দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকার নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন আরও কয়েক লাখ মানুষ। টাঙ্গাইল ও কুড়িগ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে তিনজন। পদ্মা নদীতে প্রবল স্রোতের কারণে মাওয়া-কাঁঠালবাড়িয়া ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। দুই রুটের উভয় পাশেই দীর্ঘ হচ্ছে পারাপারের অপেক্ষায় থাকা যানবাহনের সারি। ভোগান্তি পোহাচ্ছেন হাজার হাজার যাত্রী।
এদিকে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে দেখা দিয়েছে খাবার ও পানীয় জলের তীব্র সংকট। ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত রোগ। এই অবস্থায় সংসদীয় কমিটি কবলিত এলাকায় চাল, ডাল, লবণ, তেল, চিঁড়াসহ সকল প্রকার খাদ্য দ্রুত পাঠানোর সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি চিকিৎসক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেছেন, ত্রাণের কোনো সংকট নেই। বন্যার্তদের কষ্ট লাঘবে পর্যাপ্ত খাবার ও ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার নদী ছাড়া দেশের সব নদীর পানিই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা না থাকলেও পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা যমুনার পানি বাড়বে। আর পদ্মার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে আরও দুই দিন। এ সময় বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর ও মুন্সীগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হবে। অপরিবর্তিত থাকবে কুড়িগ্রাম, জামালপুর ও গাইবান্ধার বন্যা পরিস্থিতি। তবে নেত্রকোনা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বৃহস্পতিবারের বন্যা পরিস্থিতির
বিস্তারিতÑ
ত্রাণের জন্য সংসদীয় কমিটির সুপারিশ
দেশের বন্যাকবলিত এলাকার পরিস্থিতি ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছেন সংসদীয় কমিটির সদস্যরা। বৃহস্পতিবার বিকেলে সংসদীয় কমিটির বৈঠক থেকে ওইসব এলাকায় চাল, ডাল, লবণ, তেল, চিঁড়াসহ সব ধরনের খাদ্য দ্রুত পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদীয় কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ নাসিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশে চলমান বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের
সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়। বৈঠকে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর প্রবণতা রোধের ব্যবস্থা গ্রহণেরও সুপারিশ করা হয়।
দুর্গত এলাকায় চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল
বন্যাকবলিত এলাকার স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সব পর্যায়ের চিকিৎসক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। ছুটি বাতিলের ব্যাপারে গত ১৭ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. শহীদ মো. সাদিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।
এছাড়া বন্যাকবলিত এলাকা চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য কতিপয় নির্দেশনা প্রদানের পাশাপাশি দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কমিউনিটি ক্লিনিকসমূহকে একযোগে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
ত্রাণের কোনো সংকট নেই : প্রতিমন্ত্রী
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলা বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম। বৃহস্পতিবার তারা ত্রাণ বিতরণ এবং বন্যাকবলিত গ্রাম ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ পরিদর্শন করেন। এ সময় প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান এমপি বন্যাকবলিত মানুষদের উদ্দেশে বলেন, বন্যার্তদের কষ্ট লাঘবে ত্রাণের কোনো সংকট নেই। প্রধানমন্ত্রী সবসময় বন্যার্ত মানুষের খোঁজখবর রাখছেন। খাদ্য, চিকিৎসা ও ওষুধের কোনো কষ্ট হবে না।
পানিতে ডুবে তিন জনের মৃত্যু
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় বন্যার পানিতে ডুবে দুই বোনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের আবু সাইদ মিয়ার মেয়ে লিনা (১২) ও তানজিলা (১০) বাড়িরে পাশের ডুবে যাওয়া রাস্তা দিয়ে দোকানে যাওয়ার পথে স্রোতের টানে রাস্তা থেকে পার্শ্ববর্তী খাদে পড়ে যায়। এতে তাদের মৃত্যু হয়।
এদিকে কুড়িগ্রামের উলিপুরের নাওড়া গ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে ববিতা খাতুন (১৬) নামের এক কিশোরী মারা গেছে। ববিতা গ্রামের বাবুল মিয়ার মেয়ে। ডুবে যাওয়া রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফেরায় সময় খালে পড়ে মারা যায় সে।
নৌরুটে চলাচল ব্যাহত
রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, পদ্মা নদীতে প্রবল স্রোতের কারণে মাওয়া-কাঁঠালবাড়িয়া ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ওই দুই রুটেই অর্ধেকের কম ফেরি চলাচল করতে পারছে। দৌলতদিয়া ঘাটে পারাপারের অপেক্ষায় আছে কয়েকশ যানবাহন। দৌলতদিয়া-খুলনা মহাসড়কে দেখা দিয়েছে ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট। পাটুরিয়া প্রান্তেও তিন থেকে চার কিলোমিটার সড়কে পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে যানবাহন। মাওয়া-কাঁঠালবাড়িয়া রুটের ১৮টি ফেরির মধ্যে চলছে মাত্র চারটি। ওই নৌরুটের উভয় পাশে কয়েক হাজার গাড়ি দুই দিন ধরে পারাপারের অপেক্ষায় আছে।
সারা দেশের বন্যা পরিস্থিতি
গাইবান্ধার চলমান বন্যা ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সে সময় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি জেলার ফুলছড়িঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ত্রিমোহিনী-বাদিয়াখালী রেলপথের লাইনের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ায় ভেসে রয়েছে রেললাইন। বন্ধ রয়েছে ট্রেন চলাচল। বন্যাকবলিত এলাকায় চাহিদার তুলনায় ত্রাণ খুব কম পরিমাণেই বিতরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বন্যার্তরা। ১০ দিন থেকে বন্যার কবলে থাকলেও এখনো কোনো সহায়তা পাননি অনেকে।
গত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। যমুনা, করতোয়া ও বড়াল নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলার তিনটি উপজেলার কয়েক হাজার গ্রাম প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ।
যমুনার পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জামালপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সাত উপজেলার ৬৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫৯টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এতে করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৫ লক্ষাধিক মানুষ। রেললাইনে পানি ওঠায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে জামালপুর-সরিষাবাড়ী-বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত ট্রেন চলাচল। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যাকবলিত এলাকার জন্য ৮৫০ মেট্রিক টন চাল, ১৪ লাখ ৫০ হাজার নগদ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বগুড়ায় যমুনা নদীর পানিবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি আরও ১২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এটিই স্মরণকালের মধ্যে সর্বোচ্চ বিপদসীমা অতিক্রম করার ঘটনা বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এদিকে অব্যাহত পানিবৃদ্ধির ফলে চাপ বেড়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে।
পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে পানিবৃদ্ধির ফলে শেরপুরে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পুরাতন ভাঙন অংশ দিয়ে পানি দ্রুতবেগে প্রবেশ করায় চরাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। জেলার ৫ উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের ২ শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি রয়েছে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এখনো সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ৫২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপূত্র ও ধরলার পানি কমতে শুরু করলেও টানা নয়দিন ধরে পানিবন্দি মানুষ রয়েছে চরম দুর্ভোগের মধ্যে। সীমিত আকারে ত্রাণ শুরু হলেও বেশ কয়েক জায়গার মানুষ ত্রাণ পায়নি বলে জানিয়েছে। এখন পর্যন্ত বন্যায় ৫৬টি ইউনিয়নের ৫৭৮টি গ্রাম পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
বন্যায় রংপুর জেলায় কয়েক শত মৎস্যচাষি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। জেলার ৩ উপজেলায় ছোট-বড় মিলে মাছ এবং পোনা উৎপাদনকারী ৫৮২টি পুকুর ভেসে গেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টাকা।
