বাঙালি বীরের জাতি। বাঙালির ইতিহাস পর্যালোচনায় অর্জনের গৌরব ঈর্ষণীয়। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টির সংগ্রামে বাঙালির সংগ্রাম বিশ্ববাসীকে প্রেরণা জুগিয়েছে। মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বাঙালির ভাষা আন্দোলন আজ বিশ্বজুড়ে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের’ স্বীকৃতি পেয়ে বিশ্বনন্দিত হয়েছে। ইতিহাসের নানা পর্যায়ে যেমন বাঙালির নানা গৌরব রয়েছে তেমনি সাম্প্রতিক অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্বমঞ্চে বাঙালির আত্মপ্রকাশ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এত গৌরবে কালিমা লেপন করছে আমাদের সমাজের নানা নৈতিক অবক্ষয় ও মানবতার ভয়াবহ অধঃপতন।
আজ যেন সত্যিই ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ এসেছে বাঙালি জাতির জীবনে। ‘পেডোফেলিয়া’ বা ‘শিশুকামিতার’ মতো বিকৃত যৌনাচারের নগ্ন উল্লাস দেখছি আমরা আজ সবখানে। পেডোফেলিয়া বা শিশুকামিতার অর্থ হলো শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ। সব সমাজেই ব্যাপারটিকে একটি বিকৃত যৌনাচার হিসেবে গণ্য করা হয়। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (অচঅ) এর মেন্টাল ডিসঅর্ডারের ডায়াগনস্টিক এবং পরিসংখ্যানগত ম্যানুয়ালে ১৯৬৮ সাল থেকে পেডোফেলিয়া বা শিশুকামিতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে একটি মানসিক ব্যাধি বা ডিসঅর্ডার হিসেবে। কিন্তু যতই একে মানসিক ব্যাধি বা ডিসঅর্ডার আমরা বলি না কেন, একজন পেডোফেলিক বা শিশুকামী, একজন নরপশু ছাড়া আর কিছুই নয়। কোনো সমাজেই তারা বসবাসের যোগ্য না।
অথচ আমাদের বাঙালি জাতির সমাজে আজ শিশুকামীরা নিজেদের বসত গেড়েছে। একের পর এক শিশু ধর্ষণ চলছে, আমরা সামান্য উহু আহা করে নিজেদের কপালের দোষ দিয়ে মেনে নিচ্ছি এই অভিশাপ। যেন শিশু ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন খুব সামান্য একটি সামাজিক দুর্ঘটনা মাত্র। হরহামেশাই হচ্ছে, হতেই পারে, আর হলে ব্যাপারটা তো দুঃখজনক বটেই। কিন্তু আমরা আমাদের শিশুদের, আমাদের ভবিষ্যতের কোনো তোয়াক্কা করি না। খুব নগদ জীবন আমাদের, নগদেই বুঝে নিচ্ছি জীবনের সব হিসাব-নিকাশ। যাচ্ছে, যাক না কয়েকটা প্রাণ। এমন তো হতেই পারে, তাই না?
আমাদের ছয় বছরের মেয়ে শিশুটিকে ছাদ দেখানোর কথা বলে লিফট থেকে সবচেয়ে ওপর তলার অবিক্রীত শূন্য ফ্ল্যাটের ভেতর নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাদের মেয়ে শিশুটিকে প্রথমে ধর্ষণ করার চেষ্টা করা হয়। তাতে ব্যর্থ হয়ে আমাদের মেয়ে শিশুটির মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়। এমন ঘটনায় আমাদের খুব কিছু কি আসে যায়? ভাবনাটা এমন যে, দোষ তো সেই মা-বাবার, যারা শিশুটিকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখতে পারেনি। জাতির কী দোষ?
আমাদের অনেক ধর্মীয় শিক্ষক পরিবারসহ মাদ্রাসার ভেতরেই থাকেন। বাসায় তার স্ত্রী না থাকলে এবং মাদ্রাসা ছুটি থাকলে এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নানাভাবে আমাদের মেয়ে শিশুটিকে তিনি ধর্ষণ করেন। ধর্ম শিক্ষক দাবি করেন শয়তানের প্ররোচনায় তিনি এমনটা করেছেন। আমরা শয়তান তাড়াতে ধর্মগ্রন্থের সাহায্য নিই, কিন্তু ধর্ম শিক্ষককে নিয়ে খুব একটা চিন্তিত হই না! সবই তো অই ব্যাটা শয়তানের দোষ! জাতির কী দোষ?
সুদূর রংপুর মহানগরীর ধাপ লালকুঠি এলাকাতে ষাট বছরের এক বৃদ্ধ আমাদের এগারো বছরের মেয়ে শিশুকে ধর্ষণ করেছে। ষাট বছরের সেই বৃদ্ধের বিকৃত যৌনাচারের বলি হয়ে আমাদের মেয়ে শিশুটি যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। আহারে সোনামণি! মাত্র এগারো বছরের একটি মেয়ে, ষাট বছরের বৃদ্ধের বিকৃত যৌনক্ষুধার বলি হলো। মেয়েটি নিজের জীবনও বাঁচাতে পারেনি। দোষ তো তারই। জাতির কী দোষ?
২৩ বছরের এক যুবক প্রতিদিনের মতো শনিবারও প্রতিবেশীর বাসায় টেলিভিশনে সিনেমা দেখতে আসে। এ সময় আমাদের পাঁচ বছরের নিষ্পাপ মেয়ে শিশুটি বিছানায় ঘুমানো অবস্থায় ছিল। সুযোগ পেয়েই ২৩ বছরের যুবকটি আমাদের পাঁচ বছরের নিষ্পাপ মেয়ে শিশুটিকে তারই আপন ঘরে তারই আপন বিছানায় ঘুমন্ত অবস্থায় থাকাকালে ধর্ষণ করে নিজের বিকৃত যৌনক্ষুধা মেটায়। আহা আমাদের পাঁচ বছরের নিষ্পাপ মেয়ে শিশুটিÑ পুতুল কোলে নানা খেলায় যার দিন কেটে যায়, সে কেন ঘুমাবে যখন তখন? তাও আবার বাইরের কোনো মানুষের সামনে? দোষ তো তারই। জাতির কী দোষ?
রাজধানীর ডেমরায় আমাদের দুই মেয়ে শিশু, খুব সাজগোজ করতে পছন্দ করত ওরা। মা-খালাদের দেখে একটু আধটু সাজতে পারলে নিজেদের ধন্য মনে করে। আর তাই লিপস্টিক দিয়ে সাজিয়ে দেওয়ার নাম করে আমাদের মেয়ে শিশু দু’টিকে প্রথমে বাসায় ডেকে আনা হয়। পরে চিৎকারের মুখে ধর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়ে প্রথমে একজনকে গলা টিপে এবং পরে আরেকজনকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। মেয়ে শিশু দু’টির বড্ড বাড়াবাড়ি। বড়দের মতো এত লিপস্টিক মেখে সাজার শখ কেন? মূল্য তো দিতেই হবে এই বাড়াবাড়ির, তাই না? দোষ তো তাদেরই। জাতির কী দোষ?
সাতক্ষীরায় আমাদের আট বছরের মেয়ে শিশুটি তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। প্রতিদিন বিকেলে সে প্রতিবেশী এক বড় আপুর বাড়িতে প্রাইভেট পড়তে যায়। তো এক বিকেলে সেই বড় আপু বাড়িতে না থাকায় তার ভাই আমাদের মেয়ে শিশুটিকে প্রাইভেট পড়ায়। সন্ধ্যায় আমাদের মেয়ে শিশুটিকে পাড়ার দোকান থেকে খাবার কিনে আবার বাড়িতে ডেকে নিয়ে যায় এবং বাড়িতে কেউ না থাকায় এ সুযোগে আমাদের মেয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করে সেই ভাই। একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে আমাদের মেয়ে শিশুটিকে বাড়ির পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। আমি তো এটাই বুঝি না, মেয়ে মানুষের এত লেখাপড়া করার দরকার কী? লেখাপড়া করতে গেলে স্কুলে যেতে হবে, প্রাইভেট পড়তে হবে, কত ঝক্কি! লেখাপড়া না করলে তো আর এই ধর্ষণের শিকার হতে হতো না, তাই না? দোষ তো তারই। জাতির কী দোষ?
শেরপুরের শ্রীবর্দীতে আমাদের নয় বছরের মেয়ে শিশুটি ঈদ উপলক্ষে গ্রামে বাবার সঙ্গে ঈদ করতে বাড়িতে আসে। ঈদের দিন পার্শ্ববর্তী শালমারা গ্রামে তার নানার বাড়িতে যায়। সেখানে জানকিখিলা হাফেজিয়া মাদ্রাসা মাঠে আমাদের নয় বছরের মেয়ে শিশুটি খেলতেও যায়। এ সময় মাঠের পাশের সেলুনের দোকানদার ৩৫ বছর বয়সের নাপিত আমাদের নয় বছরের মেয়ে শিশুটিকে বিস্কুটের প্রলোভন দেখিয়ে জানকিখিলা হাফেজিয়া মাদ্রাসার পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। আমাদের নয় বছরের মেয়ে শিশুটি খেলবে কেন? সামান্য বিস্কুটের লোভ সামলাতে পারল না? ধর্ষিত তো হতেই হবে। দোষ তো তারই। জাতির কী দোষ?
হাজারো ঘটনা, হাজারো শিশু ধর্ষণের ইতিবৃত্ত। না, আমি আরব্য রজনীর কাহিনী বলতে আসিনি। শুধু জানতে ইচ্ছে হয়, এ কেমন জাতি আমরা, শিশুকামিতার জঘন্য নির্মমতায় মেতেছি? আমাদের সমাজে প্রতিটি মেয়ে শিশু কি তবে ধর্ষিত হওয়ার ছাড়পত্র নিয়ে ভূমিষ্ঠ হচ্ছে? প্রতিটি মেয়ে শিশু কি তবে জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে আকুতি জানায় ধর্ষিত না হওয়ার? ‘সে ভাষা বোঝে না কেউ, কেউ হাসে, কেউ করে মৃদু তিরস্কার?’ এই ‘জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে’-ই কি তাকে বেঁচে থাকতে হবে অনন্তকাল? অথচ আমরাই তো ওয়াদা করেছিলাম ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব’।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করে নতুন আইন পাস করতে হবে এবং তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সমাজকে সচেতন ও সজাগ হতে হবে। এ লড়াই আমাদের সবার। আমাদের শিশু, আমাদের আগামী। আর তাই, আমাদের সবাইকে আমাদের নিরাপদ আগামীর জন্য লড়তে হবে। কিন্তু কেন আমরা পারছি না? কোথায় আমাদের মনুষ্যত্ব বোধ? কোথায় আমাদের বিবেক? শিশুকামিতার বিরুদ্ধে লড়াই করবার জন্য কি আমরা এখনো প্রস্তুত নই? আর এই ব্যর্থতার জন্য জাতি হিসেবে আমরা কি এখনো লজ্জা বোধ করছি না? জানতে ইচ্ছে করে আর কত শিশু ধর্ষিত হলে এই জাতি লজ্জিত বোধ করবে?
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করে নতুন আইন পাস করতে হবে এবং তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সমাজকে সচেতন ও সজাগ হতে হবে। এ লড়াই আমাদের সবার। আমাদের শিশু, আমাদের আগামী। আর তাই, আমাদের সবাইকে আমাদের নিরাপদ আগামীর জন্য লড়তে হবে। কিন্তু কেন আমরা পারছি না? কোথায় আমাদের মনুষ্যত্ব বোধ? কোথায় আমাদের বিবেক? শিশুকামিতার বিরুদ্ধে লড়াই করবার জন্য কি আমরা এখনো প্রস্তুত নই?
লেখক
আইনজীবী ও আইনের শিক্ষক
