কোনো পরিবর্তন আসবে না দেশের রাজনীতিতে

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৯, ০২:৩৯ এএম

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতিতে কোনো ধরনের পরিবর্তন আসবে না বলে মনে করছেন বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, এরশাদ জীবিত অবস্থায় কখনো সত্য ও ন্যায়ের পথে, দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের পক্ষে নৈতিক অবস্থান নিতে পারেননি। সম্প্রতি দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তারা আরও বলেন, ’৯০-এ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদের পতন হয়েছিল। এরপর ‘গণতন্ত্রের নামে’ ক্ষমতায় আসা বিএনপি ও আওয়ামী লীগ তাদের নিজেদের স্বার্থে এরশাদকে ব্যবহার করেছে। এরশাদও এ সময় কৌশলে নিজের স্বার্থ হাসিল করেছেন। মাঝে বছর ছয়েক জেলে থাকলেও একরকম আরাম-আয়েশে বাকি জীবন কাটিয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুও নিশ্চিত করেছেন তিনি।

১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। ওই নির্বাচনে তিনি পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেন। এদিকে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে একাধিক মামলা হয়। ১৯৯১-৯৬ সাল

 পর্যন্ত বিএনপির পুরো মেয়াদই তাকে জেল খাটতে হয়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে কারাগারে থাকা অবস্থায়ও তিনি পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি এরশাদ জামিনে মুক্ত হন। জাতীয় পার্টি ২০০০ সালে তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যার মধ্যে মূল ধারার তিনি চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তার দল সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং তার স্ত্রী রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা হন। সর্বশেষ গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর এরশাদ সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হন। তবে অসুস্থতার কারণে তিনি বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা রাখতে পারেননি। 

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ গত ১৪ জুলাই ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থান মারা যান। তার মৃত্যুর পর দেশের রাজনীতির গতিপথ কোন দিকে যেতে পারে, রাজনীতিতে গুণগত কোনো পরিবর্তন আসবে কি নাÑ সেসব বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, এরশাদ বাংলাদেশের জনগণের কাছে একজন ঘৃণিত স্বৈরাচার হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। জীবিত অবস্থায় জেলে যাওয়ার ভয়ে দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়াতে পারেননি তিনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ও সর্বশেষ গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে এরশাদ জনগণের পক্ষে দাঁড়াতে পারেননি। বরং নিজের স্বার্থরক্ষার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, নব্বইয়ে তার পতন হলেও অন্যান্য স্বৈরশাসকের মতো ধুলায় মিশতে হয়নি তাকে। কারণ ’৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করে, তখন এরশাদের জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের পক্ষে রাজপথের আন্দোলনে অংশ নেয়। এরপর তার জন্য নতুন সুযোগ নিয়ে আসে ১৯৯৬ সালের নির্বাচন। আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে সাহায্য করার পুরস্কার হিসেবে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হন তিনি। কারামুক্ত হয়ে ফিরে আসেন মুক্ত জীবনে। এতে করে এরশাদ হেরেও জিতলেন; আর গণতন্ত্র জিতেও হারল।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এরশাদের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। তার জন্য দেশের রাজনীতিতে কোনো শূন্যতাও সৃষ্টি হবে না। কারণ এখন যারা রাজনীতি করছেন তাদের দ্বারা দেশের দুর্নীতি বন্ধ, সুশাসন ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কেবল নিজেরা কীভাবে ক্ষমতায় থাকবেন সেটাই তারা দেখেন। প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচনের আগে যে ম্যানিফেস্টো জনগণের সামনে তুলে ধরে নির্বাচনে জেতার পর সেদিকে ভুলেও তাকায় না। তারা নিজেদের সুবিধামতো কাজ করে। তিনি বলেন, স্বৈরাচার এরশাদ যখন ক্ষমতায় আসেন তখন বিশ^বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে তার রাজনীতি, দেশ পরিচালনার নীতি দেখেছেন। এরশাদ ক্ষমতায় এসে জনগণের বাকস্বাধীনতা হরণ, সুবিধাবাদী নীতি গ্রহণ ও রাজনীতিবিদদের নির্যাতন করে নিজের পক্ষে টানার মাধ্যমে এবং রাজনীতিবিদদের কেনাবেচার রেট বাড়িয়ে রাজনীতি নষ্ট করেছেন।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারী বলেন, স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিন জোটের রূপরেখায় ছিল ভবিষ্যতে জোটের কেউই এরশাদকে নিতে পারবে না। কিন্তু বড় রাজনৈতিক দলগুলো সে ওয়াদা রক্ষা করতে পারেনি। ’৯১ সালে আওয়ামী লীগ যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছে, তখন তাদের সঙ্গে জাতীয় পার্টিকে নেওয়া হয়। আবার ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি জাতীয় পার্টিকে নিয়ে জোট করেছিল। বিনিময়ে এরশাদ সুবিধা নিয়েছেন। তিনি বলেন, লরেন্স লিফশুলজের লেখা বইয়ে বলা হয়েছে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও সেনা কর্মকর্তা মঞ্জুর হত্যা মামলায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন এরশাদ। এ দুই হত্যা মামলায় তার ফাঁসি হতে পারত। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তার বিচার করেনি। এরশাদকে বেশি ব্যবহার করেছে আওয়ামী লীগ। তারা জেলে নেওয়ার ভয় দেখিয়ে এরশাদকে দিয়ে দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনের বৈধতা নিয়েছে।  নুরুল আমিন বেপারী বলেন, দেশের রাজনীতিতে এরশাদ খুব একটা ফ্যাক্টর কখনো ছিলেন না। কারণ তার পতনের পর প্রতিটি নির্বাচনে তার পার্টির জনপ্রিয়তা কমেছে। আগামীতে জাতীয় পার্টি দুইভাগ হবে। একভাগের নেতৃত্বে থাকবে বেগম রওশন এরশাদ ও আরেকভাগে এরশাদের ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত