১০২ মাদক কারবারির মামলা নিয়ে বিপাকে পুলিশ

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৯, ০১:১৭ এএম

কক্সবাজারের আত্মসমর্পণ করা ১০২ মাদক কারবারির মামলা নিয়ে বিপাকে পড়েছে পুলিশ। চলতি মাসেই মামলাগুলো প্রত্যাহার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অস্ত্র মামলার পাশাপাশি অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা থাকায় শিগগিরই বিষয়টি সুরাহা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা। এর ফলে দ্রুতই জামিন মিলছে না মাদক কারবারিদের। কবে তারা জামিনে বের হয়ে আসবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার করে কেউ কিছু বলতেও পারছেন না। এদিকে আত্মসমর্পণ করা মাদক কারবারিরা কক্সবাজার কারাগারে আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের অনেকে কারা হাসপাতালেই থাকছে। এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদির ছোট ভাই

শুক্কুরসহ আত্মসমর্পণ করে ১০২ ইয়াবা কারবারি। ওইদিনই আদালতের মাধ্যমে তাদের নেওয়া হয় কক্সবাজার জেলা কারাগারে। অভিযোগ উঠেছে, সাবেক সাংসদ বদির ভাই শুক্কুরসহ অনেকেই কারা কর্র্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে থাকছে কারা হাসপাতালে। অসুস্থ না হয়েও তারা অসুস্থতার ভান করছে। এমনকি তারা পুরো কারাগার চষে বেড়ায় বলে বেশ কয়েকজন পুলিশ ও কারা কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এ বি এম মাসুদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আত্মসমর্পণের দিন থানায় দায়ের হওয়া দুটি মামলা প্রত্যাহার করতে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত  নেবে। তবে কিছুটা সময় লাগবে বলে মনে হচ্ছে। আত্মসমর্পণকারীরা কারাগারে কী করছে, তা-ও গোয়েন্দারা মনিটরিং করছে।’

কক্সবাজার জেল সুপার বজলুর রশীদ আকন্দ সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আত্মসমর্পণ করা মাদক কারবারিসহ সব বন্দিকে সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে রাখা হচ্ছে। কারাগারে ৫৩০ জন ধারণক্ষমতার মধ্যে বন্দি আছে ৪ হাজার ৩৮৮ জন, যাদের ৭০ শতাংশই ইয়াবা কারবারি। কেউ আলাদা সুবিধা পাচ্ছে না। অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে বন্দিদের ভর্তি করা হয়। মাদক কারবারিদের সুবিধা পাওয়ার অভিযোগটি সত্য নয়।’

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১০২ মাদক কারবারির মামলা নিয়ে আমরা বিপাকেই আছি। যারা আত্মসমর্পণ করেছে, তাদের মধ্যে কারও কারও বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও আছে। এগুলো কীভাবে সমাধান করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। নিহতের পরিবারের সঙ্গেও কথা বলতে হবে। তা ছাড়া অস্ত্র মামলা তো আছেই।’

কক্সবাজার জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আত্মসমর্পণের দিন থানায় হওয়া মাদক মামলা প্রত্যাহার করতে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে সম্প্রতি জেলা পুলিশ। চলতি মাসেই তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মাদক মামলা প্রত্যাহার করার কথা আছে। তবে অস্ত্র মামলার পাশাপাশি হত্যা মামলাগুলো কীভাবে প্রত্যাহার হবে তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ১০২ আসামির মধ্যে ১৫ থেকে ১৬ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা আছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘অস্ত্র মামলা প্রত্যাহার করাও জটিল। সবার বিরুদ্ধেই অস্ত্র মামলা আছে। পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে জানতে পেরেছি। আত্মসমর্পণকারীরা সবাই জামিনের জন্য আদালতে আবেদন করেছে। কিন্তু আদালত বরাবরই জামিনের আবেদন নাকচ করে দিচ্ছে। সহসাই তারা কারাগার থেকে বের হতে পারবে না, তা নিশ্চিত করেই বলতে পারি।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের টেকনাফে তালিকাভুক্ত ১০২ ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করে। ওইদিনই আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে কয়েকটি সেলে প্রথমে তাদের রাখা হয়। কিছুদিন পরই কারা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে সাবেক সাংসদ বদির ছোট ভাই আবদুস শুক্কুর, ফয়সাল রহমান, ফুফাতো ভাই মোহাম্মদ শফিক, খালাতো ভাই মং মং চ্যাং, ভাগিনা সাহেদুর রহমান নিপুসহ বেশিরভাগ কারবারিই কারা হাসপাতালসহ ভালো ওয়ার্ডে থাকার ব্যবস্থা করে। যারা কারা হাসপাতালে থাকছে, তারা নিজেদের অসুস্থততার ভান করে কারা কর্র্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পুলিশ ও কারাগারের দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আত্মসমর্পণকারীরা অনেকটা রাজার হালেই আছে। তারা কোনো কষ্টে নেই। কারাগারের খাবারের চেয়ে বাইরের খাবারই খাচ্ছে বেশি। তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করেন স্বজনরা। বদির পরিবারের সদস্যরাই বেশি সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। কারা হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে থাকছে শুক্কুর আলী। তা ছাড়া বদির অন্য স্বজনরা হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে আছে। ওই কর্মকর্তারা আরও জানান, যারা হাসপাতালে থাকার ব্যবস্থা করতে পারেনি তারা ভালো সেলে থাকছে। দিনের বেলায় কাউকে কাউকে বিভিন্ন সেলে গিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করতে দেখা গেছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আত্মসমর্পণের দিন দায়ের হওয়া মামলা দুটি প্রত্যাহার করতে সম্প্রতি পুলিশ সুপার স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। আত্মসমর্পণের সময় তাদের বলা হয়েছিল, দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলা প্রত্যাহার করা হবে। অন্য মামলাগুলোর বিষয়ে পুলিশ সহায়তা করবে। জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলতি মাসের মাদক মামলাটি প্রত্যাহার করার কথা ছিল। কিন্তু দেরি হবে বলে মনে হচ্ছে। অস্ত্র ও হত্যা মামলা নিয়ে ঝামেলা আছে। এই নিয়ে বড় স্যারেরা আলোচনা চালাচ্ছেন। মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তর মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।’ তিনি আরও বলেন, আত্মসমর্পণকারীরা কারাগারে ভালোই আছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৩ মার্চ আইজিপির কাছে একটি চিঠি পাঠান কক্সবাজারের পুলিশ সুপার। ওই চিঠিতে এসপি বলেন, আত্মসমর্পণকারী ১০২ জনের পাশাপাশি পরিবার ও অন্য আত্মীয়-স্বজনদের নামে-বেনামে সব স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তি যাচাইয়ের জন্য দুদক/সিআইডি/এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কাছে তথ্যাদি প্রেরণ করা হবে এবং সংস্থার মাধ্যমে তাদের অর্জিত সব স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তি যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আত্মসমর্পণকারীরা প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক। মূলত মাদক কারবার করে তারা এত সম্পদের মালিক হয়েছে। এ বিষয়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এক সময় কক্সবাজার ও টেকনাফ এলাকার মানুষের দৈন্যদশা ছিল। মাছ ও লবণ চাষই ছিল তাদের কাজ। আবার কেউ কেউ বাস বা ট্রাকের হেলপার অথবা চালক ছিল। বছর দশেক আগে হঠাৎ করেই অনেক লোক আলাদিনের চেরাগ পেয়ে বসে। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার আশায় বিপুলসংখ্যক লোক যোগ দেয় ইয়াবা কারবারে। পরিবর্তন আসে জীবন-মানে। আর ইয়াবার টাকায় বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা। প্রকাশ্য ওইসব অট্টালিকা থাকলেও প্রশাসন কিছুই বলেনি তাদের। টেকনাফের মৌলভীপাড়া, নাজিরপাড়া, শিলবনিয়াপাড়া, মিঠাপানিরছড়া, লম্বরিপাড়া, জালিয়াপাড়া, শাহপরীর দ্বীপসহ কয়েকটি স্থানে ইয়াবা কারবারিদের আলিশান বাড়ি রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত