উন্নয়ন চাইলে গ্যাসের দাম মেনে নিতে হবে

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৯, ০১:১৪ এএম

গ্যাসের দাম বাড়ানো কেন জরুরি সে বিষয়ে সরকারের যুক্তিগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি চাইলে আন্দোলন না করে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি মেনে নিতেই হবে।

গতকাল সোমবার সাম্প্রতিক চীন সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। সরকারপ্রধান এ সময় ধর্ষণের বিরুদ্ধে নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর না করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। চীন সফরে রোহিঙ্গা বিষয়ে চীনের প্রধানমন্ত্রীর আশ^াসের বিষয়টি তুলে ধরেন। বিশ^কাপে ক্রিকেট নিয়ে দেশের খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে বিষোদগার না করে তাদের উৎসাহ দেওয়ার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে চীন সফর নিয়ে তার কার্যক্রম তুলে ধরেন। এরপর বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এবং এর প্রতিবাদে আন্দোলনের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত কী হবে এই প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের আগে ঠিক করতে হবে, তাদের গ্যাসের প্রয়োজন আছে কি না। তিনি বলেন, ‘আপনারা লক্ষ করে দেখবেন ২০০৮ সাল পর্যন্ত জিডিপি কত বেড়েছে। আমরা ৮ দশমিক ১ ভাগ পর্যন্ত জিডিপি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। আমরা এটা পেরেছি কারণ, এনার্জি ক্ষেত্রে যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েছি। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পেরেছি। তবে গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। এলএনজি আমদানিতে খরচ বেশি পড়ে। গ্যাসের দাম না বাড়ানোর দুটি উপায় আছে। আমরা জিডিপি না বাড়াই, এলএনজি আমদানি করব না

গ্যাসের দামও বাড়বে না। আরেকটি হলো উন্নয়ন হবে না। আর যদি সত্যি অর্থনৈতিক উন্নতি চান, তাহলে এটা মেনে নিতেই হবে।’  

শেখ হাসিনা বলেন, ‘শুধু আমাদের দেশে না, বিদেশেও গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। ২০০০ সালে আমার কাছে একটা প্রস্তাব এসেছিল গ্যাস বিক্রি করব কি না, আমি রাজি হইনি। এর খেসারত দিতে হয়েছিল। আমি ২০০১ সালে ভোট বেশি পেয়েও কিন্তু ক্ষমতায় আসতে পারিনি। খালেদা জিয়া মুচলেকা দিয়েছিল, ক্ষমতায় এলে গ্যাস বিক্রি করবে। আমি চাই গ্যাস আমার দেশের মানুষের কাজে লাগবে। দেশের জন্য রিজার্ভ রাখব। তারপর যদি বাঁচে তাহলে বিক্রি করব। তবে কত গ্যাস আছে আমাকে জানতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিতে হবে। এর জন্য এলএনজি আমদানি করতে হবে।’

তিনি বলেন, প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানিতে আমাদের খরচ পড়ে ৬১.১২ টাকা। সেটা এখন আমরা কত টাকায় বিক্রি করছি? এর চেয়ে কম দামে কী দেওয়া যায়? অনেকে আন্দোলন করে বলেছেন ভারতে দাম কমেছে। ভারতে এলাকাভেদে গৃহস্থালির জন্য গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৩০ থেকে ৩৭ টাকা। বাংলাদেশ দিচ্ছে ১২.৬০ টাকা। শিল্পে আমরা দিচ্ছি ১০.৭০ টাকা, ভারত দিচ্ছে ৪০ থেকে ৪২ টাকা। বাণিজ্যিকে আমরা দিচ্ছি ২৩ টাকা। ভারত দিচ্ছে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা। ভারতে প্রতি বছর দুইবার গ্যাসের দাম এডজাস্ট করে, এপ্রিলে আর অক্টোবরে। সেই নীতিতেই তারা চলে। আমরা ৬১.১২ টাকা নিয়ে এসে এলএনজি দিচ্ছি ৯.৮০ টাকায়। তারপরেও আন্দোলন!

ধর্ষণের বিরুদ্ধে নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও আওয়াজ তুলতে হবে

ধর্ষণকারীদের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, শিশু ধর্ষণের মতো মহা জঘন্য কাজ যারা করছে তারা মানুষ না। এদের বিরুদ্ধে যা যা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার আমরা সবই  নেব। এ সময় ধর্ষণের বিরুদ্ধে নারীদের পাশাপাশি পুরুষ সমাজকেও আওয়াজ তোলার আহ্বান জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে ধর্ষণের মতো ঘটনা পৃথিবীর সব দেশেই ঘটে। আমাদের দেশে একটা সময় ছিল যে সামাজিক কারণে মেয়েরা বিষয়টা বলতেই পারত না। এখন তারা সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে এ বিষয়ে কথা বলছে। সোচ্চার হচ্ছে। আমরা এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে ধর্ষকদের ধরা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে আমরা যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ প্রসঙ্গে ওয়ারীতে শিশু ধর্ষণের ঘটনার পরপর ধর্ষককে গ্রেপ্তার করার উদাহরণ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের মহা জঘন্য কাজ যারা করছে এরা মানুষ না। এদের বিরুদ্ধে যা যা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার আমরা সবই নেব। এ সময় ধর্ষণের বিরুদ্ধে নারীদের পাশাপাশি পুরুষ সমাজকেও আওয়াজ তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু নারীদেরই প্রতিবাদ করতে হবে কেন। যারা ধর্ষণ করছে তাদের স্বজাতি হিসেবে পুরুষদের এর বিরুদ্ধে এগিয়ে আসা উচিত।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চীন মিয়ানমারকে রাজি করানোর চেষ্টা করবে

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের অবস্থান প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবারও মিয়ানমারে যাবেন। বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারকে সম্মত করতে চেষ্টা করবেন বলে আমাকে আশ্বস্ত করেছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী। চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা। তিনি বলেন, ‘আমি উন্নয়নের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করি। রোহিঙ্গা সংকটের কারণে এ শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিঘিœত হতে পারে বলে আমি উল্লেখ করি।’

রাখাইনকে বাংলাদেশের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাখ্যান

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের ভূখ-ে যুক্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এক কংগ্রেসম্যানের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে শেখ হাসিনা বলেন, এ ধরনের কথা বলা অত্যন্ত গর্হিত ও অন্যায় কাজ। তিনি বলেন, আমাদের যে সীমানা আছে আমরা তাতেই খুশি। এর বাইরে আর কোনো প্রদেশ জুড়ে দেওয়ার ব্যাপার আমরা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করি। এটা আমরা কখনোই নেব না। মিয়ানমার তার সার্বভৌমত্ব নিয়ে থাকবে, সেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সীমানা জুড়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ আসে কেন? তিনি বলেন, এসব কথা না বলে বরং মিয়ানমার কীভাবে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, এই কংগ্রেসম্যানদের সে বিষয়ে কাজ করা উচিত।

চাকরির বয়স ৩৫ না করার পক্ষে যা যুক্তি তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী

সরকারি চাকরিতে প্রবেশে ৩৫ বছর বয়সসীমা না করার পক্ষে কিছু যুক্তি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাজ করার একটা সময় থাকে। একটা এনার্জি থাকে। এখন জন্মনিবন্ধন করা হয়, বয়স লুকানো যায় না। আমরা যদি ধরেই নিই, একজন ছেলে বা মেয়ে যদি নিয়মিত পড়াশোনা করে, যদি একটু দেরিও হয়, তাহলেও ১৬ বছরে এসএসসি পাস করে। করে না? এরপর দুই বছর পর অর্থাৎ ১৮ বছর বয়সে এইসএসসি পাস করে। এরপর অনার্স ৪ বছর, মাস্টার্স ১ বছর। ২৩ বছরের মধ্যে মাস্টার্স কমপ্লিট হয়ে যায়। এরপরই সরকারি চাকরির জন্য পরীক্ষা দিতে পারে। এরপরও যদি এক-দুই বছর দেরিও হয়, তাহলেও ২৪/২৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৩৫ বছর বয়সে পরীক্ষা দিলে এর রেজাল্ট, ট্রেনিং, ট্রেনিং শেষ হতে যদি আরও দুই বছর লাগে, তাহলে ৩৭ বছর গেল। ৩৭ বছরে চাকরি হলে কী হবে? চাকরির বয়স কিন্তু ২৫ বছর না হলে ফুল পেনশন পাবে না। ঠিক আছে, পেনশন না পেল। তাহলে একটা সরকার কাদের দিয়ে চালাব?  আমরা সবসময় বলি, যারা মেধাবী, তরুণ, কর্মক্ষম তাদের দিয়েই তো আমাদের দেশের উন্নয়ন কাজ করব। কিন্তু বয়স বাড়লে তো কাজের গতিও কমে। এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। যাই হোক, আমি শুধু হিসাবটাই দিলাম, দেশবাসী বিচার করুক, আপনারাও বিচার করুন।’

বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যথেষ্ট উন্নতি করেছে

 বিশ^কাপ নিয়ে খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে যে সমালোচনার ঝড় বইছে সেই প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যথেষ্ট উন্নতি করেছে। ওয়ার্ল্ড কাপ পাওয়া একেকটা নামিদামি দলের সঙ্গে খেলা, সেটা কিন্তু কম কথা নয়। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স অত্যন্ত চমৎকার ছিল। আমরা যে খেলতে পেরেছি বা এতটা যেতে পেরেছি, এটা অনেক বড় কথা।

তিনি বলেন, আমি নিজে খেলা দেখেছি। আমাদের ছেলেদের ধন্যবাদ জানাব, তারা যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিয়েছে। তাদের ভেতর একটা আলাদা আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। ধীরে ধীরে আরও উন্নতি হবে।

 

               

কারও কাছে আমরা পানি চাইব না

তিস্তার পানি ও বাংলাদেশের ইলিশ নিয়ে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির মন্তব্য প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ কারও কাছে পানি চাইবে না, দেশের সমস্ত নদী খনন করে পানি ধরে রাখা হবে। শেখ হাসিনা বলেন,  উনি (মমতা) বলেছেন তিস্তার পানি দিইনি বলেই ইলিশ মাছ পাচ্ছি না। আমরা বলেছিলাম তিস্তায় পানি নেই, তবে ইলিশ আসবে কীভাবে? 

এ প্রসঙ্গে সরকার প্রধান আরও বলেন, আমরা দেশের সমস্ত নদী খনন করব। বর্ষায় পানি ধরে রাখব। কারোর কাছে আমাদের পানি চাইতে হবে না। আমরা আত্মনির্ভরশীল হতে চাই, পরনির্ভরশীল নয়। গত ১০ বছর আগে দেশের অবস্থা কী ছিল, এখন আমরা কী অবস্থায় দেশকে নিয়েছে এসেছি তা একটু বিচার করুন। দেশের এত উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে বলে। ‘আওয়ামী লীগ এদেশ স্বাধীন করেছে। সেই দেশই উন্নতি করতে পারে যারা স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছে, মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছে। উড়ে এসে জুড়ে বসা কোনো দল দেশের কোনো উন্নয়ন করতে পারে না, অতীতে তা বারবার প্রমাণ হয়েছে।’ 

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয় বাংলা সেøাগান দেওয়া প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, জয় বাংলা সেøাগান দিয়ে আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি। ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছে, আশ্রয় দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে তাদেরও অনেক সৈন্য প্রাণ দিয়েছেন। জয় বাংলা সেøাগান এসেছে কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা  থেকে। কেউ যদি জয় বাংলা সেøাগান দেয়, আমরা তো তার মুখ থেকে তো কেড়ে নিতে পারি না।

 

 

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত