দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে গুনদুম পর্যন্ত ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পটি সরকারের অগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত। ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডরের সঙ্গে যুক্ত হতে ২০১০ সালের জুলাইয়ে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ৯ বছরে প্রকল্পটির কাজের অগ্রগতি মাত্র ২৭ শতাংশ। রোহিঙ্গাদের আগমনে বর্তমানে এই প্রকল্পের কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এজন্য সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের বরাদ্দ অর্থও ব্যয় হয়নি। জমি অধিগ্রহণ হলেও জটিলতায় ক্ষতিপূরণ দেওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় প্রকল্পটির গতি বাড়াতে নিয়মিত সমন্বয় সভা করার পরামর্শ দিয়েছে পরিকল্পনা বিভাগের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।
অগ্রাধিকারভুক্ত প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিতে তদারকি করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এ নিয়ে গঠিত ফাস্টট্র্যাক মনিটরিং কমিটির সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুসারে, গত অর্থবছরের জুন পর্যন্তু দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ২৭ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ২১.৬১ শতাংশ। গত অর্থবছর এ প্রকল্পের জন্য মূল বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। ব্যয় না হওয়ায় সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ কমিয়ে রাখা হয় ৫২৮ কোটি টাকা। মে পর্যন্ত আরএডিপি বরাদ্দের মাত্র ৩৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পে এখন চলছে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ। এক্ষেত্রে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত অংশের জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এখন চলছে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কাজ। কিন্তু কক্সবাজার সদর-চকরিয়া অংশে ক্ষতিপূরণ প্রদান একটু পিছিয়ে রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটে প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে, জানান তিনি। বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানের আগে এই অংশের কাজে গতি আসবে কি না তা বলা যাচ্ছে না। এটা সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়।
আইএমইডির উপ-পরিচালক আশরাফুজ্জামান ভূঁইয়ার সম্প্রতি করা এক সরেজমিন পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের চন্দনাইশ এলাকায় ১০.১৭ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের ৭৮ শতাংশ ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। সাতকানিয়ায় ১৭৬.৩৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হলেও ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন ৫৭ শতাংশ। লোহাগড়া অঞ্চলে ১৭.৯১ একর জায়গা অধিগ্রহণের বিপরীতে এ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন ৫৫ শতাংশ মানুষ।
একই সঙ্গে কক্সবাজার জেলায় তিনটি উপজেলার মধ্যে কক্সবাজার সদরে ২১০.৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে ৫৬ শতাংশ। রামুতে নেওয়া হয়েছে ২৭৮.৪৯ একর জমি, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে ৫১ শতাংশ ও চকরিয়াতে প্রকল্পের জন্য নেওয়া হয়েছে ৫১৪ একর জমি। এর বিপরীতে ১৩ শতাংশ মানুষকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা আইএমইডিকে জানিয়েছে, কক্সবাজারে ভারুয়াখালী আশ্রয়ণ প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণজনিত কিছু জটিলতা রয়েছে। এটিসহ দুই জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হলে প্রকল্পের ভৌত কাজের অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে। কিন্তু তার জন্য গতি বাড়াতে নিয়মিত সমন্বয় সভা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে আইএমইডি প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, এ প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার কথা চীনের। ২০১০ সালের জুলাইয়ে এ প্রকল্প অনুমোদন পায়।
২০২২ সালে এর কাজ শেষ হওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছিল। ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর একনেক বৈঠকে সিঙ্গেল লাইন ট্র্যাককে মিটারগেজের পরিবর্তে ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই বছরই প্রধানমন্ত্রী রেলপথ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় এ প্রকল্পের মাধ্যমে সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক ও নতুন রেললাইন নির্মাণের সময় ভবিষ্যতে ডাবল লাইন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমির সংস্থান রেখে ভূমি অধিগ্রহণের নির্দেশনা দেন। সে অনুযায়ী কাজ করার কথা থাকলেও ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের আগমনে প্রকল্পের কাজে গতি হারায়।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। বসিয়ে বসিয়ে ১০ লাখ লোককে লালন-পালন করতে হচ্ছে, এটা বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির দেশের জন্য খুবই কঠিন। এজন্য দ্রুত তাদের প্রত্যাবাসন করতে পারলে দেশের জন্য মঙ্গল হবে।
তিনি বলেন, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডরে যুক্ত হতে পারলে দেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য বেড়ে যাবে। পাশর্^বর্তী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বাড়বে। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে এই প্রকল্পের কাজে দেরি হওয়া দুঃখজনক। এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ, প্রকল্প ছোট বা বড় হোক; নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়া জরুরি। তা না হলে বাড়বে ব্যয়, অর্থনীতিতে সুফল আসবে দেরিতে।
