সারা দেশের বন্য পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ২০ জেলার প্রায় ১১ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, সুনামগঞ্জ ও শেরপুরের বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কুড়িগ্রাম ও জামালপুরে বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে শিশুসহ ৬ জন। খাদ্য ও পানীয় জলের তীব্র সংকটে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে বলে জানিয়েছেন দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিরা।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, উত্তরের ১১ জেলার ১৩টি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলার বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। তবে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বেশ কিছু অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আশা করছি
আগামী দু-একদিনের ভেতর পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় আসবে।
এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জানিয়েছেন, ভারত, চীন ও নেপালে আরও বৃষ্টিপাত হলে এবং ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি বৃদ্ধি পেলে দেশে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। গতকাল পর্যন্ত ২০টি জেলা বন্যাকবলিত হয়েছে।
সারা দেশের বন্যা পরিস্থিতি
কুড়িগ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে এক নারীসহ চার শিশু। উলিপুর উপজেলার নূতন অনন্তপুর আকন্দপাড়ায় নৌকা ডুবে চার শিশুসহ পাঁচজন মারা গেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে আরও দুজন। ফায়ার সার্ভিসের উলিপুর উপজেলা স্টেশন ইন্সপেক্টর নাজমুল হাসান জানান, রূপা মণি (৮), হাসিবুর (৮), সুমন (৫), লুনা বেগম (৩২) ও আরেক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজন নিখোঁজ রয়েছে। এর আগে সকালে রৌমারীরতে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে পানিতে পড়ে সাইফুল ইসলাম (২৫) নামে এক যুবক নিখোঁজ হয়।
এদিকে জেলাটিতে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদীর পানি বেড়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৩ লাখ মানুষ। রৌমারীর কর্তিমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের বাঁধ ভেঙে নতুন করে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বন্যার ফলে পানিবন্দি মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও আশ্রয়ের সংকটে ভুগছে তারা। চরাঞ্চলে গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সারা দিন পানিতে চলাফেরা করায় বানভাসিরা পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
জামালপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে যমুনার পানি সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে বিপদসীমার ১৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার সাত উপজেলার তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে ২৭৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বন্যার পানিতে পড়ে আব্দুল্লাহ নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
ব্রহ্মপুত্র নদ ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং কয়েক জায়গায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে গাইবান্ধার ৫ লাখ মানুষ।
জেলায় বন্যায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে অনেক এলাকায়। ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ বিভিন্ন সড়কে। খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে বন্যাকবলিতরা। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছে তারা।
নীলফামারীতে তিস্তার বন্যায় ডিমলা উপজেলায় ১৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার তিস্তার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করলে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত ও এসব বিদ্যালয় জলমগ্ন হয়ে পড়ে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত নীলফামারীর ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমা বরাবর প্রবাহিত হওয়ায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি তিস্তাপাড়ের বন্যা পরিস্থিতির। ফলে শুরু হয়নি এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম।
প্রবল বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিনটি নদীর বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙে ইতিমধ্যে সদর উপজেলা, রাজনগর, কমলগঞ্জ ও কুলাউড়ার মোট ১০টি ইউনিয়নের ৭০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে মনু নদীর পানি চাঁদনীঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১০০ সেমি এবং শেরপুর কুশিয়ারা পয়েন্টে ৫৪ সেমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে ধলই নদীর আগের থেকে কিছুটা কমে বিপদসীমার ৯ সেমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
শেরপুরের পাঁচ উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। রবিবার গভীর রাত থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে জেলার সদরসহ নকলা, নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতীর শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে লাখো মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বন্যার পানি প্রবেশ করায় ঝিনাইগাতী ও শেরপুর সদর উপজেলার ৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া বন্যার পানিতে ডুবে গত তিন দিনে শ্রীবরদীতে দুজন ও ঝিনাইগাতীতে এক শিশুসহ তিনজন মারা গেছে।
এখন পর্যন্ত সরকার থেকে কোনো ত্রাণ সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করেছে পানিবন্দি মানুষ। তবে বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো কোনো এলাকায় শুকনো খাবার বিতরণের খবর পাওয়া গেছে।
তবে গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সম্মেলনের তৃতীয় দিনের প্রথম কার্য-অধিবেশন শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান দাবি করেন, ‘প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি রয়েছে। প্রতিটি কমিটিকে দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া আছে।’
তিনি জানান, বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে এ পর্যন্ত ৭০০ টন চাল, চার হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি জেলায় শিশুখাদ্য ও গোখাদ্যের জন্য এক লাখ টাকা করে এবং ৫০০টি করে তাঁবু পাঠানো হয়েছে।
