ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ফলে দেশটিকে তাদের পোশাকের অর্ধেকেরও বেশি গন্তব্যস্থল ইইউভুক্ত দেশে রপ্তানিতে এখনকার মতো আর শুল্ক গুনতে হবে না। এতে ইউরোপের বাজারে ভিয়েতনামের পোশাকের দর কমবে ও বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে বলে জানিয়েছেন পোশাক রপ্তানিকারকরা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ইইউভুক্ত ২৮টি দেশে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশকেও কোনো শুল্ক দিতে হয় না। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জিএসপি সুবিধা না থাকায় ইউরোপে ভিয়েতনামের পণ্যে এখন ৮-৯ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ রয়েছে। ফলে একই
মানের ও দামের পোশাক রপ্তানির পর বাংলাদেশি পোশাকের দর ভিয়েতনামের চেয়ে ৮-৯ টাকা কম থাকছে। এফটিএ কার্যকরের পর এ ব্যবধান আর থাকবে না।
তারা বলছেন, আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ইউরোপে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এরপর উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ হলে সুবিধাটি আর থাকবে না। তখন জিএসপি প্লাস সুবিধা না পেলে বাংলাদেশকে ইউরোপে শুল্ক পরিশোধ করে রপ্তানি করতে হবে। ওই সময় ইউরোপে রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পণ্যমূল্য ভিয়েতনামের চেয়ে বেড়ে যাবে। তখন বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত ৩০ জুন ইইউ’র সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষর করে ভিয়েতনাম। প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে আলোচনার পর হ্যানয়ে চুক্তিটি সই করেন ইইউ ট্রেড কমিশনার সিসিলিয়া মামস্ট্রম ও ভিয়েতনামের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী ট্রান তুয়ান আন। চুক্তির আওতায় ভিয়েতনামের ৯৯ শতাংশে পণ্যে ট্যারিফ কমাবে ইইউ। এশিয়ার উন্নয়নশীল কোনো দেশের সঙ্গে ইইউ’র স্বাক্ষর করা প্রথম এফটিএ এটি। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অনুমোদনের পর চুক্তিটি কার্যকর হবে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় বাজার ইইউ। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের ৬০ ভাগই আসে ইইউভুক্ত ২৮টি দেশ থেকে। বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৯ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ইউরোপে ২১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের পর ইইউতে সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করে ভিয়েতনাম। ইউরোপে দেশটির প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক ও ফুটওয়্যার। ২০১৮ সালে ৪২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ইউরোপে রপ্তানি করেছে ভিয়েতনাম। এফটিএ স্বাক্ষরের ফলে ২০২০ সাল নাগাদ ইউরোপে রপ্তানি ২০ শতাংশ বাড়বে বলে আশা করছে ভিয়েতনাম সরকার। তারা বলছে, এ চুক্তি বাস্তবায়ন হলে ২০২৩ সাল নাগাদ ভিয়েতনামের জিডিপি ২ দশমিক ১৮ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং ২০২৪-২৮ সালে ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ বাড়বে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান গতকাল শুক্রবার চীন থেকে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভিয়েতনামের শুল্ক কমলে তারা ইউরোপে আরও বেশি পোশাক রপ্তানি করতে পারবে। কারণ তখন ইউরোপে ভিয়েতনামের পোশাকের দাম এখনকার চেয়ে কমে যাবে। আর ভিয়েতনামের রপ্তানি যত বাড়বে, বাংলাদেশে রপ্তানির হিস্যা ততই কমবে। তাই ভিয়েতনামের সঙ্গে ইউরোপের এফটিএ’র কারণে বাংলাদেশের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তা চোখ বন্ধ করে বলা যায়।’
তিনি বলেন, ‘রপ্তানি সক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশের চেয়েও ভালো অবস্থায় রয়েছে ভিয়েতনাম। দেশটিতে এ খাতে বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আসছে। ভিয়েতনামে একটি কারখানা স্থাপনের সময় থেকে সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে উৎপাদন শুরু করতে পারে। আর বাংলাদেশে একটি ১০তলা ভবন করতেই দু’বছর সময় লেগে যায়। ভিয়েতনাম সর্বোচ্চ ৭-৮ দিনের (লিড টাইম) মধ্যে রপ্তানিপণ্য জাহাজীকরণ করতে পারে। বাংলাদেশে এক্ষেত্রে সময় লাগে ২২ দিনের মতো।’
এ বিষয়ে বিজিএমইএ’র সহসভাপতি ফয়সাল সামাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইইউ আমাদের প্রধান বাজার। অন্যদিকে ভিয়েতনাম পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই ইইউ-ভিয়েতনাম এফটিএ’র কারণে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই। কারণ ভিয়েতনামের পোশাকের সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাকের ভিন্নতা রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পরও বাংলাদেশ জিএসপি প্লাস সুবিধার আওতায় ইউরোপে শুল্কমুক্তভাবে রপ্তানি করতে পারে সে বিষয়ে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি এখন ১০ শতাংশের মতো। এটি ধরে রাখতে হলে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন জরুরি। এছাড়া বাংলাদেশকে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ’র বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। নতুন নতুন বাজারে রপ্তানি বাড়াতে হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পরও বাংলাদেশ যাতে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ইইউতে রপ্তানি করতে পারে সে জন্য জিএসপি প্লাস পাওয়ার চেষ্টা চলছে। এজন্য ২৭টি শর্তের মধ্যে শিশুশ্রম নিরসনের শর্তটি বাদে বাকি ২৬টিতে সই করেছে বাংলাদেশ। গত জানুয়ারি মাসে ইইউ’র একটি প্রতিনিধিদল এ বিষয়ে বাংলাদেশ সফর করেছে। আগামী সেপ্টেম্বরে আরেকটি প্রতিনিধিদলের আসার কথা রয়েছে।
