এক টুকরো কাঠকে কখনো ভায়োলিন হতে দেখেছেন? সে এক রূপান্তরের গল্প বটে! সুর তোলার আগে কাঠের টুকরোকে কত নির্মাণের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। সব ইতিহাস লেখা থাকে না। তবে ভায়োলিনে সুর উঠলেই বোঝা যায় কী বলতে চাইছে কাঠের টুকরোটা। না, কোনো তুলনা নয়। কেন উইলিয়ামসনের কথাগুলো শুনুন, ‘ব্যাপারটা লজ্জার। তাই না? বিশেষ করে ম্যাচের ওই সময়ে। ম্যাচ নিয়ে বলতে পারি, একটা রানে হার তো নয়। ম্যাচে অনেক মুহূর্ত আছে যেখানে দুটো দলের মধ্যে কোনো তফাতই ছিল না। যে কেউ জিততে পারত। হয়তো এটা আমাদের দিন ছিল না। নয়তো এত কাছে এসে এভাবে আটকে যেতে হয়? ছেলেরা একেবারে ভেঙে পড়েছে।’
বিশ্বকাপ ফাইনালের পর উইলিয়ামসন যেন ক্রিকেটের ভায়োলিন। হাসি, কান্না, যুদ্ধ, প্রেম আর মহানুভবতার গল্প বুকে নিয়ে সুর হয়ে বাজছেন। আজ থেকে ক্রিকেট যদি মরেও যায় তবু আপনি এই কণ্ঠটা শুনতে পাবেন অনন্তকাল, ‘সবাই যা হতে চায় সেটাই হতে পারে আর আমার কাছে ওটাই বিশ্ব সংসারের সৌন্দর্য। সবারই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী যতটা সম্ভব সেরা হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। শুধু নিজে যা করছেন তা উপভোগ করুন।’ যে মানুষটা এই কথাগুলো বলছেন তিনি কেন উইলিয়ামসন। আর কখন বলেছেন তা গোটা দুনিয়া জানে। ক্রিকেট ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ম্যাচটা খেলার পর। না, লর্ডসের ফাইনালকে স্রেফ ম্যাচ বললে ক্রিকেটকে অপমান করা হবে। এটাকে আপনি চাইলে গ্রিক ট্র্যাজেডি বলতে পারেন। চাইলে বলতে পারেন আরব্য রজনীর গল্প। আবার ডুয়েলও বলতে পারেন। তবে রক্তপাতহীন ডুয়েল। যেখানে ঘাম, শ্রম, লড়াই, হার, জিত, মর্মবেদনা ক্রিকেট জেন্টালম্যানশিপের অলংকার হয়ে ছিল। আর তিনি, উইলিয়ামসন রাজার মতো তাতে অলংকৃত ছিলেন।
ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল অনেক সম্ভাবনা নিয়ে। কেউ বলছিলেন রানের সুনামো হবে। বিগ হিটের বন্যা বয়ে যাবে। বোলাররা খুন হবেন। আর বৃষ্টি হবে। সত্যি সত্যি অনেক বৃষ্টি হয়েছে। তবে বোলাররা খুন হননি। রান উঠেছে বেশ কিছু ম্যাচে তবে যেমন করে চারশো-পাঁচশোর হাঁকডাক করা হচ্ছিল তা হয়নি। এভাবেই ছয় সপ্তাহের এক মহানাটকীয় টুর্নামেন্ট এগিয়ে গেছে সমাপ্তির দিকে। লর্ডসে ১৪ জুলাই ছিল সেই নাটকের শেষ অঙ্ক। তাতে এমন কিছু ছিল, যা ক্রিকেট নামক গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলায় প্রায় অসম্ভব। রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা, অলৌকিক পরিণতি যা একই সঙ্গে হৃদয়বিদারক ও জয়োল্লাসমুখর। আসলে ফাইনাল সম্পর্কে যা কিছুই লেখা হোক তা দুঃখজনকভাবে অপর্যাপ্ত মনে হবে। লর্ডসের মহত্তম ক্রিকেটের নির্যাসটুকু কীভাবে ধরা সম্ভব? হারের পর হাসিমুখে উইলিয়ামসনের দাঁড়িয়ে থাকা কি কেউ লিখতে পারবেন? ওই দৃশ্যের সঙ্গে কেবল রুপালি পর্দার চার্লি চ্যাপলিনের তুলনা চলে। যিনি সব বিপন্নতা নিয়ে হাসেন। কিন্তু সেই হাসিতে চোখের জল আর কান্না লেগে থাকে। রবিবার লর্ডসে বেন স্টোকসের ব্যাটে লেগে মার্টিন গাপটিলের থ্রোটা বাউন্ডারির বাইরে চলে যাওয়ার পর উইলিয়ামসনের মুখটা ভেসে উঠেছিল টিভির পর্দায়। রাগ-অভিমান দুঃখÑ কিছুই বোঝা যায়নি। সকলই গোপন, মুখে কথা নেই। এরপর ম্যাচ টাই। তারপর সুপার ওভারেও টাই। এবং চার-ছয়ের ব্যবধানে ইংল্যান্ডের চ্যাম্পিয়ন হওয়া। বিধ্বস্ত গাপটিল উইকেটেই ভেঙে পড়লেন। অধিনায়ক উইলিয়ামসনের মুখে তখনো সকরুণ হাসি লেগে আছে। পরে বলেছেন, ‘তাজা আবেগ, তাই হার মেনে নেওয়া কঠিন। দুটি দলই জয় পেতে দারুণ লড়াই করেছে। তবে এটাই সত্য। শুরু থেকেই তো নিয়মটি আছে। অসাধারণ একটা ক্রিকেট ম্যাচ হলো। আশা করি সবাই উপভোগ করেছে। সত্যি বাউন্ডারি নিয়ম কী, আমি তা জানি না। আমরা একটু পিছিয়ে ছিলাম। তবে ইংল্যান্ডকে প্রাপ্য অভিনন্দন দিতেই হবে। যোগ্য দল হিসেবেই তারা বিশ্বকাপ জিতেছে।’
উইলিয়ামসনের মহানুভবতার এখানেই শেষ নয়। স্টোকসের ব্যাটে লেগে যে অতিরিক্ত রানের কারণে হারতে হয়েছে দলকে সেই প্রসঙ্গে ওঠা প্রশ্নের উত্তর তিনি বলেছেন, ‘স্টোকসের ব্যাটে বল লাগাটা লজ্জার। তবে আমি আশা করি অমন মুহূর্তে এসব যেন আর না ঘটে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব ঘটনাই বারবার ঘটে থাকে। এটা খেলারই অংশ। কোনো অভিযোগ করার ইচ্ছে নেই। শুধু এটুকু চাই, ম্যাচের অমন পরিস্থিতিতে এসব যেন আর কখনই না ঘটে।’ এটাই উইলিয়ামসন। যিনি সব হারানোর পরও ক্রিকেটের সুমহান ভদ্রতাবোধে অবিচল।
