দুই বছর আগে নির্মাণ শেষ হওয়া ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক দেবে যাচ্ছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ ওজনের যানবাহন চলাচলের কারণে এমনটি হয়েছে বলে মনে করছে সরকারের প্রকল্প তদারকি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। এছাড়া ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন না থাকা, জেব্রাক্রসিং ও সাইন না থাকার কারণে এ সড়কে দুর্ঘটনাও বেড়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে তারা।
এ প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন করে সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে আইএমইডি বলেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ শেষ হয় ২০১৭ সালের জুনে। দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এ সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হলেও তা টেকসই হচ্ছে না। সড়কটির কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াতে সময় ২-৩ ঘণ্টা কমে গেছে। তবে দুর্ঘটনাও বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য যাচাই ছাড়াই ২০০৬ সালে ২ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা ব্যয়সংবলিত এই চার লেন প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। তিন দফায় এ প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ৭৬ শতাংশ। অতিরিক্ত সময় লেগেছে পাঁচ বছর। দায়িত্ব পালন করেছেন ১২ জন প্রকল্প পরিচালক (পিডি)। কিন্তু সড়কটি নির্মাণে প্রত্যাশিত মান নিশ্চিত করা যায়নি।
প্রকল্পের আওতায় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুসারে, সড়কটি দুই থেকে চার লেনে উন্নীত করতে ১০টি প্যাকেজে ১৯২ দশমিক ৩ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়। একই সঙ্গে ২৩টি সেতু, ২৪২টি কালভার্ট, তিনটি রেলওয়ে ওভারপাস, দুটি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়। এছাড়া নিরাপদ সড়ক পারাপারের স্বার্থে ৩৪টি স্টিল ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণসহ বৃক্ষরোপণ, কিলোমিটার পোস্ট, সাইন, সিগন্যাল বসানো হয়েছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির ডিপিপি প্রণয়নেই দুর্বলতা ছিল। এজন্য বারবার সংশোধনের প্রয়োজন হয়। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় বাড়লেও গতি ছিল মন্থর। প্রকল্পের কাঠামো অনুসারে সড়কটির স্থায়িত্বকাল হবে ২০ বছর। কিন্তু এর মধ্যে সড়কের রাটিং (দেবে যাওয়া) শুরু হয়ে গেছে। সক্ষমতার বাইরে দ্বিগুণ ওজনের যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়ার কারণে সড়কটিতে রাটিং হয়েছে।
সড়ক দেবে যাওয়ার সমস্যাকে প্রকৌশলীদের ভাষায় বলা হয় ‘রাটিং’। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগারের প্রকৌশলীরা বলছেন, পিচের জন্য পাথর-বিটুমিনের যে মিশ্রণ তৈরি করা হয়, সেটি ঠিকমতো না হলে রাটিং বা সড়ক দেবে যেতে পারে। সড়ক দেবে যাওয়ার আরেকটি কারণ যানবাহনের ‘ওভারলোড’। এর বাইরে দুর্বল নকশা বা দুর্বল নির্মাণকাজের কারণেও সড়ক দেবে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা। এছাড়া মাটির ধাপগুলোতে ঠিকমতো রোলিংয়ের কাজ না করা হলেও রাটিং দেখা দিতে পারে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৬ সালে ইউএসএএল ৮.১৬ টন ও দুই এক্সেল ছয় চাকার ট্রাকের ওজনসীমা ১০.২ টন হিসাবে সড়কটির পেভমেন্ট ডিজাইন করা হয়। ২০১৭ সালে সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনায় অনুরূপ ট্রাকের সর্বোচ্চ ওজনসীমা নির্ধারণ করা হয় ২২ টন। এতে করে সড়কটির মিডিয়ান সংলগ্ন লেনে পার্শ্ববর্তী লেনের তুলনায় অধিক রাটিং ও পেভমেন্টের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ না করায় এই রাটিং সৃষ্টি হয়েছে। ডিপিপি প্রণয়নের সময়ই বেশ দুর্বলতা ছিল। কারণ সড়কের ডিজাইন করার সময় ৬ শতাংশ হারে ট্রাফিক প্রবৃদ্ধি (যানবাহনের চাপ) ধরা হয়েছিল। যদিও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ম্যানুয়ালে সড়কের ডিজাইনে ১০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি ধরার নির্দেশনা রয়েছে। এজন্য যানবাহনের অতিরিক্ত ভার বহনের জন্য সড়কটি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, রাস্তায় রাটিং দৃশ্যমান হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়কের বড় দারোগার হাট এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে পরিদর্শন করে দেখা যায়, ২০১৭ সালের নভেম্বর হতে ভারবহন সীমা পুনর্নির্ধারণ করে ছয় চাকার দুই এক্সেল ট্রাকের জন্য ২২ টন, ১০ চাকা তিন এক্সেলের ট্রাকের জন্য ৩০ টন, ১৪ চাকা চার এক্সেল ট্রাকের জন্য সর্বোচ্চ সীমা ৪৪ টন নির্ধারণ করা হয়; যা সড়কের ডিজাইন প্রণয়নে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের যে অংশে রাটিং বেশি, যানবাহনগুলো সে অংশ এড়িয়ে চলছে। এতে ওই অংশে সড়কের মিডিয়ান সংলগ্ন লেনসহ উভয় লেনেই রাটিং পরিলক্ষিত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘অনেক টাকা খরচ করে রাস্তা হচ্ছে। কিন্তু টেকসই হচ্ছে না। বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগজনক। এজন্য শুধু ঠিকাদারদের দোষারোপ করলে হবে না, সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একটা প্রকল্পে বারবার পিডি পরিবর্তন হলে কাজের গতিধারা নষ্ট হয়। এটি পরিহার করতে না পারলে উন্নয়ন কাজে গতি আনা যাবে না।’
আইএমইডি বলছে, গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কের উপযোগিতা ও স্থায়িত্ব বাড়াতে নতুন করে রক্ষণাবেক্ষণ ও মজবুতিকরণ কাজ করতে হবে। এছাড়া ভারী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কুমিল্লার ময়নামতি ও পোর্ট কানেকটিং সড়কে ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ স্টেশন স্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সড়কে চিহ্ন, দিকনির্দেশনা, দূরত্বের বর্ণনা সংবলিত নির্দেশনা বোর্ড পর্যাপ্তসংখ্যক বাড়াতে হবে। নিরাপদ যোগাযোগের জন্য আন্তর্জাতিক মানের রোড সাইন ও সিগন্যালের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্পে পিডি পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
আইএমইডি সচিব আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমাপ্ত সব প্রকল্পের ওপরই প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়। এ থেকে ভবিষ্যৎ প্রকল্প প্রণয়নে কিছু পরামর্শও দেওয়া হয়। যেন প্রকল্প প্রস্তুত থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত এখান থেকে এটি শিক্ষা নেওয়া যায়। আশা করি, এই প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনগুলোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্টরা উপকৃত হবে। দেশও লাভবান হবে।’
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই সড়কটির খানাখন্দ ঠিকঠাক ও রক্ষণাবেক্ষণে এরই মধ্যে ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সড়কের ক্ষতি কমাতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতে ওভারলোডেড ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান নিয়ন্ত্রণে ২০টি স্থানে ২৮টি এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র নির্মাণে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা।
