সেনা শাসনের ৯ বছর

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০১৯, ০৩:০৭ এএম

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। নিজেকে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করে সামরিক শাসন জারি করেন তিনি, স্থগিত করেন সংবিধান। ওই দিন বেতার ও টেলিভিশনে প্রচারিত

 ভাষণে তিনি বলেন, ‘জনগণের ডাকে সাড়া দিতে হইয়াছে, ইহা ছাড়া জাতির সামনে আর কোনে বিকল্প ছিল না।’ বাংলাদেশে দ্বিতীয়বারের মতো সামরিক শাসন জারি করে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন এরশাদ।

রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে প্রথমে বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির পদে বসিয়েছিলেন এরশাদ। কিন্তু সব ক্ষমতা ছিল এরশাদেরই হাতে, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এরশাদের অনুমোদন ছাড়া কোনো ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ ছিল না আহসানউদ্দিনের। তার এক বছর পর আর রাখঢাক না রেখে আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসেন এরশাদ; যার এই ক্ষমতারোহণ অবৈধ বলে পরে রায় আসে আদালতের।

ক্ষমতায় বসার পর পূর্বসূরি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে অনুসরণ করে রাজনৈতিক চাল চালতে থাকেন এরশাদ। প্রথমে জনদল নামে একটি দল তার পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল, যা ছিল তার রাজনীতিতে নামার প্রথম ধাপ। এরপর বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে গড়ে তোলেন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় পার্টি’, মৃত্যু পর্যন্ত এই দলটির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতেই। এরশাদ বলতেন, এটা তার দল।

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগে উপজেলা গঠন করেন এরশাদ, তাতে প্রথম নির্বাচনের পরীক্ষায় নামে জাতীয় পার্টি; আর তাতে প্রায় সব উপজেলায়ই এরশাদের দলের প্রার্থী চেয়ারম্যান হন।

এদিকে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে শুরু থেকেই। এরশাদকে ক্ষমতা থেকে নামাতে ১৯৮২ সালের ২১ নভেম্বর তৈরি হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। যোগ দেয় ছাত্রলীগ (মুনীর-হাসিব), ছাত্রলীগ (ফজলু-চুন্নু), ছাত্রলীগ (জালাল-জাহাঙ্গীর), ছাত্রলীগ (রশীদ-রতন), ছাত্রলীগ (ওয়ারেশ-জহীর), ছাত্রলীগ (আখতার), ছাত্রলীগ (আজিজ), বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলা ছাত্র ইউনিয়ন, জাতীয় ছাত্র ইউনিয়ন, বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন (ইসরারুল-স্বপন), বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন (মানু), বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন (গিরানি), বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী, ছাত্রঐক্য ফোরাম, বাংলাদেশ ছাত্র সমিতি, জাতীয় ছাত্র সংসদ, সমাজবাদী ছাত্রজোট ও ছাত্র একতা কেন্দ্র।

১৯৮৩ সালে হয় প্রথম সরব প্রতিবাদ। ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। কমপক্ষে পাঁচজন ছাত্র নিহত ও শতাধিক আহত হন। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রথম বলি হন জয়নাল, কাঞ্চন, মোজাম্মেল, জাফর ও দীপালি সাহা। এরশাদের সেনাশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে সেই প্রথম রক্ত ঝরে ঢাকার রাজপথে। তার পরের বছরই ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ ট্রাক তুলে দিয়ে হত্যা করে সেলিম-দেলোয়ারকে।

দমন আর নির্যাতনের মুখে ছাত্র আন্দোলন আরও বেগবান হতে থাকে, শ্রমিকসহ পেশাজীবীরাও নামে আন্দোলনে। আর তা দমন করতে গিয়ে নূর হোসেনসহ অনেকের রক্তে রঞ্জিত হয় এরশাদের হাত।

ছাত্র ও পেশাজীবী আন্দোলনের চাপে রাজনৈতিক দলগুলো এক হয় এরশাদবিরোধী আন্দোলনে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিলেও ১৯৮৮ সালে সব দল একযোগে বর্জন করে সংসদ নির্বাচন।

তারপর আন্দোলন আরও ব্যাপকতা পায়, যা সুনির্দিষ্ট পরিণতি পায় ১৯৯০ সালে। বিএমএ নেতা ডা. শামসুল আলম মিলন ও ছাত্রনেতা নাজিরউদ্দিন জেহাদ নিহত হওয়ার পর তুমুল আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা ছাড়ার ঘোষণা দিতে বাধ্য হন।

পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও এরশাদ তার অনুগত নবম ডিভিশনের জিও মেজর জেনারেল রফিকুল ইসলামের ওপর নির্ভর করে বাঁচতে চেয়েছিলেন। পরিস্থিতি আঁচ করে সেনাপ্রধান লে. জেনারেল নূরউদ্দীন রফিকের পুরো বাহিনী সাভারে পাঠিয়ে দেন। জেনারেল নূরউদ্দীন এবং সিজিএস মেজর জেনারেল আবদুস সালাম সারা দিন এরশাদের ফোন ধরেননি। সেনা কর্মকর্তাদের একটা বড় অংশ এরশাদের ‘অপকর্মের’ দায় আর বয়ে বেড়াতে চাননি।

অবশেষে ৬ ডিসেম্বর দুপুর ২টায় বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিন জোটের আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে এরশাদ নবনিযুক্ত উপরাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এভাবেই শেষ হয় নয় বছরের এরশাদ-জমানা।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত