বন্যায় মৃত্যু ও দুর্ভিক্ষের বিভীষিকা

আপডেট : ২০ জুলাই ২০১৯, ১১:৩৩ পিএম

বন্যা শুধু মানুষের স্বাভাবিক চলাচলকেই ব্যাহত করে না, ভাসিয়ে নিয়ে যায় বহু পরিশ্রমের ফসলও। তাই বড় আকারের বন্যা হলে যে কোনো দেশেই দেখা দেয় খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষ। প্রাণহানি ঘটে মানুষসহ সাধারণ জীবজন্তুর। পৃথিবীতে প্রলয়ঙ্করী অসংখ্য বন্যার ইতিহাস ঘেঁটে এই চিত্রটিই দেখা গেছে। বাংলাদেশেও ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল সে বছরের বন্যা। লিখেছেন পরাগ মাঝি

চীনের বন্যা, ১৯৩১

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর এই বন্যায় প্রায় ৪০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ১৯২৮ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত তীব্র খরায় ভুগছিল চীন। কিন্তু ১৯৩০ সালের শীতকালের শেষ দিকে ভারী তুষারপাত শুরু হয়। ১৯৩১ সালের শুরু থেকেই এই তুষার গলতে শুরু করে। তুষার গলা পানি ইয়াংৎসি নদীতে প্রবাহিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় তীব্র বৃষ্টিপাত। ফলে ফলে ইয়াংৎসি এবং হুয়াই নদীতে পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ইয়াংৎসি নদীতে শুধুমাত্র জুলাই মাসেই পানি বেড়েছিল ৭০ সেন্টিমিটার। ফলে তীর ছাপিয়ে প্লাবিত হয় লোকালয়। জুন মাস থেকেই নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হতে শুরু করেছিল। ফলে ওইসব এলাকার মানুষ উঁচু এলাকার দিকে ছুটছিল। কিন্তু পানির স্তর এমনভাবে বাড়ছিল যে, শিগগিরই তা চীনের সাবেক রাজধানী নানজিং শহরকে ডুবিয়ে দিল। প্রকৃতির আচরণও ছিল রহস্যময় আগ্রাসী। সে বছর শুধু জুলাই মাসেই ওই অঞ্চলে বড় ধরনের ৯টি সাইক্লোন আঘাত হেনেছিল, যেখানে প্রতি বছর গড়ে ২টি সাইক্লোন আঘাত হানে। ইয়াংৎসি নদীতে পানির স্তর বিপদসীমা অতিক্রম করে ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল। এতে চীনের প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি অঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ সেবার বন্যায় প্লাবিত অঞ্চলটি বাংলাদেশ ভূখ-ের চেয়েও বড় ছিল। প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ মানুষ এই বন্যার কবলে পড়ে। বন্যার পানিতে তলিয়ে কিংবা কলেরা টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৩৭ থেকে ৪০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বন্যার ফলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। কারণ বিস্তৃত অঞ্চলের শস্য মাঠগুলো বন্যার পানিতে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। চীনের দক্ষিণাঞ্চলের শহরগুলোর পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।

ইয়াংৎসি নদীর পানি উপচিয়ে কেবল ১৯৩১ সালেই বন্যা হয়নি। ১৯১১ সালে এই নদীর পানি দ্বারা সৃষ্ট বন্যায় ১ লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। ১৯৫৪ সালে মারা গিয়েছিল প্রায় ৩০ হাজার মানুষ, ১৯৯৮ সালে মারা যায় ৩ হাজার ৬৫৬ জন।

হোয়াং হো ফ্লাড, ১৮৮৭

বন্যায় সবচেয়ে ভুক্তভোগী দেশ হিসেবে চীনের নামটিই আসে সবার আগে। দেশটির হোয়াং হো নদীকে পশ্চিমারা ‘ইয়েলো রিভার’ নামে ডাকে। এই হোয়াং হো নদীকে বলা হয় চীনের দুঃখ। কারণ এই নদীর পানি নানা সময়ে চীনে বন্যার কারণ হয়েছে। কিংহাই পর্বতমালা থেকে সৃষ্ট এই নদীটি চীনের উত্তরাঞ্চল দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়েছে।

১৮৮৭ সালে হোয়াং হো নদী এক মহাবিপদ ডেকে এনেছিল চীনাদের জন্য। এই নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে কয়েকশো বছর ধরেই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করে বসবাস করত চীনা চাষিরা। কিন্তু সেবার ২৮ সেপ্টেম্বর ভারী বৃষ্টিপাতে নদীটির বাঁধ তলিয়ে গিয়ে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। বন্যায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপের জন্য আন্তর্জাতিক কোনো কর্র্তৃপক্ষ না থাকলেও জানা যায়, ওই বন্যায় আনুমানিক ২০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। কৃষিজমি নষ্ট হওয়ার ফলে দুর্ভিক্ষ এবং রোগশোকে ভুগে বেশিরভাগ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই বন্যার ক্ষয়ক্ষতি যথার্থভাবে নিরূপণ করা না গেলেও ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর এক দুর্যোগ হিসেবে একে চিহ্নিত করা হয়।

হোয়াং হো, ১৯৩৮

এই নদীর পানি থেকে ১৯৩৮ সালেও এক প্রলয়ঙ্করী বন্যার সূত্রপাত হয়েছিল। তবে এটির নেপথ্যে ছিল যুদ্ধ। কারণ দীর্ঘ বছর ধরে চীনারা জাপানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর এই আগের বছরটিতে জাপানিরা চীনের উত্তরাঞ্চল দখল করে নিয়েছিল। সে বছরের ৬ জুন জাপানি সৈন্যরা হেনান প্রদেশের রাজধানী কাইফেং দখল করে। শিগগিরই তারা ঝুয়াংঝু দখল করার পাঁয়তারা করছিল। জাপানিরা যেন উত্তর থেকে চীনের পশ্চিম এবং দক্ষিণাঞ্চলে এগিয়ে আসতে না পারে সে জন্য কোণঠাসা চীনাদের সর্বশেষ প্রচেষ্টা হিসেবে চীনা কমান্ডার চিয়াং কেই-শেক একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি পরিকল্পনা করেন, ঝেংজু প্রদেশে হোয়াংহো নদীর বাঁধ ধ্বংস করে জাপানের দখলকৃত উত্তরাঞ্চল তলিয়ে দেবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৫ থেকে ৭ জুনের মধ্যে বেশ কয়েকটি অঞ্চলে বাঁধ ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

হোয়াংহোর পানি ছড়িয়ে পড়ে চীনের উত্তরাঞ্চল জুড়ে। কয়েক হাজার গ্রাম নিমেষেই তলিয়ে যায় বন্যার পানিতে এবং কয়েক মিলিয়ন মানুষ গৃহহীন হয়ে শরণার্থী হয়ে পড়ে। অসংখ্য জাপানি সৈন্যও নিহত হয়েছিল এই বন্যায়। তবে, নিহত জাপানি সৈন্যদের প্রকৃত সংখ্যাটি কখনোই জানা সম্ভব হয়নি। ধারণা করা হয়, ওই বন্যায় প্রায় ৮ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বন্যার পানি প্রায় ৯ বছর জলাবদ্ধ করে রাখে চীনের উত্তরাঞ্চলীয় বিভিন্ন এলাকাকে। এই সময়ের মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ ওই অঞ্চল ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান নেয়। ১৯৪৭ সালে বন্যার পানি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় চীনারা। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত পরিকল্পিত এই বন্যার কথা অস্বীকার করে চীন। যদিও পরে এটি ফাঁস হয়ে যায়।

বানকিয়া বাঁধ ধস, ১৯৭৫

চীনের ঝুমাদিয়ান সিটির পাশ দিয়ে বয়ে চলা ‘রু’ নদীর বাঁধ বানকিয়া নামে পরিচিত। ১৯৪৯ সালে নির্মিত এই বাঁধ থেকে চীন ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭৭ মিটার ওপরে এর অবস্থান। বাঁধটির মোট সক্ষমতা ৪৯২ মিলিয়ন কিউবিক মিটার। অধিকাংশ চীনা নাগরিক এই বাঁধ থেকে উৎপন্ন বিদ্যুতে আস্থা রাখতেন। ৯টি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সমান বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতো বাঁধটি। চীনের হাজার হাজার মানুষের সেচ ও পরিবহনের উৎস ছিল এটি। ১৯৭৫ সালে সমুদ্রে সুপার টাইফুন নিনা এবং কোল্ড ফ্রন্টের মধ্যে ভয়াবহ এক সংঘর্ষে বাঁধটি ভেঙে যায়। ১৯৭৫ সালের ৩১ জুলাই চীনের হেনান প্রদেশে টাইফুন নিনার ভয়াবহতা সব ঝড়কে পেছনে ফেলে দেয়। বানকিয়া বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর প্রায় ২০ ফুট উঁচু ঢেউয়ের সৃষ্টি হয় প্লাবিত অঞ্চলে। এর ফলে ছোট ছোট আরও অন্তত ৬২টি বাঁধ ভেঙে বিশাল চীনের প্রায় অর্ধেক প্লাবিত হয়। বন্যার ফলে মারা যায় প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ। বিধ্বস্ত হয়ে পরে জনজীবন। লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মহামারী আকার ধারণ করে বন্যাসৃষ্ট রোগগুলো। অনাহারী মানুষের সংখ্যা এত বেড়ে গিয়েছিল যে, অনেকেই পানির ওপর ভাসমান পচে-গলে যাওয়া মৃত পশুদের খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্ট করেছে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, এই বাঁধ ধসের কিছুদিন আগেই কয়েক স্থানে এর ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাওয়ার কথা কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করেছিলেন চেন ঝিং নামে এক কর্মী। এমনকি তিনি এই বাঁধকে সুরক্ষিত করার কিছু উপায়ও বাতলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার এই প্রতিবেদনকে সে সময় ভর্ৎসনা করা হয় এমনকি তাকে প্রজেক্ট থেকে চাকরিচ্যুতও করা হয়।

সেন্ট ফ্যালিক্স ফ্লাড, ১৫৩০

ইউরোপে বন্যার ইতিহাসে সেন্ট ফ্যালিক্স ফ্লাড বা ফ্যালিক্স বন্যাকেই সবচেয়ে প্রলয়ঙ্করী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৫৩০ সালের ৫ নভেম্বর এই বন্যার সূত্রপাত হয়। এই বন্যার ফলে নেদারল্যান্ডসের রেইমার্সওয়াল শহরটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। এক সময় এই শহরটি রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমানে এটি সমুদ্রের নিচে অবস্থান করছে। বন্যা প্রথমে নেদারল্যান্ডসে শুরু হলেও পরে ফ্লেন্ডার্স ও জিল্যান্ডসহ প্রায় ১৮টি শহর তলিয়ে দেয়। শনিবার বন্যার সূচনা হয়েছিল বলে ইউরোপের ইতিহাসে ‘অলক্ষুনে শনিবার’ নামে একটি কথাই প্রচলিত হয়ে যায়। এই বন্যার ফলে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা যায়। এতে প্রচুর পরিমাণে গৃহপালিত পশু-পাখি ও গাছপালার ক্ষয়ক্ষতি হয়। পুরো নেদারল্যান্ডসই তখন বন্যাকবলিত হয়ে যায়।

রাস্তাঘাটের কোনো চিহ্ন ছিল না। প্রচুর পরিমাণে ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে। সারা দেশেই তখন বন্যা সতর্কতার ঘোষণা দেওয়া হয় এবং নেদারল্যান্ডসই একমাত্র দেশ যার পুরো দেশই একবারে দুর্যোগপূর্ণ ঘোষণা করা হয়।

হ্যানয় এবং রেড রিভার ডেল্টা ফ্লাড, ১৯৭১

এই বন্যাটি যখন ভিয়েতনামে আঘাত করে সে সময় মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে তারা এক দীর্ঘ যুদ্ধে লড়াই করছিল। ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট এই বন্যার সূচনা হয়। বন্যার প্রকৃত কারণটি এখনো রহস্যাবৃত থাকলেও ধারণা করা হয়, প্রবল বৃষ্টি ও ঝড়ের ফলে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের বন্যা নিয়ন্ত্রণকারী বাঁধগুলো ভেঙে গিয়েছিল। এই বন্যায় প্রায় এক লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনামে এই বন্যাটি আরও করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। দুর্দশা কাটাতে অনেক বছর সময় লাগে তাদের। কারণ বন্যার পর যথারীতি দুর্ভিক্ষ হানা দিয়েছিল দুর্গত অঞ্চলগুলোতে। শক্তিশালী এই বন্যায় ভিয়েতনামের প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যা শেষ হলে নদীতে মজবুত বন্যা নিরোধ বাঁধ নির্মাণ করা হয়।

জিয়াংসু-আনহুই ফ্লাড, ১৯১১

জিয়াংসু-আনহুই ফ্লাডকে অনেক সময় ইয়াংটাজ রিভার ফ্লাডও বলা হয়। এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ নদী ইয়াংটাজ। এটি তিব্বতের গরুসিয়ার থেকে শুরু হয়ে পূর্ব চীনের দিকে বয়ে গেছে। চীনে ফসলি জমিতে সেচের অন্যতম উৎস এই নদী। যোগাযোগের জন্যও এই নদীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই নদীতে শক্তিশালী তিনটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। বিরামহীন বৃষ্টিপাতে ১৯১১ সালের ১৬ মে ইয়াংটাজ নদীর দুই পাড় ভাসিয়ে দেয়। শুধু ইয়াংটাজ নয়, একই সঙ্গে ভেসে গিয়েছিল হুয়াই নদীর দুই পাড়ও। এতে মধ্য ও পূর্বচীনের বিস্তৃত অঞ্চলের শস্য পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। প্লাবিত অঞ্চলগুলোতে পরে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। বিশাল এই বন্যায় প্রায় এক লাখ মানুষ মারা যায় এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়ে পড়ে। খাদ্যাভাবে চারদিকে দাঙ্গা, খুনোখুনি, ডাকাতির মতো অপরাধ বেড়ে গিয়েছিল। ১৯১২ সালে চীনে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় তার বড় কারণ ছিল এই বন্যা।

সেন্ট লুসিয়ার বন্যা, ১২৮৭

নিম্নভূমির দেশ নেদারল্যান্ডসে বন্যা খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যপার। ১২৮৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর একটি প্রলয়ঙ্করী ঝড় দেশটির সমুদ্র উপকূলে আঘাত হানে। ফলে দেখা দেয় বন্যা। এই বন্যায় অসংখ্য গ্রাম সমুদ্রের পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। বন্যাটি এত শক্তিশালী ছিল যে, দেশটির উঁচু শহর আমস্টারডাম হঠাৎ করেই সমুদ্র তীরবর্তী শহরে পরিণত হয়। যা এখনো কিছু অংশে বহাল আছে। প্রায় ৫০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল এই বন্যায়।

বাংলাদেশ, ১৯৭৪

ইতিহাসের ভয়াবহ বন্যাগুলোর মধ্যে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের বন্যা অন্যতম। স্বাধীনতার পর দুই বছর খরায় আউশ ও আমনের ব্যাপক ক্ষতির পর আসে ’৭৪-এর ওই বন্যা। সে বছর এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়। ব্রহ্মপুত্র নদও বিধ্বংসী হতে থাকে এবং বন্যা দেখা দেয়। মধ্য আগস্টেই তা ভয়ংকর রূপ ধারণ করে দেশের দুই-তৃতীয়াংশ ভাসিয়ে নেয়। গ্রীষ্মকালীন ফসলের ৮০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভেস্তে যায় কৃষকের শীতকালীন ফসল চাষের প্রস্তুতিও। ভয়াবহ এই বন্যায় সরকারি হিসেবে প্রায় ২৮ হাজার ৭০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। বেসরকারি অনেক পরিসংখ্যানে মৃত মানুষের সংখ্যাটি লক্ষাধিক বলে দাবি করা হয়।

জানা যায়, ১৯৭৪ সালে বন্যার পানি বাড়তে শুরু করলে দূরদর্শী অনেক পরিবারই বাড়ির পার্শ্ববর্তী গাছের ওপর মাচা বেঁধে রেখেছিল। তাদের আশঙ্কাকে সত্যি করে সে সময় তলিয়ে যায় শত শত বাড়িঘর। সে সময় অনেকেই গাদাগাদি করে উঁচু গাছের ওপর অবস্থান নিয়েছিল।

বন্যার ভয়াবহতা এতটাই তীব্র ছিল যে, জামালপুরে ১৫টি ইউনিয়নে মরদেহ দাফনের মতো শুকনো জায়গাও ছিল না। কুড়িগ্রামের চিলমারী রেললাইনের পাশে একটি গণসমাধি তৈরি করা হয়। ১৯৭৪ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি হিসাবে রাজধানীর ১২৪টি ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেয় ৮৫ হাজার ৭০০ মানুষ।

ভয়াবহ ওই বন্যায় বেকার হয় ২৭ লাখ শ্রমজীবী আর গৃহহীন হয় প্রায় এক কোটি মানুষ। বেঁচে থাকার রসদ ক্রমেই দু®প্রাপ্য হয়ে ওঠে। ভাগ্যগুণে পাওয়া গেলেও তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।

৭৮-এর বন্যায় বিপুল পরিমাণ ধানের ফসল নষ্ট হয় এবং চালের দাম অসম্ভব বেড়ে যায়। ১৯৭২ সালের জুলাই থেকে ’৭৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ২২ মাসের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক দ্রব্যের দাম বাড়ে ৮০০ শতাংশ পর্যন্ত। চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় দুর্ভিক্ষের প্রকোপ ’৭৪-এর মার্চ মাস থেকে দেখা দেয়। বন্যা এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। সে সময়ে পথেঘাটে কঙ্কালসার মানুষের মৃতদেহ পড়ে থাকত। অভাবের তাড়নায় গায়ের কাপড় পর্যন্ত বিক্রি করেছে অনেকে। অনাহারে থেকে থেকে কোনো কোনো পরিবার বেছে নিয়েছিল আত্মহত্যার পথও। বহু কৃষক কয়েক মৌসুমের ফসল অগ্রিম বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। খাবার ও কাজের খোঁজে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রচুর মানুষ ঢাকা শহরে ছুটে আসে। অনেকে তাদের ভিটেমাটি ও সর্বস্ব বিক্রি করে খাদ্যের সন্ধানে শহরে পাড়ি জমায়। নভেম্বর মাসে বিদেশি সাহায্য ও রবিশস্য বাজারে আসার ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত