জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা তাদের এই উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেন, কোনো ‘অঘটন’ ঘটে গেলে দায়দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। এমন উদ্বেগের কারণ সম্পর্কে তারা বলেন, গত ১ এপ্রিল খালেদা জিয়াকে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ভর্তি করা হয় তখন তার ব্লাড সুগার বেশি ছিল। হাসপাতালে ভর্তির পর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে আসছে না। গতকাল সোমবার তার ব্লাড সুগার ছিল ১৩-এর ওপরে। এতে বোঝা যায় হাসপাতালে তার উন্নত চিকিৎসা না দিয়ে তিলে তিলে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বিএনপির ওই কেন্দ্রীয় নেতারা অভিযোগ করে আরও বলেন, এরশাদের মতো একজন স্বৈরশাসককে যেভাবে সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে তার পুরো বিপরীত আচরণ করা হচ্ছে তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে।
দুর্নীতি মামলায় গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসনের অসুস্থতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘বিএসএমএমইউ হাসপাতালে বেগম খালেদা জিয়ার যথাযথ চিকিৎসা হচ্ছে না। বিএনপির পক্ষ থেকে তার উন্নত চিকিৎসার দাবি জানানো হলেও সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে কারাগারে কোনো অঘটন ঘটে গেলে তার দায়দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।’
কারাবন্দি খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে দেশের জনগণও উদ্বিগ্ন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে সাবেক উপাচার্য ও বিএনপিপন্থি পেশাজীবীদের অন্যতম নেতা অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। দেশ রূপান্তর তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে শুধু বিএনপি নয়, দেশের জনগণও উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত। দেশের জনগণ বেগম জিয়ার মুক্তি চায়। সরকার যত তাড়াতাড়ি খালেদা জিয়াকে জামিন দেবে ততই মঙ্গল। কারাগারে খালেদা জিয়ার কিছু ঘটে গেলে তা সরকার ও দেশের জন্য ভালো কোনো দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে না।’
খালেদা জিয়ার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারাবন্দি চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। ১ এপ্রিলে তাকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করার তিন মাস পরও তার ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে আসছে না। মুখের ব্যথার কারণে তার খেতে সমস্যা হচ্ছে। পায়ের ব্যথাও আগের মতোই রয়েছে। তিনি বলেন, এক দেশে দুই রকম আইন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি দলের জন্য এক রকম আইন। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের জন্য আরেক আইন। খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে সরকার কারাবিধির দোহাই দেয়। অথচ ওয়ান-ইলেভেনের সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসুস্থ হলে তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। সে সময়কার সেনা সমর্থিত সরকার বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে উদার ছিলেন।
গত ১ এপ্রিল বিএনপি চেয়ারপারসনকে ভর্তির সময় তার চিকিৎসায় বিএসএমএমইউর ইন্টারন্যাল মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. জিলন মিঞা সরকারের নেতৃত্বে সাত সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। তার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে জিলন মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, খালেদা জিয়ার ব্লাড সুগার বর্তমানে ১৩-এর ওপরে। তার মুখে ব্যথা আছে; এ জন্য ডেন্টিস্টকে দেখানোর জন্য তারা রেফার্ড করেছেন। আজ-কালের মধ্যে তার দাঁতের চিকিৎসা হবে। পায়ের ব্যথার বিষয়ে রোগীর কোনো অবজেকশন নেই। আগের চেয়ে ভালো আছেন তিনি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বজলুল করিম চৌধুরী আবেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এরশাদ দেশের মানুষের কাছে একজন ঘৃণিত স্বৈরাচার হিসেবে পরিচিত। তাকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। অথচ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যিনি রাজপথে ৯ বছর আন্দোলন করলেন সেই গণতন্ত্রের নেত্রীর বিষয়ে সরকার উদাসীন।
