বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি

হাইকোর্টের নির্দেশনা উপেক্ষিত তদন্তে

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৯, ০২:০১ এএম

যেহেতু যৌন হয়রানি স্পর্শকাতর একটি বিষয়, তাই কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে তদন্ত করার নির্দেশনা রয়েছে হাইকোর্টের। অথচ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কর্র্তৃপক্ষের অবহেলায় অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগেই অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম-পরিচয়, যৌন হয়রানির ধরনসহ এর যাবতীয় তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। এতে করে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত ব্যক্তি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। অন্যদিকে বাধ্যবাধকতা থাকলেও বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি নেই। কমিটি থাকলেও তাদের জন্য আলাদা কোনো অফিস কক্ষ নেই। ফলে গোপন এমন তদন্ত কার্যক্রমে ব্যক্তিগত অফিস, কম্পিউটারসহ সব সরঞ্জাম ব্যবহার করেন কমিটির সদস্যরা। এসবের কারণেই তদন্তের গোপনীয়তা রক্ষা হচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে জানা গেছে, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি থাকার কথা থাকলেও ১৪৩টির মধ্যে কমিটি নেই ৫৫টিতে। ৮৮টিতে কমিটি থাকলেও তাদের বেশিরভাগই নিষ্ক্রিয়, নেই অর্থ বরাদ্দ। কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তে অনীহা, প্রতিবেদন দাখিল এবং ব্যবস্থা নিতে গড়িমসির অভিযোগ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) বর্তমানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি নেই। কমিটি না থাকায় গত ২৫ জুন কয়েকজন ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বরাবর প্রতিষ্ঠানটির এক শিক্ষক বিষ্ণু কুমার অধিকারীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন। অথচ এই অভিযোগটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটিতে দেওয়ার কথা ছিল। আর এতে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম-পরিচয় গোপন থাকার কথা থাকলেও প্রকাশ হয়ে যায়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি উত্তপ্ত রয়েছে। অন্যদিকে সম্প্রতি চট্টগ্রামের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (ইউএসটিসি) ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ছাত্রী।

 

এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে উত্তপ্ত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়া তদন্ত চলাকালে একাধিকবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম-পরিচয় সামনে চলে এসেছে।

যৌন হয়রানির গোপনীয়তা প্রশ্নে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক এবং যৌন নিপীড়ন তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক রাশেদা আখতার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যৌন হয়রানি অভিযোগ ও তদন্ত খুবই স্পর্শকাতর একটি বিষয়। এর তদন্ত কার্যক্রম চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ গোপন রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অনেক সময় এ তথ্য বাইরে চলে যায়। এ বিষয়ে সব বিশ্ববিদ্যালয়কে সজাগ থাকতে হবে। ‘তদন্তের গোপনীয়তা স্বার্থে আলাদা দপ্তরসহ রেকর্ডার, তথ্য সংরক্ষণ ও চিঠিপত্র লেখার জন্য আলাদা কম্পিউটার, প্রিন্টার, আলমারি, ডেস্ক থাকা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও কমিটির সংকট রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে আমাদের ইন্সট্রুমেন্ট সবই আছে কিন্তু আলাদা দপ্তর নেই। কমিটির একজন সদস্যের কক্ষ ব্যবহার করি। এতে করে তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে করাও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। তারা আমাদের কক্ষ বরাদ্দ দেবেন জানিয়েছেন।’

এদিকে কমিটিগুলোকে কার্যকর ও এ বিষয়ে ছাত্রীদের সচেতন করতে সম্প্রতি ‘ইউএন উইমেন’-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে ইউজিসি। ইউজিসির সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দসহ কমিটিগুলোকে কার্যকর করতে সব সহায়তা দিতে শিগগির উপাচার্যদের চিঠি দেবে ইউজিসি।

এ বিষয়ে ইউজিসির মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব ও প্রতিষ্ঠানটির উপপরিচালক (পাবলিক ইউনিভার্সিটি) মৌলি আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির কাছে কেউ অভিযোগ করলে অভিযোগটি তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম-পরিচয় গোপন রাখা হয়। শুধু তাই নয়, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু যেখানে কমিটি নেই সেখানে অভিযোগটি কমিটির কাছে না গিয়ে অন্যান্য দপ্তরে যায়। এতে করেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘গোপনীয়তা রক্ষা করতে হলে অবশ্যই প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর কমিটি থাকতে হবে, কমিটির আলাদা অফিস কক্ষসহ সব লজিস্টিক সাপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে দিতে হবে। কিন্তু বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় এগুলো দেয় না। এ কারণেই মূলত যৌন হয়রানির তদন্ত ও এর গোপনীয়তা অনেক ক্ষেত্রেই রক্ষা করা সম্ভব হয় না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত