গত পহেলা জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে নতুন অর্থবছরের বাজেট। এর আগের দিন (৩০ জুন ২০১৯) জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব। এর আগে শনিবার কিছু সংশোধনী এনে অর্থবিল অনুমোদন করা হয়। নতুন বছরের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট পেশ করা হয়েছিল গত ১৩ জুন। আজকের শিশুরা আগামীর ভবিষ্যৎ। শিশুকল্যাণে আজকের বিনিয়োগ বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশে শিশুদের সংখ্যা প্রায় ৬৬ লাখ। আর তাই এবারের বাজেটেও আগের বছরগুলোর মতো জাতীয় বাজেটে শিশুদের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের জন্য শিশুকেন্দ্রিক বাজেট উপস্থাপন করেন। এরপর চারবার শিশুকেন্দ্রিক বাজেট উপস্থাপন করা হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৫টি মন্ত্রণালয়ের জন্য শিশুকেন্দ্রিক বাজেট উপস্থাপন করেন। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তারই ধারাবাহিকতায় এ বছর আটটি মন্ত্রণালয় ও সাতটি বিভাগের জন্য শিশুকেন্দ্রিক বাজেট প্রস্তাব করেন। উল্লেখ্য, এ বছর পঞ্চমবারের মতো শিশুদের জন্য পৃথক বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো হলোÑ ১. প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, ২. কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, ৩. মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, ৪. স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, ৫. স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, ৬. মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ৭. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ৮. সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, ৯. স্থানীয় সরকার বিভাগ, ১০. শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, ১১. জননিরাপত্তা বিভাগ, ১২. তথ্য মন্ত্রণালয়, ১৩.
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ১৪. যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং ১৫. আইন ও বিচার বিভাগ।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত শিশুকেন্দ্রিক বাজেট ছিল ৬৫ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ৮০ হাজার ১৯০ কোটি টাকার পৃথক শিশুকেন্দ্রিক বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, গত অর্থবছরের চেয়ে এই অর্থবছরে শিশুকেন্দ্রিক বাজেটে বরাদ্দ বেড়েছে ১৪ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে তুলনা করলে ২০১৯-২০ অর্থবছরে নির্বাচিত ১৫টি মন্ত্রণালয়ের
প্রস্তাবিত বাজেট বেড়েছে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু শিশুকেন্দ্রিক বাজেট প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে প্রায় ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাজেট বক্তৃতায় বলেন, শিশুকেন্দ্রিক বাজেট বৃদ্ধিতে সরকারের অগ্রাধিকার অব্যাহত আছে। বিগত অর্থবছরের তুলনায় ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে শিশুকেন্দ্রিক বাজেট প্রস্তাব উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের জাতীয় বাজেটের প্রবৃদ্ধির তুলনায় শিশুকেন্দ্রিক বাজেট প্রবৃদ্ধি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর ফলে নির্বাচিত মন্ত্রণালয়গুলোর মোট বাজেটের অনুপাতে শিশু সংবেদনশীল বরাদ্দও আগের অর্থবছরের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বেড়ে ৪৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ হয়েছে। সরকারের বাজেটে শিশুকেন্দ্রিক বাজেটের হিস্যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৩৩ শতাংশে। জিডিপির অনুপাতে শিশুকেন্দ্রিক কার্যক্রমে বাজেট বরাদ্দের হার গত এক বছরে ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘে শিশুসনদ ১৯৯০ গৃহীত হওয়ার বহু আগেই বাংলাদেশে শিশু আইন ১৯৭৪ দেশীয় আইন হিসেবে গৃহীত হয়েছে। পরে বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশুসনদ ১৯৯০ স্বাক্ষর করে এবং ফলে বাংলাদেশ শিশু আইন ২০১৩ প্রণয়ন করে। সংবিধানের আলোকে শিশুদের জন্য বাংলাদেশ ‘জাতীয় শিশু নীতি ২০১১’-ও গ্রহণ করা হয়।
এবারের বাজেটে শিশু স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামোর সম্প্রসারণ ও গুণগত উন্নয়নে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিশুমৃত্যু রোধ, কম বয়সী শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, অপুষ্টির শিকার অঞ্চলগুলোতে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ কর্মসূচির বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এবারের বাজেটে শিশু সুরক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। দরিদ্র ও ঝুঁকির মুখে থাকা শিশুদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, যাতে করে স্কুল থেকে ঝরে পড়া, অনিরাপদ স্থানান্তর, শিশুশ্রমে যুক্ত, যৌনপল্লীতে ও পথে বসবাসকারী শিশুদের সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব হয়।
শিশুকল্যাণ বিষয়টি যে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে, তার প্রতিচ্ছবি আমরা দেখতে পাচ্ছি শিশুকেন্দ্রিক বাজেট উপস্থাপনের মাধ্যমে। নিঃসন্দেহে সাধুবাদের বিষয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এই যে এত সব স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি শিশুকল্যাণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, সেগুলোর সঠিক সমন্বয়, বাস্তবায়ন এবং তত্ত্বাবধান করবে কে? আটটি মন্ত্রণালয় ও সাতটি বিভাগের যে শিশুকেন্দ্রিক বাজেট প্রণীত হলো, তাতে নিশ্চয়ই বেশ কয়েকটি প্রকল্পের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। প্রকল্পগুলো যেন একে অপরের প্রতিযোগিতামূলক না হয়ে পরিপূরক হয়ে ওঠে, সেটাও তো দেখার একটি বিষয়। অন্যথায় জাতীয় আয়ের অপচয় হতে বাধ্য। আর এ কারণেই দরকার একটি পৃথক শিশু অধিদপ্তর।
পৃথক শিশু অধিদপ্তর থাকলে শিশুকল্যাণমূলক প্রকল্পসমূহের সমন্বয়, বাস্তবায়ন এবং তত্ত্বাবধান অনেক সহজে করা সম্ভব হবে। জাতীয় আয়ের অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে। অনেকের মতে, শিশু সুরক্ষা ও উন্নয়নে বাজেটে শুধু বরাদ্দ দিলেই হবে না, এই বরাদ্দ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে সমন্বয় এবং মনিটরিং করতে হবে। শিশুদের জন্য বরাদ্দের বিষয়টি সরকারকে জনসম্মুখে তুলে ধরে সেখান থেকে পরে কী পরিমাণ ব্যয় হয়, তাও জনগণকে জানাতে হবে। এই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে পুরো ‘শিশুকেন্দ্রিক বাজেট’ প্রণয়ন ব্যাপারটি-ই একটি প্রহসনে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। আর সেটি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা কেউই চাই না। তাই পৃথক ‘শিশু অধিদপ্তর’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
