ভেজাল মুকুন্দ

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৯, ১০:৩৬ পিএম

আমার ব্যক্তিগত জীবনে কিছু কাছের ও দূরের বন্ধু আছে, যাদের কৈশোর জীবন থেকে ছায়ার মতো অনুসরণ করছি, আবার কেউ বা সাম্প্রতিককালের, যাদের দূর থেকে...। প্রিয় পাঠক, এদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে প্রশ্ন করবেন না। সমাজে এরা বিচিত্র(!) মানুষ বলে চিহ্নিত হয়। এদের সাধারণত চারপাশের মানুষজন বলে ‘ভেজাল মানুষ’। এমন কিছু ভেজাল মানুষের একজন প্রতিনিধি ‘ভেজাল মুকুন্দ’। এই ভেজাল মুকুন্দের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় একক ও সামষ্টিক ভেজালদের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য।

 

এই ভেজাল মুকুন্দ নিজেই নাকি বিপত্তি(!) ডেকে আনে! মানুষ যখন মুকুন্দকে বিপত্তি ডেকে আনার অভিযোগে অভিযুক্ত করে, তখন মুকুন্দ আনন্দিত হয়ে বলে, ‘তোমরা জীবনভর বিপদরে বিপদ বইলা ভয় করলা, আর আমি যহন আংগুল তুইলা দেহাইয়া দিলাম, তখন তোমরা মনে মনে খুশি হইলা, কিন্তু আমারে কইলা ভেজাল মুকুন্দ।’

 

যার বাবা-মায়ের দেওয়া নাম ছিল শুধুই মুকুন্দ, সে কীসের কারণে হয়ে উঠল ‘ভেজাল মুকুন্দ’।

 

আমাদের মুকুন্দ যৌবনের প্রারম্ভেই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল। স্বাধীনতার পর নিজ মফস্বল শহরে ফিরে এলো সগৌরবে। তখনো মুকুন্দের নামের আগে ভেজাল শব্দটি যুক্ত হয়নি। রণাঙ্গন থেকে সদ্য ফেরত মুকুন্দ কোর্ট চত্বরে গিয়ে জানলেন, যে মহকুমা প্রশাসক ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত ‘পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছে’ তিনিই ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর দিন থেকে স্বাধীন দেশের প্রশাসকের আসনে বহাল আছেন! মুকুন্দ কোর্ট চত্বরে চিৎকার করে উঠল সে চিৎকার একার চিৎকার। সে শহরের নানা দরজায় গিয়ে আঘাত করল, নিজের জামা ছিঁড়ে মাথায় বেঁধে লুঙ্গি কাছা বেঁধে বলতে থাকলেন, ‘যে বেটা ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমার ভাইবন্ধু বাপ-মারে মুক্তিযোদ্ধা বইলা গুলি করছে, হত্যা করছেÑ সে এক দিনের মধ্যে স্বাধীন দেশের হাকিম থাকে কেমনে?’ অনেকেই বিষয়টা ভাবলেন, শুনলেন, মনোযোগও দিলেনÑ কিন্তু কিছুই বললেন না।

 

কিন্তু মুকুন্দ বসে রইল না, সে দৌড়ে শহরের একটি ওষুধের দোকানে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইগো তোমাগো ডিসপেনসারিতে এমন ট্যাবলেট আছে নাকি, যা খাইলে এক রাইতে পাকিস্তানি মগজ মুক্তিযুদ্ধের মগজে পাল্টায়া যায়?’ বিষয়টাকে উপহাসের বিষয় ভেবে মুখ ফিরিয়ে নিলো ফার্মেসির কর্মচারীরা। মুকুন্দের এমন চিৎকার চলল কিছুদিন সে চিৎকারে আকাশ-বাতাস তো দূরের কথা গাছের একটি পাতাও প্রকম্পিত হলো না। পাবলিকে বলল, ‘ভেজাল করিস না মুকুন্দ।’ সেই থেকে আমাদের মুকুন্দ হলো ‘ভেজাল মুকুন্দ’। সেই ভেজালের সুখ্যাতি মাথায় নিয়ে এখনো বাসে, ট্রেনে, চায়ের দোকানে, লঞ্চঘাটে মানুষ পেলেই সে তার সেই পুরনো প্রশ্নই জিজ্ঞাসা করে। স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছরে এসেও এত উন্নয়ন, এত পরিবর্তন, এত শিক্ষা-সংস্কৃতির অগ্রগতির পরও এই প্রশ্নের কোনো নতুন জবাব পায়নি মুকুন্দ। এখনো একই জবাব মিলে, ‘ভেজাল করিস না মুকুন্দ।’

 

অপর এক মুকুন্দ। এই অধ্যায়ের মুকুন্দের কাজ নদীর পাড় ধরে রাতভর হেঁটে বেড়ানো। এটি ওর নেশা। মুকুন্দের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে স্রোতস্বিনী যমুনা। সত্তরের দশকের কথা। মুকুন্দ তখন কৈশোর উত্তীর্ণ যুবক। যমুনা প্রতি বছর গ্রাস করে শত মানুষের বসতভিটা, ফসলের ক্ষেত। এই নিয়ে স্থানীয় শহরে একদিকে চলে শোকের মাতম, অন্যদিকে নদী শাসনের সঙ্গে যুক্ত সরকারি অফিস, স্থানীয় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও অন্যদের মানসিক উল্লাস। দরপত্র, হিসাবনিকাশ, ঠিকাদারদের অফিসের দুয়ারে দাঁড়িয়ে অপলক চোখে মুকুন্দ দেখে ক্যালকুলেটরে টেন্ডারবাজদের অর্থ সংখ্যার ঝড়। কতিপয় মানুষ যখন মধ্যরাতে সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঘরে আগামী কয়েক দিনের নদীভাঙনের হিসাব করে সে হিসাব ভিটা ঘর জমি হারানো মানুষের হিসাব নয়, সে হিসাব বালু, সিমেন্ট, বোল্ডার ইত্যাদির হিসাব। তখন নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা মুকুন্দ ঠিকাদারের দরজায় জোরে থুথু নিক্ষেপ করে আর চেঁচিয়ে বলে, ‘হিসাবে ভুল হইছে ঠিকমতো গুনেন নইলে কইলাম লস খাইবেন।’ তেড়ে আসে ঠিকাদারের প্রহরী, আমাদের মুকুন্দ তখন সত্তরের লোডশেডিংয়ের শহরে অন্ধকারে হারিয়ে যায়। বসে থাকে না হিসাবরত নদীরক্ষা প্রেমিকরা(!) কড়া পানীয়র সঙ্গে কোমলপানীয় মিশিয়ে গলায় ঢেলে বলে ওঠে, ‘এই ছেড়াডা কয়দিন হয় বড়ই ভেজাল করে।’

 

মুকুন্দ অন্ধকারে হারায় বটে, তবে উবে যায় না। তার দেখা মেলে নদীর পাড়ে রাতের অন্ধকারে, উত্তাল নদীর গ্রাসের মুখে নিক্ষিপ্ত বোল্ডারের স্তূপের ছায়ায়। শত শত শ্রমিক বোল্ডার ছুড়ে মারছে স্রোতের বিপরীতে আর নদীতে নিক্ষিপ্ত বোল্ডারের সংখ্যা গণনা করছে মুকুন্দ। নদীর গর্জন, শোঁ শোঁ বাতাস, অদূরে ভিটা হারানো মানুষের ক্রন্দনে মুকুন্দের সংখ্যা গণনার শব্দ পৌঁছায় না লোকালয়ে। হঠাৎ শ্রমিকদের সরদার এসে মুকুন্দের কাঁধে হাত রাখে, মুকুন্দ ভ্রক্ষেপ করে না। বোল্ডারের সংখ্যা গণনার আওয়াজ আরও জোরে হয়। সরদার বলে, ‘দিন কয় হয় এই কাম করস, কী লাভ হইবো তর।’ মুকুন্দ গণনাটি হাতে এনে, মুখে বলে ‘কেন, কাইল বেয়ানে ইস্টিশনে কমু, চৌরাস্তার মানুষেরে কমু কমু হিসাবের গরমিল।’ এবার সরদার মুকুন্দের ঘাড় ধরে নিয়ে যায় নদীর পাড়ে ‘আর যদি এক দিন দেহি তরে নদীতে ফালানো বোল্ডারের হিসাব তুই রাখতে এহানে আইছস, তাইলে যমুনার মাঝ নদীতে চুবামু তরে।’ জোরে একটি ধাক্কা দিয়ে মুকুন্দকে ফেলে দেয় সরদার শীর্ণ দেহ নিয়ে মুকুন্দ পড়ে যায় মাটিতে, কপালের বাম পাশটা বোল্ডারের আঘাতে রক্তাক্ত হয়।

 

মুকুন্দের কথা বোঝে না কেউ। বেলা ১১টা নাগাদ চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা নানা রাজনৈতিক ছাত্রনেতা-কর্মীরা যখন গরম শিঙাড়া আর চায়ের আড্ডায় মশগুলÑ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক আকাশ-বাতাস স্পর্শ করেছে, তখন মুকুন্দ সেখানে গেল রাতে যমুনায় নিক্ষিপ্ত বোল্ডারের সংখ্যা ও সরকারি হিসাব উপস্থিতদের জানানোর চেষ্টায়। দুই মুহূর্ত সময় দাবি করে করজোড়ে, ‘যমুনা ভাঙন থেকে বাঁচলে, দেশ বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে এই শহরে’ বলে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে, কখনো বা উদ্ভট আর্তনাদে। বিতর্কে ডুবে থাকা উপস্থিত এক ছাত্রনেতা সদয় হয়ে মুকুন্দের হাতে একটা গরম শিঙাড়া ধরিয়ে দিয়ে বলে ‘খা, গরম আছে’। মুকুন্দ শিঙাড়া হাতে ছাত্র সংগঠনের অফিসের সিঁড়িতে বসে প্রথম কামড় দিয়েছে মাত্র, ঠিক তখনই গেল রাতের প্রধান ঠিকাদার গাড়ি হাঁকিয়ে

চৌরাস্তার ভিড় ঠেলে সামনে যেতে জোরে জোরে হর্ন বাজাতে থাকে। ভিড়ের মধ্যে অনেকেই হুমড়ি খেয়ে ঠিকাদারকে সালাম জানাতে গাড়ির ওপরে শরীর তুলে দেয়। মুকুন্দ দাঁড়িয়ে উঠে চিৎকার করে, ‘এইÑ এই আমাগো নদী ভাঙার টাকা দিয়া তিন বছরে গাড়ি কিনছে তিনখান, বিচার করেন।’

 

উপস্থিত সুধীজন মুকুন্দের মুখ চেপে ধরে। মুকুন্দের কানে ফিসফিস করে বলে, ‘ভেজাল করিস না মুকুন্দ।’

 

লেখক : নাট্যকার, নির্মাতা ও অভিনেতা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত