বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেছেন দেশব্যাপী আলোচিত রিফাত হত্যা মামলার সাক্ষী থেকে আসামি হওয়া তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির জন্য সদ্য নিয়োগ করা আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম। মিন্নির জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার আগে গত শনিবার রাতে বরগুনার উকিলপট্টি এলাকার সদর রোডে সাংসদ শম্ভুর ব্যক্তিগত ল চেম্বারের পেছনের একটি কক্ষে ওই বৈঠক হয়। এ সময় বরগুনা বারের সভাপতি আবদুর রহমান নান্টু এবং অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর আক্তারুজ্জামান বাহাদুরও সেখানে ছিলেন। যদিও মিন্নির বাবা
মোজাম্মেল হোসেন কিশোর সাংসদ শম্ভু এবং তার ছেলে সুনাম দেবনাথের বিরুদ্ধে রিফাত হত্যা মামলায় প্রভাব খাটানোর অভিযোগ করছেন শুরু থেকেই। এ পরিস্থিতিতে মিন্নির জন্য নিয়োগ করা আইনজীবীর সঙ্গে সাংসদ ও সাংসদ পুত্রের বৈঠকের পর মেয়ের সুবিচার পাওয়া নিয়ে চিন্তিত বাবা মোজাম্মেল।
এর আগে গত শুক্রবার কড়া নিরাপত্তা মধ্য দিয়ে মিন্নিকে আদালতে হাজিরের পর রিফাত হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় তার জবানবন্দি দেওয়ার কথা জানিয়েছিল পুলিশ। সেদিন মিন্নির বাবা মোজাম্মেল সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমার মেয়ে জীবন বাজি রেখে তার স্বামীকে রক্ষা করতে গেছে। এটাই তার অপরাধ? এ সবকিছুই শম্ভু বাবুর (সাংসদ শম্ভু) খেলা। তার ছেলে সুনাম দেবনাথকে সেভ করার জন্য আমার মেয়েকে বলি দেওয়া হচ্ছে।’ সেদিন মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবীও আদালতে দাঁড়াননি। তখন মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, তিনি তিন জন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তাদের দাঁড়ানোর কথাও ছিল, কিন্তু তারা শুনানিতে অংশ নেননি। ওই তিন আইনজীবী শুনানিতে না দাঁড়ানোর কারণ হিসেবে ওকালতনামায় সই না হওয়ার কথা বললেও মিন্নির বাবার সন্দেহ, সাংসদ শম্ভু এবং তার ছেলের নির্দেশনার কারণে আইনজীবীরা তার মেয়ের পক্ষে দাঁড়াননি।
এরপর শনিবার দুপুরে বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল বারী আসলামকে মিন্নির আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এরপর শনিবার রাত ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে সাংসদ শম্ভুর বরগুনার সদর রোডের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে বরগুনা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুর রহমান নান্টু এবং সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল বারী আসলামকে ঢুকতে দেখা যায়। ওই কক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন সাংসদপুত্র সুনাম দেবনাথ এবং বরগুনার অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আক্তারুজ্জামান বাহাদুর। তারা কক্ষের ভেতরে প্রবেশের পর ভেতর থেকে সুনাম একবার কক্ষের দরজা আটকে দেন। এ সময় কক্ষের বাইরে নিহত রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফও অপেক্ষমাণ ছিলেন। পরে ৯টা ৫৩ মিনিটের দিকে সুনাম কক্ষ থেকে বের হয়ে দুলাল শরীফের সঙ্গে কানে কানে কথা বলেন। এরপর দুলাল শরীফ চেম্বার থেকে দ্রুত বের হয়ে যান। এ সময় এই প্রতিবেদক তার পিছু নিলেও তিনি দ্রুত মোটরসাইকেলে সাংসদের ব্যক্তিগত কার্যালয় এলাকা দ্রুত ত্যাগ করেন।
পরে রাত ১০টা ১৫ মিনিটে মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম, বারের সভাপতি আবদুর রহমান নান্টু ও বরগুনার অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আক্তারুজ্জামান বাহাদুর সংসদ সদস্যের কার্যালয় ত্যাগ করেন। এ সময় আসলামের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনিও ব্যস্ততা দেখিয়ে স্থান ত্যাগ করেন। তিনি প্রায় ৩০ মিনিটের মতো সংসদ সদস্যের কার্যালয়ে অবস্থান করেন।
পরে মাহবুবুল বারী আসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনজীবী সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্যের কাছে আসতেই পারেন। এটা সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল।’
সংসদ সদস্য কি তাদের ডেকেছিলেন, নাকি তারা ইচ্ছা করেই সংসদ সদস্যের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এমপি বারের সভাপতিকে ফোন দিয়েছিলেন, তিনি আমাকে জানানোর পর আমি সভাপতির সঙ্গে এসেছি।’
সাংসদ শম্ভুর সঙ্গে আইনজীবী আসলামের সাক্ষাতের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আপনাদের বুঝতে আর কিছু বাকি আছে?’
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মিন্নির আইনজীবী হিসেবে অ্যাডভোকেট আসলাম সংসদ সদস্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যেতে পারেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনোভাবেই পারেন না। এ বিষয়ে অন্য আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
মিন্নির আইনজীবী কেন দেখা করতে এসেছিলেন, জানতে চাইলে সরাসরি উত্তর না দিয়ে সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু বলেন, ‘তারা চা খেতে এসেছিলেন।’ তবে তারা কেন চা খেতে এসেছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি।
গতকাল রবিবার কারাবন্দি মিন্নির জামিন আবেদন নাকচ করে দেয় বরগুনার আদালত। মিন্নির পক্ষে করা জামিন আবেদনের ওপর মামলার বাদী ও বিবাদীপক্ষের আইনজীবীদের শুনানি শেষে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সিরাজুল ইসলাম গাজী এ আদেশ দেন।
