ওয়াসার নতুন পাইপলাইনের পানিতেও ময়লা

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৯, ০১:১৫ এএম

ঢাকা ওয়াসার নতুন পাইপলাইনে সরবরাহকৃত পানিতে ময়লা-আবর্জনা পাওয়া যাচ্ছে। এই সব পাইপলাইনে সরবরাহ করা পানি পান করে অসুস্থ হচ্ছে ৩৭ শতাংশ মানুষ। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় শহরের বস্তিবাসীর জন্য বসানো নতুন এই পাইপলাইনের পানি সম্পর্কে এ তথ্য উঠে আসে সরকারের প্রকল্প তদারকি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রভাব মূল্যায়নে। আইএমইডি ওই মূল্যায়নে ওয়াসা ও বিশ্বব্যাংকের এই প্রকল্পে নানা অনিয়মও পেয়েছে। এ অবস্থায় বাস্তবায়নকারী সংস্থার কাজে অদক্ষতা ও নানা অনিয়মের বিষয়টি জবাবদিহির আওতায় আনতে বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

আইএমইডির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ঢাকা ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন শীর্ষক প্রকল্পটি ১ হাজার ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য হাতে নেয় ঢাকা ওয়াসা

প্রকল্পের আওতায় ঢাকার ৬টি বস্তিতে বসবাসরত ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে পানি সরবরাহ করা, ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান তৈরি, দুটি পাম্পিং স্টেশন স্থাপন ও ১৩টি খাল পুনর্বাসন করার কথা ছিল। প্রকল্পটি ৫৬ মাসে বাস্তবায়ন করার কথা থাকলেও শেষ করতে সময় লেগেছে ৯২ মাস। মাঝপথে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ওয়াসার দ্বন্দ্বের কারণে প্রকল্পের বরাদ্দ কমিয়ে করা হয় ৫৯৯ কোটি টাকা। প্রকল্প অনুমোদনকালে বিশ্বব্যাংকের মোট বরাদ্দের ১ হাজার ৪৩ কোটি টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও সংস্থাটি দেয় ৫২৭ কোটি টাকা। ফলে মাত্র ৪৯ হাজার মানুষকে এই প্রকল্পের আওতায় সুবিধা দেওয়া গেছে।

প্রকল্পের আওতায় ৪৯৯টি সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪০০ জন উপকারভোগীর সঙ্গে আলাপ করে একটি জরিপ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে এসব বস্তির ৯৬ শতাংশ পরিবার এই পানি ব্যবহার করছে। যার মধ্যে ৩৭ শতাংশ উপকারভোগী পরিবারের কেউ না কেউ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এই পানিতে ময়লা-আবর্জনা থাকে। এ ছাড়া পানিতে গন্ধ থাকে এমনটি জানিয়েছে ৪৪ শতাংশ মানুষ। তবে সেটা মৌসুমভেদে পরিবর্তন হয়।

এ প্রসঙ্গে ওয়াসার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওয়াসার মূল পাইপলাইন থেকে যখন বাড়িওয়ালারা ভাড়াটেদের সংযোগ দেন, তখন খুবই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করেন। ফলে পাইপ ফেটে বা লিক করে পানি দূষিত হয়।

তবে ওয়াসার এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয় বস্তিবাসী। তাদের মতে, পাইপ ফেটে গেলে বা লিক করলে রোগের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। নইলে সারা বছর পানি ফুটিয়ে খেয়েও অসুস্থ হতে হচ্ছে। কারণ পারিবারিক অনেক কাজে সরাসরি পানি ব্যবহার করতে হয়। অনেক সময় বাচ্চারা ফোটানো ছাড়াই পানি খেয়ে ফেলে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে ঢাকা ওয়াসা চরম অদক্ষতা ও গাফিলতির পরিচয় দিয়েছে। প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরিতেই নানা অসংগতি ছিল। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। এর ওপর বিশ্বব্যাংক ক্রয় প্রক্রিয়ায় দ্বিস্তরবিশিষ্ট নীতি অনুসরণ করার শর্ত দেয়। দুর্নীতি ও অনিয়ম ঠেকাতে যা খুবই জরুরি। কিন্তু ওয়াসা এ বিষয়টি নিয়ে একেবারেই অনভিজ্ঞ ছিল। একই সঙ্গে প্রকল্পের বেশ কয়েকটি কম্পোনেন্টের বিষয়ে প্রথম থেকেই ওয়াসার সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের মতবিরোধ ছিল। বিশ্বব্যাংক তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেনি। ফলে প্রতিশ্রুত অর্থসহায়তা থেকে বড় অংশ প্রত্যাহার করে নেয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে কেনাকাটায় নানা অনিয়ম ধরা পড়ে । কিন্তু বিশ্বব্যাংক এসব অনিয়মের সঙ্গে কোনো আপস করেনি বলেই মাঝপথে অর্থায়ন থেকে সরে যায়। সংস্থাটি প্রথম দিকে যে পরিমাণ অর্থছাড় করেছিল তার সঙ্গে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের ৭ কোটি টাকা মিলিয়ে ৫৩৪ কোটি টাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শেষ করা হয়। এর মানে প্রকল্পের মোট বরাদ্দের অর্থও ব্যয় করতে পারেনি ঢাকা ওয়াসা। বিষয়টি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু অনিয়মের চিত্রও উঠে এসেছে আইএমইডির প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ১৩টি খাল সংস্কারের কথা থাকলেও কাজ করা হয়েছে যেনতেনভাবে। যেভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে বাস্তবমুখী পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব খাল আবার আগের অবস্থায় চলে গেছে। এ ছাড়া প্রকল্প প্রণয়নের সময় কোন ১৩টি খাল সংস্কার হবে, তা চিহ্নিত করা ছিল না। ফলে এটি চিহ্নিত করতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। প্রকল্পে পিডি তিনবার পরিবর্তন করা হয়। এটিও প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়নের পথে বাধা ছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইএমইডি সচিব আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সমাপ্ত সব প্রকল্পের ওপরই প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়। এ থেকে ভবিষ্যৎ প্রকল্প প্রণয়নে কিছু পরামর্শও দেওয়া হয়; যেন প্রকল্প প্রস্তুত থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত এখান থেকে এটি শিক্ষা নেওয় যায়। আশা করি এই প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনগুলোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্টরা উপকৃত হবে। দেশও লাভবান হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত