ডেঙ্গু এখন ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানে দুইভাবে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। একদিকে ঢাকা থেকে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সেখানকার এডিস মশার মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে; তেমনি দুই ধরনের এডিস মশার মধ্যে ‘এডিস এলবোপিকটাস’ এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মশা আগেও ঢাকার বাইরে ছিল। কিন্তু এবার উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়ায় বংশবিস্তার করছে।
অন্যদিকে ডেঙ্গুতে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম ডেঙ্গুতে মৃত্যুর যে তথ্য দিচ্ছে, তা মিলছে না সরকারের রোগ নির্ণয়, রোগতত্ত্ব ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর’বি) ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে। এসব তথ্য বলছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যের তুলনায়
কমপক্ষে চার-পাঁচ গুণ মৃত্যু বেশি।
এদিকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকার বাইরে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ, আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআর’বির এসব বিশেষজ্ঞ বলছেন, এবার ডেঙ্গুর ধরন বদলেছে। অর্থাৎ এডিস মশার মধ্যে ওষুধের বিরুদ্ধে নতুন প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মেছে। ফলে যে ওষুধ ও পদ্ধতিতে এডিস মশা নিধন করা হচ্ছে, তাতে কাজ হবে না। বরং এসব মশা আরও দ্রুত বংশবিস্তার করছে। এভাবে চলতে থাকলে এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলে মনে করছেন তারা।
এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক ও আইসিডিডিআর’বি কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার ডেঙ্গুর ধরন বদলেছে। নতুন ধরনের ডেঙ্গু রোগী পাচ্ছি আমরা। আগে জ¦র, শরীরে র্যাশ ও রক্তক্ষরণ হতো, সাত-আট দিন চিকিৎসা নিলেই ভালো হয়ে যেত। এবার ডেঙ্গু কঠিন হচ্ছে। অর্থাৎ ভীষণ সিভিয়ার এবার। জ¦র ও রক্তক্ষরণ আছে। সঙ্গে হার্ট, লাংস ও কিডনি আক্রান্ত হচ্ছে। শক সিনড্রোমে চলে যাচ্ছে রোগী। আগে পরামর্শ মানলে বাড়িতে বসেই ডেঙ্গু ভালো হয়ে যেত। এবার হাসপাতালেই আসছে কঠিন অবস্থা নিয়ে। চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। ফলে এবার হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বেশি।
গতকালও রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১৫২ ডেঙ্গু রোগীর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু রাজধানীতেই গড়ে প্রতি ঘণ্টায় ৭ জন করে রোগী ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে সরকারি হিসাবে গতকাল পর্যন্ত ৩ হাজার ৯৯৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলো। এর মধ্যে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৩ হাজার ৮৭ জন।
ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু : গাজীপুরসহ ঢাকা শহরের আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া ও সিলেটে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দিনে এসব জেলায় ২১ রোগী ভর্তি হয়েছে। এর আগে গত ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে মোট ২৭ ডেঙ্গু রোগীর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ।
ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু রোগী প্রসঙ্গে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেবরিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তবে উদ্বেগজনক নয়। এখন পর্যন্ত আমরা যত ডেঙ্গু রোগী পেয়েছি, সেসব রোগী ঢাকা থেকেই আক্রান্ত হয়ে সেখানে গিয়েছিল।
তবে দুই ধরনের এডিসের মধ্যে ‘এডিস এলবোপিকটাস’ ঢাকার বাইরে আগে থেকেই রয়েছে। সুতরাং এই মশা থেকেও ডেঙ্গুর জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, এলবোপিকটাস বংশবিস্তারের সুযোগ পেলে সেখানেও ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেবে। তাই মশা নিধন ও বংশবিস্তার রোধ করতে হবে।
বাড়ছে মৃত্যু : ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত তিনজন ডেঙ্গুতে মারা গেছে। কিন্তু আইইডিসিআর, আইসিডিডিআর’বি ও বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী এ সংখ্যা অন্তত তিন-চার গুণ বেশি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইসিডিডিআর’বির এক গবেষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত বছর একই সময়ে মৃত্যু হয়েছিল সাতজনের। সরকার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে সংখ্যা প্রচার করছে, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি।
আইইডিসিআরের মৃত্যু পর্যালোচনাবিষয়ক কমিটির এক সদস্য জানান, এই সপ্তাহে তারা সুপারিশসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন আইইডিসিআরকে দেবেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে আক্রান্ত দুজন ডেঙ্গু রোগী মারা যান। আর ২ জুলাই মারা যান একজন। এই তিনজনের মৃত্যুর কথা সরকার প্রকাশ করলেও গত কয়েক দিনে আর কোনো সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেবরিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের মৃত্যু পর্যালোচনা কমিটি আছে। তারা ডেথ রিভিউ করে যে তথ্য দেয়, আমরা সেটা প্রচার করি। তা ছাড়া এখন সাসপেক্টেড কেস ও অন্য কোনো কারণে মৃত্যু হলেও ডেঙ্গুর মৃত্যু বলে মনে করা হয়।
ধরন বদলেছে ডেঙ্গুর : এ বছর ডেঙ্গু গতবারের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা এবার চার ধরনের ডেঙ্গু পেয়েছি। বেশিরভাগ রোগীই দুই ধরনের ডেঙ্গুর জীবাণু নিয়ে হাসপাতালে আসছে। অর্থাৎ এডিস মশা চার ধরনের জীবাণু ছড়াচ্ছে। তার মানে এডিস মশার মধ্যে ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বদলেছে। ফলে গতবার যে ওষুধে কাজ হতো, এবার সেটা হবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইসিডিডিআর’বির এক গবেষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা দেড় বছর আগে সিটি করপোরেশনকে তাদের মশা মারার ওষুধ যে কাজ করছে না, তা জানিয়েছি। সম্পূর্ণ গবেষণা তাদের দিয়েছি। তারপরও তারা ব্যবস্থা নেয়নি। এ সময়ের মধ্যে অন্তত একবার তারা সেই পুরনো ওষুধই কিনেছে।
এই গবেষকের এ তথ্য মানতে নারাজ আইইডিসিআর পরিচালক। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তিনটি প্রতিষ্ঠান গবেষণা করে ওষুধ কেনার পরামর্শ দেয়। ওষুধ কেনার পর সেগুলো পরীক্ষা করা হয়। তারপর সিটি করপোরেশন সেগুলো ব্যবহার করে। সুতরাং আমরা যে ওষুধ কিনেছি, তাতে মশা নিধন হওয়ার কথা।
সতর্ক থাকার পরামর্শ : অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এক. মানুষকে সচেতন হতে হবে। দুই. ডেঙ্গু জ¦রের ধরনে যে পরিবর্তন এসেছে, সেগুলো সম্পর্কে চিকিৎসকদের জানাতে হবে। সে অনুযায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারের গাইডলাইন পরিবর্তন করতে হবে। কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, সে ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। তিন. মশা মারার ব্যাপারে সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ওষুধ কাজ না করলে নতুন ওষুধ কিনতে হবে।
