আর্থিক সংকটের কারণে আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের (পিএলএফএসএল) অবসায়ন কার্যক্রমের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য খুব শিগগিরই ব্যাংকবহির্ভূত এ আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির অবসায়ন চেয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আদালতের নির্দেশনার পর আমানতকারীসহ অন্য পাওনাদারদের টাকা ফেরত দেওয়াসহ দায়-দেনা মেটানো হবে। এক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী সবার পাওনা পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ (যদি থাকে) ফেরত পাবেন শেয়ারহোল্ডাররা।
অবসায়ন আইন অনুযায়ী অবসায়নের পর পিপলস লিজিংয়ের আমানতকারীরা সবার আগে অর্থ ফেরত পাবেন। এরপর ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান তাদের ঋণের অর্থ ফেরত পাবে। এদের পাওনা পরিশোধের পর যদি অর্থ থাকে তাহলে প্রেফারেন্স (অগ্রাধিকার) শেয়ারধারী পাওনা পাবেন। সবার পাওনা পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ (যদি থাকে) তা সমহারে পাবেন শেয়ারহোল্ডাররা।
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী পিপলস লিজিংয়ে মোট আমানত রয়েছে ২ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত রয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রায় ৬ হাজার সাধারণ গ্রাহকের আমানত রয়েছে ৭০০ কোটি টাকার বেশি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংকে এ প্রতিষ্ঠানের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৬০৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। যদিও চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুযায়ী পিপলস লিজিংয়ের নিট সম্পদমূল্য ১ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা ঋণাত্মক রয়েছে।
ধারাবাহিক লোকসানের কারণে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ প্রতিষ্ঠান ২০১৪ সালের পর থেকে কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। এর মোট শেয়ারের ৬৭ দশমিক ৮৪ শতাংশই রয়েছে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের হাতে। বাকি শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে ২৩ দশমিক ২১ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং শূন্য দশমিক ১৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনের ২২ ধারা অনুযায়ী কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের স্বার্থের পরিপন্থি কাজে নিয়োজিত হলে ও আর্থিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের জন্য হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করতে পারবে। ২৯ ধারা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের ভিত্তিতে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের জন্য আদেশ দিতে পারবে যদি ওই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয় ও ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম হয়। এদিকে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর (আরজেএসসি) নীতিমালা অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে অবসায়ন হলে সরকারি গেজেটে আদালতের আদেশের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। আদালত এক বা একাধিক ব্যক্তিকে অবসায়ন প্রক্রিয়ার জন্য অবসায়ক (লিকুইডেটর) নিয়োগ দিতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নে আইন অনুযায়ী সরকারের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে সম্পদের চেয়ে দেনা বেশি হলে সরকারকেই দায় শোধ করতে হবে। এ জন্যই সরকারের অনুমোদন নিতে হয়েছে।
জানা যায়, ১৯৯৭ সালের ২৪ নভেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিপলস লিজিংকে কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকদের থেকে মেয়াদি আমানত ও বিভিন্ন ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা ধার করে ঋণ কার্যক্রম দিয়ে আসছিল। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া পিপলসের ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিই ৭৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের হার ৬৬ শতাংশ। ২০১৫ সাল থেকে ধারাবাহিক লোকসান গুনছে প্রতিষ্ঠানটি। খেলাপি প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা আদায় করতে না পারায় আমানতকারীদের টাকাও ফেরত দিতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। আবার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টাকা তো দূরের কথা, সুদও দিতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে নতুন তিন বছরের বেশি সময় ধরে আমানত আসাও বন্ধ হয়ে গেছে।
সূত্র জানায়, পিপলস লিজিংয়ে নানা অনিয়ম, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ, চরম অর্থ সংকটের কারণে আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে না পারাসহ সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে চিঠি দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। চিঠিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনের ২২(৩) এবং ২৯ ধারায় প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়। সম্মতি দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় গত ২৬ জুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দেয়। চিঠি পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটিতে আটকে থাকা আমানতের পরিমাণ, অনিয়মের ধরন, প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ও মাসিক বেতন-ভাতার পরিমাণ উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পরিদর্শনে উঠে আসেÑ পিপলস লিজিং থেকে বিতরণ করা ঋণের অধিকাংশই জালিয়াতির মাধ্যমে সাবেক পরিচালকরা তুলে নিয়েছেন। ভুয়া কাগজ তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ২০১৫ সালে পাঁচ পরিচালককে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে শুধু প্রতিষ্ঠানের নামে জমি কেনার কথা বলে নিজ নামে জমি রেজিস্ট্রি করার মাধ্যমে আত্মসাৎ হয়েছে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা। জমি রেজিস্ট্রির এ জালিয়াতির মাধ্যমে সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান ১১৬ কোটি টাকা, সাবেক পরিচালক খবির উদ্দিন মিয়া ১০৭ কোটি টাকা, আরেফিন সামসুল আলামিন, নার্গিস আলামিন ও হুমায়রা আলামিন ২৯৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন মর্মে তখন দুদকে প্রতিবেদন দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বর্তমানে ৯ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন আনান কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের পক্ষে উজ্জল কুমার নন্দি।
