চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম। টানা চতুর্থবারের মতো সভাপতি হয়ে রেকর্ড গড়েছেন চেম্বারের ইতিহাসে। গত সপ্তাহে নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন এই ব্যবসায়ী নেতা। দেশ রূপান্তরকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে দেশের সার্বিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতি, চট্টগ্রাম বন্দরে গতি বাড়ানো ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামসুল ইসলাম
টানা চারবার সভাপতি হলেন, ব্যবসায়ীদের কি প্রতিদান দেবেন?
দেশের ইকোনমিক পার্লামেন্ট হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম চেম্বার। এই চেম্বার শুধু চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের নিয়ে নয়, কথা বলে সারা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে। এই চেম্বারের সভাপতি হিসেবে আমার ওপর আস্থা রাখছেন ব্যবসায়ীরা। তারা আমার তিনবারের কার্যক্রম মূল্যায়ন করে দেখেছেন, আমি তাদের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হব। এ কারণে তারা আমাকে আবারও চেয়েছেন সভাপতি পদে। আর চতুর্থবারের মতো এই পদে আসীন হওয়ায় আমার কোনো কৃতিত্ব নেই, যারা আমাকে এখানে আসার জন্য সহায়তা করেছেন সব কৃতিত্ব তাদের। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা তাদের একজন সেবক হিসেবে আমাকে যথাযথ মনে করেছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর গতিশীল করতে চেম্বারের ভূমিকা কি হবে?
চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। দেশের ৮২ শতাংশ আমদানি ও ৯২ শতাংশ রপ্তানি হয় এই বন্দর দিয়ে। দেশের প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে চট্টগ্রামে আসতে হয়, নির্ভর করতে হয়। চট্টগ্রাম চেম্বারের ভূমিকা অন্য যেকোনো চেম্বারের চেয়ে ভিন্ন। গত ৩ মেয়াদে আমি চেষ্টা করেছি ব্যবসায়ীদের সমস্যার কথা জানতে ও সমাধান করতে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ হবে। আর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের আলোকে বর্তমান নেতৃত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ব্যবসায়ী নেতৃত্ব। তাই এবারে চেম্বার বোর্ড সাজানো হয়েছে প্রবীণ ও নবীনের সমন্বয়ে। পুরনো অনেককে বাদ দিয়ে নতুনদের স্থান দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতি ঠিক থাকলে দেশ উন্নয়নের দিকে ধাবিত হবে। নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের চিটাগাং চেম্বারে এনে তাদের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন, ব্যবসার উন্নয়ন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও সরকারের উন্নয়নমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নিতে পারব।
চট্টগ্রামের উন্নয়ন নিয়ে চেম্বারের ভাবনা কি?
দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে চট্টগ্রামে। টানেল হচ্ছে কর্ণফুলীতে। টুইন সিটিতে রূপান্তরিত হচ্ছে চট্টগ্রাম। প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ হচ্ছে চট্টগ্রামে। আমরা শুধু ব্যবসায়ীদের সমস্যার কথা বলি না, চট্টগ্রামের অবকাঠামো ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলি। তাই ব্যবসায়ীরা বিশ^াস করেছেন আমার ওপর। এই বিশ^াসের মর্যাদা দিয়ে আমি তাদের জন্য কাজ করব। এটা আমার প্রত্যয়, আমার অঙ্গীকার।
চট্টগ্রাম চেম্বারকে সত্যিকারের ইকোনমিক পার্লামেন্টে পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন ৬ বছর আগে, সফলতা কতটুকু?
বন্দরের বে-টার্মিনাল চেম্বারের দাবির ফসল। আমরাই চট্টগ্রাম চেম্বার থেকে দাবি তুলেছি, বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে বে-টার্মিনালের প্রয়োজন। আমরাই বলেছি যন্ত্রপাতি আনতে হবে, ১০টি গ্যান্ট্রি ক্রেন দরকার। এর মধ্যে ৬টি আনার ফলে সক্ষমতা বেড়েছে। আমরা বলেছি টার্মিনাল দরকার। পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল হচ্ছে। কেবল ১৩টি জেটি আছে বন্দরে। আমরা বলেছি ৬০টি জেটি করতে হবে, করলে কোনো সমস্যা থাকবে না। এসব হলো ইকোনমিক পার্লামেন্টের কাজ। আমাদের কাজ এগুলোই। রপ্তানি নিয়ে নানা সমস্যার কথা বলছি। চেম্বারের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনাও আছে। সরকার মিরসরাইয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল করে ফেলছে। তাই চেম্বারের প্রস্তাবটি নিয়ে আরও চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন।
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে কি কি ব্যবস্থা থাকা উচিত?
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে যদি তারকা হোটেল না হয়, বিজনেস ইউনিভার্সিটি করা হবে। ম্যানেজারিয়াল পোস্টে বিদেশিদের এনে তাদের পেছনে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা চলে যায়। তাই আমরা চাই এখানে করপোরেট হাউজের ম্যানেজার, জিএমদের এনে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার। তাহলে তারাই আগামী দিনে সব কোম্পানির সিইওর দায়িত্ব পালন করবে, তারাই আগামী দিনে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এগিয়ে নিয়ে যাবে। সেটাই আমাদের লক্ষ্য।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে ১৩ টনের বেশি পণ্য পরিবহন বন্ধ রাখা অসন্তোষ রয়েছে ব্যবসায়ীদের। এর সমাধান কি?
চট্টগ্রামের প্রতি এটা একটা বিমাতাসুলভ আচরণ। চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি পণ্য খালাস হয়। একসময় এখানে জাহাজ আসত ১০ হাজার টন নিয়ে, বর্তমানে আসে ৫০-৬০ হাজার টন পণ্য নিয়ে। দেশের অন্যান্য মহাসড়কে নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও এখানে এই ব্যবস্থা কর্তৃপক্ষের নেতিবাচক আচরণ, এটা কোনো সদাচরণ নয়। এতে এই অঞ্চল ব্যবসায়িকভাবে পিছিয়ে পড়বে। চট্টগ্রাম ব্যবসায়িক নগরী। এখানে এটা হওয়ার কোনো অবকাশ আছে বলে মনে করি না। দেশের সব জায়গায় একই আইন হোক। সব রাস্তায় একই আইন হওয়া উচিত। ঢাকা-চট্টগ্রাম আট লাইন করতে হবে। ২০-৩০ টন নিয়ে যাতে চলতে পারে, সেভাবে লোডিং ক্যাপাসিটি করতে হবে রাস্তার। ভারতে ৪০ টন পণ্য নিয়ে গাড়ি চলাচল করে অবাধে। এখানেও সেই ব্যবস্থা প্রয়োজন।
