে নামল কুমিল্লা হাইস্কুল। সিলেটের পিডিবি হাইস্কুল তাদের কাছে হেরে গেল ৫৪ রানের দারুণ পার্থক্যে। এবার সেমিফাইনালে পৌঁছাল এই কিশোর দলটি। ১১তম ম্যাচ হলো ২১ এপ্রিল। পিরোজপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়কে তারা হারিয়ে দিল। রানের পার্থক্য মাত্র ৩৭। ফাইনালে ওঠার গর্বে সেদিন রাতে আর ঘুম হলো না কোনো খেলোয়াড়ের। তাদের কোচ, প্রধান শিক্ষক, সব শিক্ষক, মা-বাবা, শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক সবাই জয়ের গর্বে কখনো কাঁদছেন, কখনো নিজেরাই অবাক হয়ে যাচ্ছেÑ এও সম্ভব!
সেই ফাইনালটি হলো মাত্র দুদিন পর। ২৩ এপ্রিল। নিজের সব কাজ ফেলে ম্যানেজার হয়ে মাঠে চলে এলেন তাদের স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম। তখন তার মনে পড়ছে এই খেলোয়াড়দের শুরু থেকে আজকে পর্যন্ত আমি মাঠে ভালোভাবে খেলার ব্যবস্থা করেছি, সবগুলো জেলার ক্রীড়া সংস্থার সঙ্গে লড়েছি, অধিকার আদায় করেছি। পকেট থেকে টাকা দিয়ে তাদের ভালোভাবে খেলার, খাওয়ার ও থাকার ব্যবস্থা করেছি। তাদের কোনো ব্যাট, প্যাড, বল খারাপ দিইনি। আজকে তারা পারবে তো আমার মান সম্মান ধরে রাখতে? তার মনে ভয়। খেলোয়াড়দের কিন্তু সেটি নেই। চেনা রংপুর ক্রিকেট গার্ডেনে খেলতে এসেছে তারা।
বগুড়া পুলিশ লাইনস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের মুখোমুখি হলো আরেক দেশ সেরা কুমিল্লা হাইস্কুল। একটি দল রাজশাহীর, অন্যটি চট্টগ্রামের। টসে জিতে ব্যাটে নামল বগুড়া পুলিশ লাইনস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ দল। পুরো ৫০ ওভারের ম্যাচ। লক্ষ্য ছিলÑ আগে ব্যাট করে রানের পাহাড় গড়বে তারা। তবে ভালো বোলিংয়ের সামনে টিকতে না পেরে ৩৬ ওভার ২ বল খেলে ১১১ রান করে তাদের অলআউট হয়ে যেতে হলো। এই রান আরও চার ওভার কম খেলে ৩২ ওভার তিন বলে পার হয়ে গেল কুমিল্লার টাইগার টিম। তারা সাত উইকেটে এত রান করে তিন উইকেটে চ্যাম্পিয়ন হলো।
তাদের আসনের এমপি মানে সদরের সংসদ সদস্য (আসন কুমিল্লা-৬) ও মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম বাহাউদ্দিন (বাহার) সঙ্গে সঙ্গে খবর পেয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আহসান রোমেলকে ডাকলেন। বললেন, ‘আমি তাদের সংবর্ধনা দেব। সব ব্যবস্থা আপনাদের। খরচ আমার নিজের।’
ফলে কুমিল্লা জেলা ক্রীড়া সংস্থা তাদের জেলার ইতিহাসের সেরা কিশোর সাফল্য নিয়ে আসা দলকে ১৩ মে ফুলের মালা দিয়ে, সবার সামনে সম্মান দিয়ে বরণ করল। তাদের উপহারও দিয়েছিলেন সংসদ সদস্য। তিনি বলেছিলেন, ‘কুমিল্লা হাইস্কুল দলকে চ্যাম্পিয়ন করায় আমি স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি ও সম্মানিত শিক্ষকদের অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই। সারা দেশের সব স্কুলকে হারিয়ে আমাদের দল সেরা হয়েছেÑ এই সম্মান কুমিল্লাবাসী সারা জীবন মনে রাখবে।’
তখন তাদের বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলামের চোখে পানি। তিনি ভুলতে পারলেন না কত কষ্ট করেছেন। তখন কাঁদছেন তাদের কোচ নুরুল্লাহও। মনে মনে বললেন, ‘আমার চেয়েও ভালো ক্রিকেট কোচ অনেক দলেরই আছে। তবে আমি খেলা ছাড়া অন্য কিছু কোনো দিন বুঝিনি। আমার খেলোয়াড়রাও তেমন, যা বলেছি করেছে, যেভাবে চেয়েছিÑ খেলেছে।’ প্রধান শিক্ষকও তখন গর্বে ভাসছেন। হুমায়ূন কবীর স্যারের মনে পড়লÑ ‘প্রায় সব খেলায় ছিলাম। ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের মাঠে নিয়ে গিয়েছি। আর অনুশীলনের সময়ও তাদের খেলার সঙ্গে মাঠে থেকেছি। তাদের খাওয়া, ওষুধ খাওয়ানো, খেলার নানা কিছু যখন প্রয়োজন আলাদা ফান্ড থেকে দিয়েছি। পরামর্শের কোনো কমতি করিনি আমরা।’
সহকারী প্রধান শিক্ষক আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার মনে হলো, ‘আমাদের সবার কষ্টের ফল হলো এই অর্জন।’ সামনের বছরগুলোতে এই ফলাফল ধরে রাখার জন্য এখন থেকেই খেলাধুলায় সাহায্য আরও বাড়িয়ে দেওয়া হবে বলে জানালেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক, ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধানসহ সব শিক্ষক।
