বিনিয়োগকারীরাই হলো বাজারের মূল চালিকাশক্তি। তাই তাদের সচেতনতার বিষয়টি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ার ক্ষেত্রে অন্যতম পূর্বশর্ত। জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ে, নিশ্চিত হয় পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা। গতকাল রাজধানীতে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গতকাল সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) আয়োজিত ‘রিজিওনাল সেমিনার অন ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট প্রটেকশন’ শীর্ষক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও বক্তব্য দেন এসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন ও এডিবির আবাসিক প্রতিনিধি মনমোহন প্রকাশ। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই সেমিনারে জাপান, মালয়েশিয়া, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ ৯টি দেশের পুঁজিবাজার ও মুদ্রাবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশে শিল্পায়নের মাধ্যমে অধিক হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। এই শিল্পায়নের জন্য দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগের প্রয়োজন। আমরা বিশ^াস করি পুঁজিবাজারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ও বিনিয়োগে অংশীদার করা সম্ভব। ফলে, যত বেশি মানুষ পুঁজিবাজারে সম্পৃক্ত হবে, আমাদের শিল্পায়ন তত বেশি ত্বরান্বিত হবে।’
চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারির পর থেকে দীর্ঘ দরপতনের সময়ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতায় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশের অভ্যন্তরে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থের জোগান দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গঠনে কাজ করে যাচ্ছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিনিয়োগকারীদের করমুক্ত লভ্যাংশ আয়ের সীমা ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। নতুন ফিক্সড ইনকাম ফিন্যান্সিয়াল প্রডাক্টসহ বিভিন্ন ধরনের বন্ড প্রচলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শর্টসেল ও রিস্ক বেইস ক্যাপিটালসংক্রান্ত দুটি বিধি প্রণয়ন করা হয়েছে। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তোলার জন্য সরকার ধারাবাহিকভাবে নীতি সহায়তা, আইনি সংস্কার, অবকাঠামো নির্মাণসহ নানাবিধ সহযোগিতা দিয়ে আসছে। পুঁজিবাজারের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম দূর করে জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা হয়েছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, দেশের পুঁজিবাজার এখনো ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর ওপর নির্ভরশীল। শক্তিশালী পুঁজিবাজার গঠনের জন্য দৈনন্দিন লেনদেনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা উচিত। একটি জ্ঞাননির্ভর বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যারা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেন, তাদের কাছে একটা অনুরোধ করব, আপনারা যখন বিনিয়োগ করতে যান, যে টাকা উপার্জন করেন তার সবটুকু খরচ করে ফেলবেন না। কিছু টাকা জমা রেখে তারপর খরচ করবেন। কারণ অনেক সময় দেখা যায় যে যতটুকু পাওয়া গেল আরও বেশি পাওয়ার লোভে সবটুকুই খরচ করে ফেললে শূন্য হয়ে যেতে হয়। সেটা যেন না হয়। এ জন্য যা-ই উপার্জন করেন, কিছু হাতে রাখবেন, জমা রাখবেন। কিছু খরচ করবেন। তাহলেই আমার মনে হয় আপনাদের আয় স্থিতিশীল থাকবে।’
বিনিয়োগকারীরাই বাজারের মূল চালিকাশক্তি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তাদের সচেতনতার বিষয়টি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ার ক্ষেত্রে অন্যতম পূর্বশর্ত। জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করলে একদিকে যেমন প্রত্যেকের বিনিয়োগ-ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ে, অন্যদিকে নিশ্চিত হয় পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা। ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ-ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। অন্যান্য প্রচেষ্টার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার দিকটি অধিকতর নিশ্চিত হয়ে একটি বিকশিত পুঁজিবাজার গড়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
সম্মেলনে এসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, পুঁজিবাজারে জ্ঞানভিত্তিক বিনিয়োগ করার সক্ষমতাই বিনিয়োগকারীদের প্রধান পুঁজি; যা অর্থের চেয়ে অনেক মূল্যবান। এই সক্ষমতা বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগকে সুরক্ষা দেয়, যা সঠিক দর নির্ধারণ ও কার্যকরী বিনিয়োগে উৎসাহিত এবং বৈদেশিক পোর্টফোলিও বিনিয়োগে আকর্ষণ করে।
খায়রুল হোসেন বলেন, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেওয়া কমিশনের প্রধান উদ্দেশ্য। তাদের সুরক্ষায় আমরা ৮টি বিষয় অনুসরণ করি। এর মধ্যে রয়েছেÑজ্ঞানভিত্তিক বিনিয়োগ, সঠিক রুলস রেগুলেশনস গঠন, বিনিয়োগের জন্য বিকল্পের সহজলভ্যতা, কোম্পানির বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রকাশ, সুশাসন নিশ্চিত করা, প্রাইমারি মার্কেটে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং শক্তভাবে গুজব ও ইনসাইডার ট্রেডিংয়ে নজরদারি রাখা।
খায়রুল হোসেন বলেন, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় স্টক এক্সচেঞ্জও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। এ ছাড়া কোম্পানি আইনও ভূমিকা রাখে। গত দুই বছরে স্টেকহোল্ডার ও সরকারের সহযোগিতায় অনেকগুলো সংস্কার করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুশাসন নিশ্চিত, নতুন বিনিয়োগ পণ্যের পরিচিতি করতে এই সব সংস্কার করা হয়েছে, যা শক্তিশালী পুঁজিবাজার গঠনে সহযোগিতা করেছে।
এডিবির আবাসিক প্রতিনিধি মনমোহন প্রকাশ বলেন, অর্থবাজার, বিশেষ করে ক্রমেই জটিল ও দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ই-পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম, ব্লকচেইন প্রযুক্তি অথবা সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) ব্যবহার এবং আরও দ্রুত ক্রস বর্ডার আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় পরিবর্তন হচ্ছে। আমি সন্তুষ্ট যে এডিবির কর্মসূচির আওতায় সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) সম্প্রতি ডেরিভেটিভস, সুকুক ও শর্ট সেলিংয়ের জন্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো চালু করেছে। এই নতুন নিয়ন্ত্রক শাসনব্যবস্থার সুবিধা নিতে আর্থিক শিক্ষা প্রয়োজন, যা বিনিয়োগকারীর ব্যবহারে পরিবর্তন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই কর্মশালায় বিনিয়োগ শিক্ষা ও বিনিয়োগকারী সুরক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা সময়োপযোগী।
