মোহসীনা সেরা

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৯, ০১:০৮ এএম

২২টি পদক পেয়েছেন ভিকারুননিসা নূন স্কুলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হলের টেবিল টেনিসের পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন, পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের একবার তৃতীয় ও দুইবার দ্বিতীয়। মোহসীনা হোসেন আইইআরে ৩.৯১ সিজিপিএ নিয়ে বিভাগে প্রথম, পুরো অনুষদে চতুর্থ। লিখেছেন রিয়াজ হাসান, ছবি তুলেছেন মাসুম হক

মোহসীনা জেবিন তমার বাবা এমদাদ হোসেন, মা নাজমা হোসেন। বাবা ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। তারা তিন ভাই-বোন। বড় ভাই নাজিমুল ইসলাম রাতুল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ (ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ। এখন পৈতৃক ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এরপর তিনি মোহসীনা। পরে আরেক বোনÑ মোমতাহিনা জেবিন তাহিন। ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী।

ছোটবেলায় তারা ঢাকার মগবাজারের মধুবাগে থাকতেন। ভবনটিতে তার সমবয়সী তেমন কোনো মেয়ে ছিল না। ফলে ওই বয়সের ভবনে থাকা ছেলেদের সঙ্গেই তার ছোটকালের প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ছেলেদের বাইরের দুনিয়ার প্রতি আগ্রহ বেশি, খেলতে খেলতে বড় হয়, আশপাশে খেলে। ফলে মোহসীনাও তাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে, মিশতে মিশতে, খেলতে খেলতে খেলার প্রতি ভালোবাসা গড়ে ওঠে। তবে বাঙালি কোনো বাবাই মেয়েকে বাইরে খেলতে দিতে চান না। তারা চান ঘরের মধ্যেই মেয়ে খেলুক। তারপরও মেয়ের খেলতে ভালো লাগে বলে ফেরানো যায়নি। অতটুকু মেয়েকে বলে আর কী হবে ভেবে নিজেকে সামলে নিয়েছেন তিনি। মেয়ের প্রতি এমদাদ হোসেনের ভালোবাসাও প্রবল। এরপর তার এই মেয়ে মেধার জোরে ভর্তি হলো বাংলাদেশের অন্যতম সেরা নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসায়। প্রথম শ্রেণিতে পড়তে পড়তেই খেলার দিকে নজর চলে যায় এই ছোট্ট শিশুর। খেলা তার ভুবন। ফলে শিক্ষকরাও সাহায্য করতে লাগলেন মিষ্টি মেয়েটিকে। স্কুলের নানা প্রতিযোগিতা, খেলাধুলায় অংশ নিতে থাকেন তিনি নিয়মিত। তখন তো আর কোনো পুরস্কার বা প্রাপ্তি নয়, খেলাতেই ছিল তার আগ্রহ। এখনো তাই আছে। টানা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত নানা খেলায় নিয়মিত অংশ নিয়ে অবশেষে পুরস্কার পেলেন তিনি। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দড়ি লাফে তৃতীয় হলেন। সেদিন তার হাসিমুখ দেখে মা-বাবা, বড় ভাইও খুব খুশি হয়েছেন। এখনো সেই দিনের উজ্জ্বল স্মৃতিটুকু মনের কোণে ধরে রেখেছেন তিনি। তবে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিখ্যাত লোগোসহ পাওয়া ক্রেস্টটি এখনো সংগ্রহে ধরে রাখতে পারেননি তিনি। কোনো একদিন ভেঙে গেছে বেখেয়ালে। সেটির দুঃখ ভুলতে পারেননি মোহসীনা। সেই দুঃখ থেকেই ভবিষ্যতে আরও ভালো করার প্রেরণা পেয়ে এখনো উজ্জ্বলভাবে অংশ নিচ্ছেন খেলার ভুবনে।

খেলায় যেমন ভালো, পড়ায় প্রথম দিকে তেমন একটি ভালো ছিলেন না তিনি। নিয়মিত ভালো ফল করে গিয়েছেন সত্য, কিন্তু ভিকারুননিসার আরও অনেক ভালো ছাত্রীর ভিড়ে আলাদা ছিলেন না তখন। নজর তো খেলা আর ভালোভাবে পড়ার দিকেই। ফলে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির বৃত্তিতে নাম গেল না তার স্কুলের পক্ষে। নবম শ্রেণিতে উঠে বিজ্ঞান বিভাগের পড়ার চাপ তাকে পেয়ে বসল। এবার আর ফাঁকি দিলেন না। পড়তে লাগলেন নিয়মিত, আরও মনোযোগ দিয়ে। ২০১১ সালের এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ফাইভ নিয়ে পাস করলেন। তবে খেলাতে কোনোভাবেই ‘আড়ি’ ঘটেনি তার। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী হিসেবে স্কুল ও কলেজ শাখায় পড়েছেন তিনি। লং জাম্প, হাই জাম্প, ডিসকাস থ্রো, দড়ি লাফসহ স্কুলের সব খেলায় অংশ নিয়েছেন মোহসীনা হোসেন। অবিশ^াস্য হলেও সত্য ‘২২’টি পুরস্কার পেয়েছেন। এগুলোর মধ্যে ২১টি এখনো তাদের বাড়ির শোকেসে সাজানো আছে পরম যত্নে। এই অর্জনগুলোই তাকে মা-বাবার চোখে আরও ভালো করে তুলেছে। বাবা এখন মেয়ে বলতে অজ্ঞান, যেকোনো মানুষকে তার গল্প করেন। পুরস্কারগুলো নিজেরা অবসরে দেখেন। খেলতে গেলে বিজ্ঞানে পড়া ঝক্কির, আবার এই বিভাগটি কেন যেন তার খুব ভালো লাগত না। ফলে ‘ঘ’ ইউনিটে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভালো কোনো বিষয়ে পড়ার খুব ইচ্ছে হলো মোহসীনার। ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ^াসী, মেয়ে নয়, মানুষের মতো মানুষের চোখে দেখতে চান। সারা জীবন চার দেয়ালের হাতছানিতে ও পরিবারের অনুশাসনে বন্দি মোহসীনা সেই তরুণী বেলার শুরুতেই বুঝতে পেরেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়তে পারলে কিছুটা হলেও ব্যক্তিস্বাধীনতা পাওয়া যাবে। খুব মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া শুরু করলেন। সুযোগ পেলেন, কিন্তু সারাক্ষণ, সারা জীবন পড়া নিয়ে থাকেননি বলে সুযোগ হলো একটু পেছনে। অর্থনীতিতে ইচ্ছে ছিল, সুযোগ হলো আইইআরে (শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট)। ২০১৩-২০১৪ সেশনের ছাত্রী হলেন তিনি। পড়তে পড়তে এই বিভাগের অন্য রকমের ভালোবাসা, পারিবারিক পরিবেশ তার খুব ভালো লাগে। বাংলাদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রের অনেক নামকরা শিক্ষক, গবেষক এই বিভাগের অধ্যাপক। তারা খুব ছাত্রবান্ধব। বিষয়টিও খুব ভালো। তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে ছড়ানো গবেষক, শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী, সরকারি কর্মকর্তাদের মতো একটি জীবন তিনিও পেতে পারেন। জানালেন মোহসীনা। তার বিভাগ হলোÑ ‘শারীরিক শিক্ষা’।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই খেলার পুরনো জীবনে ফিরে গেলেন তিনি। অনাবাসিক ছাত্রী হলেন কবি সুফিয়া কামাল হলের। উচ্চ শিক্ষা জীবনের প্রথম সেশনেই এই হলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেন তিনি। প্রথম অংশ নিয়েই কয়েকটি পুরস্কার জয় করলেন। বাসায় তাদের টেবিল টেনিস আছে, দুই ভাইবোন মিলে বিকেলে খেলেন। রাতুলই বোনকে খেলা শিখিয়েছেন। তাদের ইনস্টিটিউটে ও শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে বন্ধু নাঈম হোসেন ও দিব্য প্রভাসের সঙ্গে খেলাটি আরও রপ্ত করে ফেললেন তিনি। এই পর্যন্ত ছয় বছরে কবি সুফিয়া কামাল হলের টেবিল টেনিসে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন মোহসীনা হোসেন। এই অবিশ^াস্য অর্জন অনেক বছর হলের মেয়েদের কাছে তাকে হিরোর মর্যাদা দেবেÑ জানাতেই তাকিয়ে থাকলেন তিনি। আন্তঃহল হাই জাম্প, ডিসকাস থ্রো, রিলে রেসেও তার পুরস্কার আছে। হলের ভেতরে মেয়েদের সাইকেল চালানোর নতুন প্রতিযোগিতায় তিনি দুইবারের চ্যাম্পিয়ন। আজ থেকে তিন বছর আগে, ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তঃহল টেবিল টেনিসে তিনি পুরো সুফিয়া কামাল হলের চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। তখন মোহসীনা তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। পরের দুই বছরেও তাকে হারাতে পারেনি কেউ। এখনো তিনিই সেরা। ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্রী হয়ে হলের অনেক সেরা খেলোয়াড়ের ভিড়ে খেলতে গিয়ে তার ভয় করেছিলÑ অভিজ্ঞতা থেকে বললেন। আগে কোনো খেলা না খেলায় তিনি মূল একাদশে ছিলেন না, বাড়তি খেলোয়াড় হিসেবে খেলতে নামতেও পারেননি। তবে ফাইনালের দিন সুযোগ পেলেন। তাদের প্রতিপক্ষে ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় টেবিল টেনিস দলের নারী খেলোয়াড়রা। তাই এই দল তো জিততে পারবে নাÑ এই ভেবে তাকে খেলতে বলা হলো। আগে খেলেননি বলে অভিজ্ঞতার কাছে তারা হেরে গেলেন, কিন্তু মোহসীনার খেলা এত ভালো হয়েছে যে তারপর থেকে তিনি নিয়মিত সদস্য হয়েছেন। আন্তঃহলে সেরা এই মেয়েকে নিয়ে মায়ের তো বটেই, বাবারও অনেক গর্ব। তিনি তার খেলার অন্যতম দর্শক। তাই মেয়েও খুব সাহস পান এখন। টেবিল টেনিসে এত সাফল্যের রহস্য কী? বললেন, ‘এই জীবনে আমাকে অসংখ্য ম্যাচ খেলতে হয়েছে। আরও অনেক খেলতে হবে ভবিষ্যতে। তবে কোনোদিনই কোনো ম্যাচের আগে আমি সাহস হারাইনি। কোনো ম্যাচেই যতই পেছনে থাকি না কেন, আমার কোনো টেনশন হয় না। আমি জানি আমি পারি, যেকোনো মুহূর্তে খেলায় ফিরতে পারব। সেই চেষ্টাই খেলতে খেলতে করি। আর সেরাটি দেওয়ার চেষ্টা তো সবাই-ই করেন।’ এই অসাধারণ খেলোয়াড় ছাত্রীটিকে তার হল ‘কবি সুফিয়া কামাল হল ট্রাস্ট গোল্ড মেডেল’র জন্য মনোনীত করেছে। এই পুরস্কারও তিনি পেয়ে যাবেন বলে আশাবাদী। আন্তঃবিশ^বিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতাতেও এই খেলায় তার অনেক সাফল্য। দুইবারের রানার্স আপ, একবারের তৃতীয়। ফলে টেবিল টেনিসে তিনি উজ্জ্বল নাম। থিসিস করার জন্য লেখাপড়ায় ব্যস্ত বলে তিনি আগের মতো খেলায় সময় দিতে পারেন না। তবে সামনের বছর চ্যাম্পয়ন হতে চান তিনি। সেইজন্য প্রস্তুতিতে খুব ঘাটতি রাখেন না। ‘আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশিপ ২০১৯’Ñএও অংশ নিয়েছেন তিনি। সেখানেও তার খেলার বিভাগ ছিল প্রিয় টেবিল টেনিস। নারীদের ডাবলস বিভাগে তিনি দলকে রানার্স আপ করিয়েছেন আর মিডক্স ডাবলসে তারা হয়েছেন তৃতীয়। মানে রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক নিয়ে এবার ফিরেছেন তারা। ‘আসলে অনুশীলনে ঘাটতি থাকায় আমাদের স্বর্ণজয় হয়নি’Ñ মনের দুঃখে বলে দিলেন মোহসীনা হোসেন। ফের জানালেন, মাস্টার্সে লেখাপড়ায় খুব মনোযোগ দিতে হয়, পড়ার চাপও অনেক। তাই আমাদের এই হাল।’ ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি। ‘তাদের ভেন্যুতে অনেক দর্শকের সামনে খেলেছে বলে আমরা মানসিকভাবে পিছিয়ে ছিলাম’, বলতে ভুললেন না তিনি।‘খেলাধুলায় এত অর্জনের মূল কারণ হলো ইচ্ছেশক্তি’Ñ মোহসীনা তাই বললেন। তবে জানালেন, ‘মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে অনেক কম প্রতিযোগিতায় খেলতে পারে বলে তাদের খেলার সুযোগ কম থাকে। তবে তাদের সাফল্য আসে পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছেশক্তির কারণে। তারা চারপাশের বাধা, মানুষের টিপ্পনি ও অসহযোগিতাকে পেছনে ফেলে আগায়। ছেলেরা এই জায়গাগুলোতে অনেক সহযোগিতা পায়।’ তবে তিনি দুই ভুবনকে যতটুকু পেরেছেন গুরুত্ব দিয়েছেন। তাতে তার খুব কষ্ট হয়েছে সত্য। তারপরও অর্জন হয়েছে অনেক। অনার্সে তার সিজিপিএ অবিশ^াস্যÑ ৩.৯১! শারীরিক শিক্ষা বিভাগে তিনি সবচেয়ে বেশি স্কোরার। আর আইইআরের মধ্যে তিনি চতুর্থ সর্বোচ্চ ফলাফল করেছেন। বিভাগের শিক্ষকদের কথা তো শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করলেনই, তাদের বাইরে অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমানের সাহায্যের ও সমর্থনের কথা বলতে ভুললেন না। খেলার গুরু বড় ভাই রাতুল, কোচ তাওহীদ সিহানের কথা বলতে বলতে চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল তার। এখনো খেলার মৌসুমে নভেম্বর ডিসেম্বরে তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে চার ঘণ্টা করে অনুশীলন করেন রবি থেকে বৃহস্পতিবার। শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে আমাদের অনুশীলন সামগ্রীরও বড় অভাব। এত সাফল্যের নায়িকা হয়েছেন তিনি মায়ের ভালোবাসায়। নাজমা হোসেন যখন প্রয়োজন মেয়েকে সাহায্য করেছেন। মোহসীনা ইউনিসেফ বা ব্র্যাকের মতো বিরাট কোনো উন্নয়ন সংস্থার কর্মী হবেন। খেলা ছাড়বেন না কোনোদিন। খেলা মানুষকে সুস্থ রাখে, আত্মবিশ^াস জন্মায়। পড়ায় ও জীবনের সাফল্যের জন্য এগুলো খুব প্রয়োজনীয় গুণ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত