বন্যা মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি

আপডেট : ১২ জুলাই ২০১৯, ১১:২৯ পিএম

গত কয়েক দিনের টানা প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নীলফামারীর তিস্তা, সুনামগঞ্জের সুরমা, বান্দরবানের সাঙ্গু, কক্সবাজারের মাতামুহুরী ও বাঁকখালী এবং চট্টগ্রামের পাহাড় থেকে নেমে আসা পানিতে নদীগুলো উপচে পার্শ্ববর্তী এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের ভোলা ও পটুয়াখালীতেও বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গেছে। যমুনার তীর ভেঙে জামালপুর ও শেরপুরে ডুবে গেছে কয়েকশ গ্রাম। বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে দেশের প্রধান নদীগুলোর পানি। নিম্নাঞ্চলগুলোতে পানি ঢুকে পড়ায় বিভিন্ন গ্রামে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। কয়েক জায়গায় স্কুলে বন্যার পানি ঢোকায় বন্ধ হয়ে গেছে পাঠদান কার্যক্রম।

 

এ মাসের শুরুতে আবহাওয়া অধিদপ্তরের তরফে বন্যার আগাম পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। আশা করা যায়, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও এরমধ্যে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্যার অভিজ্ঞতা

থাকলেও দুর্নীতি, সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে বন্যা এলে আমাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আশানুরূপ দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে না। উপদ্রুত এলাকায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা, বন্যা পরিস্থিতির শিকার মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া জরুরি প্রাথমিক পদক্ষেপ। এক্ষেত্রে ঢিলেমি বা দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নেই। অব্যবহিত পরের পদক্ষেপ হলো উপদ্রুত এলাকায় প্রয়োজনীয় খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেওয়া। আমরা আশা করব, এবার উপদ্রুত এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বন্যা প্লাবিত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

ধারণা করা হয়েছিল, উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মধ্যমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। কিন্তু গত কয়েক দিনের পরিস্থিতি বলছে, সারা দেশেই বন্যা ছড়িয়ে পড়তে পারে। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ থেকে শুরু করে অনেক এলাকা থেকে বন্যার খবর আসছে। এ অবস্থায় জোরদার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির বিকল্প নেই। বড় দুর্যোগের ধাক্কা সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

 

প্রতিবছর বন্যা পরিস্থিতি আমাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়ালেও গত কয়েক বছরে এটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি। কিন্তু এবার আশঙ্কা করা হচ্ছে, বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। এর নেপথ্যে যেসব কারণ কাজ করছে তার মধ্যে অন্যতম হলো দেশের নদ-নদীগুলোর ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হয়ে সাগরে যেতে পারছে না। বেশিরভাগ নদী ভরাট হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ড্রেজিং না হওয়ায় এবং গভীরতা হ্রাস পাওয়ায় পানি ধরে রাখার ক্ষমতা হারিয়েছে অনেক নদী। যতই দিন যাচ্ছে বন্যার স্থায়িত্ব ও ভয়াবহতা বাড়ছে। তুলনামূলক কম বর্ষণ ও ঢলে নদীগুলো উপচে পড়ছে। খননের মাধ্যমে নদীগুলোর গভীরতা বাড়ানোর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এই ভয়াবহতা আরও বাড়বে, পলি পড়ে নদী আরও ভরাট হবে। জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যা থেকে বাঁচতে হলে নদনদী, খালবিল দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। উচ্চ আদালতের আদেশের পরও নদনদী, খালবিল দখল ও দূষণমুক্ত করতে না পারা দুর্ভাগ্যজনকই বটে। অপরিকল্পিত সড়ক ও স্থাপনার কারণে বন্যা এখন জলাবদ্ধতা তৈরি করে।

 

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এদেশে বন্যা একটি প্রাকৃতিক বাস্তবতা এবং ভাটির দেশ হিসেবে উজানের পানি বাংলাদেশ দিয়েই সমুদ্রে নামবে। এ অবস্থায় জানমাল রক্ষার সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেওয়ার বিকল্প নেই। বন্যায় এরমধ্যে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, সড়ক যোগাযোগ বিপর্যস্ত, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দুর্যোগকবলিত অসহায় মানুষ যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য ও পানীয় পায়, সেদিকে বিশেষ যতœবান হওয়ার পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়েও পূর্ণ প্রস্তুতি থাকা উচিত। বন্যার সময় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়। জীবাণুযুক্ত জল ও পচাবাসি খাবার গ্রহণের ফলে দুর্যোগকবলিত মানুষের মধ্যে ডায়রিয়া ও আমাশয়সহ বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। বন্যাপরবর্তী সংস্কার ও পুনর্বাসনের ব্যাপারেও এখন থেকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু, বেড়িবাঁধ, সøুইসগেট ইত্যাদির দ্রুত সংস্কার ও মেরামতসহ ক্ষেতের ফসল, গবাদিপশু ও ঘরবাড়ি হারানো মানুষের কাছে যতটা সম্ভব আর্থিক সহায়তার হাত প্রসারিত করা উচিত।

 

আমরা আশা করব, সরকারি ও বেসরকারি সব সংস্থা বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা ও সামনে বিপদের আশঙ্কাকে মাথায় রেখে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি থাকবে। আগাম ও যথাযথ প্রস্তুতি থাকলে মানুষের জীবন রক্ষা, দুর্ভোগ কমানো ও ক্ষয়ক্ষতিকে ন্যূনতম রাখা যাবে। এটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত