যেভাবে খুন হলেন জুলিয়াস সিজার

আপডেট : ২২ জুলাই ২০১৯, ১১:৪৪ পিএম

ইতিহাসে অনন্য এক সমরনায়ক এবং রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিত জুলিয়াস সিজার। ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ‘জুলাই’ মাসের নামটি তার স্মরণেই। সাধারণ মানুষ থেকে রোমান সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি হওয়া এবং ক্লিওপেট্রার সঙ্গে প্রণয় ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। তার মর্মান্তিক হত্যাকান্ড ও সমান আলোচিত। ইতিহাসের এই নায়ককে নিয়ে লিখেছেন আন্দালিব আয়ান

ভিনি ভিসি ভিডি

বলা হতো, জুলিয়াস সিজার ছিলেন রোমান পুরাণে উল্লিখিত প্রেমের দেবী ভেনাস ও ইউলাসের পুত্র ট্রজান রাজকুমার ইনিয়াসের বংশধর। রোম থেকে ২০ মাইল দক্ষিণে অ্যালবা লংগা নামক স্থানে সিজারের পরিবার বাস করত। সম্ভ্রান্ত এই পরিবারে খ্রিস্টপূর্ব ১০০ অব্দে তার জন্ম। পিতা গ্যাইয়াস জুলিয়াস সিজার ছিলেন প্রাচীন রোমের একজন সিনেটর। তার মা অউরেলিয়া কোট্টাও এক প্রতাপশালী পরিবার থেকে এসেছিলেন।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে পরিবারের কর্তা হয়ে ওঠেন সিজার। কারণ বড় দুই বোন থাকলেও তার আর কোনো ভাই ছিল না। সে সময় সিজারের ফুপা ও রোমান প্রজাতন্ত্রের প্রভাবশালী সিনেটর গ্যাইয়াস মারিয়াস প্রতিদ্বন্দ্বী লুসিয়াস কর্নেলিয়াস সুল্লার সঙ্গে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। সে সময় মারিয়াস ও তার মিত্র লুসিয়াস সিনা সিজারকে জুপিটারের প্রধান যাজক হিসেবে নিয়োগ দেন। লুসিয়াস সিনার কন্যা কর্নেলিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়া হয়। গৃহযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত সুল্লা জয়লাভ করেন। ফলে বিরোধী শিবিরের আত্মীয়তাসূত্রে সুল্লার রোষানলে পড়েন সিজার। তাকে তার উত্তরাধিকার ও যাজকবৃত্তি থেকে জোরপূর্বক বঞ্চিত করা হয়। এমনকি তাকে স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটানোর জন্যও চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি তাতে অস্বীকৃতি জানালে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পরে অবশ্য সুল্লার আক্রোশ থেকে তিনি রেহাই পেয়েছিলেন। কারণ তার মায়ের পরিবার ছিল সুল্লার সমর্থক। মামার বাড়ির হস্তক্ষেপে সুল্লা তার ওপর থেকে হুমকি প্রত্যাহার করে নেন। যদিও সে-সময় সুল্লা মন্তব্য করেছিলেন, জুলিয়াস সিজার একাই অনেকগুলো মারিয়াসের সমান।

ক্ষমা পেলেও সুল্লার কাছ থেকে দূরে থাকাকেই শ্রেয় মনে করেছিলেন সিজার। তাই তিনি রোম ত্যাগ করে এশিয়ায় চলে আসেন এবং মার্কাস মিনাসিয়াস থার্মাসের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পরে তিনি সিসিলিতে সার্ভিলিয়াস ইস্যারিকাসের নেতৃত্বেও কাজ করেন। দক্ষ সৈনিক এবং যুদ্ধে প্রাণ বাঁচানোর কৃতিত্ব স্বরূপ ‘সিভিক ক্রাউন’ পুরস্কার লাভ করেন সিজার। একই সময়ে তিনি সামরিক দূত হিসেবে পদোন্নতি লাভের পাশাপাশি একটি নৌবহর সুরক্ষার দায়িত্ব পান।

খ্রিস্টপূর্ব ৭৮ অব্দে সুল্লার মৃত্যু হলে আবারও রোমে ফিরে আসেন সিজার। এ সময় তিনি ছিলেন ২২ বছরের যুবক। আইনজীবী হিসেবে জীবিকা ধারণ শুরু করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৭৫ অব্দে ২৫ বছর বয়সে ভ্রমণে গিয়ে ফেরার সময় ইজিয়ান সাগরে জলদস্যুরা তাকে অপহরণ করে এবং মুক্তিপণ হিসেবে ২০ ট্যালেন্টস দাবি করে। কিন্তু এতে খুব অপমান বোধ করেন নিজের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণকারী সিজার। তিনি জলদস্যুদের কাছে দাবি করেন, তার মূল্য আরও বেশি, অন্তত ৫০ ট্যালেন্টস। বন্দি থাকা অবস্থায় দস্যুদের সঙ্গে তার সখ্যও গড়ে ওঠে। তবে, জলদস্যুদের তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘মুক্তি পাওয়ার পর আমার এবং আমার পরিবারের সম্মান ক্ষুণ্ণ করার জন্য তোমাদের ক্রুশবিদ্ধ করব।’ তার এমন কথায় জলদস্যুরা কৌতুক ভেবে হেসে খান খান হয়ে যেত। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, মুক্তির পর সিজার সত্যিই দস্যুদের ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করেছিলেন।

রোমে ফেরার পর শুরু হয় তার রাজনৈতিক জীবন। সে সময় তিনি সামরিক উচ্চপদে আসীন হন। পরে খ্রিস্টপূর্ব ৬৯ অব্দে তিনি বিচারক পদে নির্বাচিত হন। একই বছর তার স্ত্রী কর্নেলিয়া মারা যান। পরে তিনি পম্পেইয়া নামে এক সম্পদশালী মেয়েকে বিয়ে করেন। যদিও খ্রিস্টপূর্ব ৬১ অব্দে স্ক্যান্ডালে জড়িয়ে পড়ার কারণে তিনি পম্পেইয়ার সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটান। বিবাহ বিচ্ছেদের পর সিজার স্পেনে চলে যান এবং সেখানে হিসপানিয়া অঞ্চলের শাসক নিযুক্ত হন। ওই অঞ্চলের সরকারবিরোধী উপজাতিগুলোকে পরাজিত করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনেন এবং নিজের সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলেন। এই কাজের পুরস্কার হিসেবে তিনি কনসুল পদে উন্নীত হন।

উচ্চ মর্যাদা নিয়ে রোমে ফিরে এসে তিনি সিনেটের নেতৃত্বে থাকা পম্পে ও ক্র্যাসাসের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক চুক্তি করেন। এরপর তিনি একজন প্রভাবশালী ও ধনী সিনেটরের কন্যা ক্যালপুর্নিয়াকে বিয়ে করেন। এছাড়াও পম্পের সঙ্গে নিজের বন্ধুত্বকে আরও দৃঢ় করতে তিনি নিজের কন্যা জুলিয়াকে তার সঙ্গে বিয়ে দেন। তারপর পম্পে, ক্র্যাসাস এবং সিজার মিলিত হয়ে সফলতার সঙ্গে রোম শাসন করতে থাকেন।

সরকারি পদে অভিষিক্ত থাকাকালীন রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে  ক্র্যাসাসের কাছে ঋণী হয়ে পড়েন সিজার। তিনি বুঝতে পারেন, একমাত্র রাজ্য জয়ের মাধ্যমেই সম্পদ আহরণ করা সম্ভব। তাই তিনি সৈন্যবাহিনী নিয়ে রোম ত্যাগ করেন।

খ্রিস্টপূর্ব ৫৮ অব্দে সিজার তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে গল পৌঁছান। গলে প্রায় ৮ বছর ধরে যুদ্ধ চলল। এই যুদ্ধে সিজার এক প্রতিভাবান সেনাপতিরূপে আত্মপ্রকাশ করেন। গলরা নিজেদের স্বাধীনতার জন্য নির্ভিকভাবে যুদ্ধ করেছিল, কিন্তু তাদের বিশৃঙ্খল বাহিনী যুদ্ধে অভিজ্ঞ সিজারের বাহিনীর আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারেনি। সিজার গল দখল করে নেন এবং কয়েক লাখ যুদ্ধবন্দিকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেন। সিজার গলদের পবিত্র স্থান যেখানে দেবতাকে নিবেদন করার উদ্দেশ্যে স্বর্ণ সঞ্চয় করে রাখা হতো, তা লুট করে সেনাদের বেতন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

খ্রিস্টপূর্ব ৫৪ অব্দে পার্থিয়ানদের সঙ্গে যুদ্ধে ক্র্যাসাস নিহত হন এবং একই বছর সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সিজারের কন্যা জুলিয়াও মারা যায়। মেয়ের মৃত্যুর পর পম্পের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ক্র্যাসাসের মৃত্যুর পর পম্পে হয়ে ওঠেন রোমের রাজনৈতিক ও মিলিটারি শক্তির একচ্ছত্র অধিকারী। তিনি গলে সিজারের শাসনকালের সমাপ্তি ঘোষণা করেন এবং সাধারণ নাগরিক হিসেবে তাকে রোমে ফিরে আসতে বলেন। কিন্তু আদেশ অনুযায়ী না ফিরে, নিজের সৈন্যবাহিনী নিয়ে রুবিকন নদী পার হয়ে রোমে প্রবেশ করেন। এই নদী ছিল গল ও রোমের সীমানা নির্ধারক। এই সীমানা অতিক্রম করে যাওয়ার অর্থ প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। সিজারের সম্মুখে তখন দুটি পথ; হয় রোম শাসন করা, নয় কলঙ্কিত মৃত্যুদন্ড লাভ। সিজার অনেকক্ষণ ধরে ভাবলেন, তারপর সমস্ত চিন্তা ঝেড়ে ফেলে উচ্চারণ করলেন: ‘ইয়াক্তা এস্ত আলেয়া।’ অর্থাৎ দান চালা হয়ে গেছে।

সিনেট তখন পম্পেইয়ের ওপর ভার দিলেন সিজারকে প্রতিরোধ করার। কিন্তু সিজার এত দ্রুত রোম আক্রমণ করেছিলেন যে, পম্পেই প্রতিরক্ষার কোনো আয়োজনই করার সুযোগ পাননি। যুদ্ধের আভাস পেয়ে পম্পে রোম ছেড়ে প্রথমে স্পেনে ও পরে সেখান থেকে গ্রিসে পালিয়ে যান। সেখানেই সিজারের অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে পম্পের সেনাবাহিনীর যুদ্ধ হয় ও যুদ্ধে পম্পে পরাজিত হন। সিজার মাত্র তিনটি শব্দে তার বিজয় সংবাদ রোমে পাঠিয়েছিলেন, ‘ঠবহর, ারফর, ারপর.’ অর্থাৎ এলাম, দেখলাম, জয় করলাম। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পম্পেই মিসরে পালিয়ে যান। পম্পের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে রোমের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন সিজার।

ক্লিওপেট্রার সঙ্গে প্রণয়

পম্পেকে ধরার জন্য সিজারের বাহিনী মিসরের দিকে রওনা হয়। ইতিমধ্যে সিজারের জয়ের খবর মিসরে ছড়িয়ে পড়ে এবং মিসরীয়রা ভেবে নেয় যে ঈশ্বর সিজারের পক্ষে ছিলেন। তাই মিসরে সহযোগিতার বদলে পম্পেকে হত্যা করা হয়। এই হত্যার দায়ে মিসরে মার্শাল আইন জারি করে ও রাজপ্রাসাদ দখল করে নেয় সিজারের বাহিনী। মিসরের সিংহাসনে ছিলেন ক্লিওপেট্রার একাধারে ভাই ও স্বামী টলেমি। কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে টলেমির সঙ্গে রাজ সিংহাসনের অধিকারী ছিলেন ক্লিওপেট্রাও। ফলে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে টলেমি তাকে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করে দিয়েছিলেন।

image

জানা যায়, মিসরের রাজপ্রাসাদ দখলের পর একটি ইরানি কার্পেট নিয়ে আসা হয় সিজারের সামনে। সিজার এই কার্পেটের ভাঁজ খুলতে বলেন তার সৈন্যদের। কার্পেটটি যখন মেঝেতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন এর ভেতর মোড়ানো অবস্থায় থাকা ২২ বছরের অনিন্দ্য সুন্দরী ক্লিওপেট্রা বেরিয়ে আসেন। প্রথম বার দেখেই সিজার তার প্রেমে পড়ে যান। তারপর সিজার ক্লিওপেট্রাকে তার হারানো সিংহাসন ফিরিয়ে দিতে চাইলে টলেমির বাহিনীর সঙ্গে তার যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে সিজার জয়লাভ করেন। সিজার বেশ কয়েকমাস রাজ অতিথি হিসেবে মিসরে অবস্থান করেন। এসময় প্রায়ই ক্লিওপেট্রাকে নিয়ে নীলনদের বুকে প্রমোদতরীতে চড়ে ঘুরে বেড়াতেন সিজার। তাদের প্রণয়ের ফলস্বরূপ খ্রিস্টপূর্ব ৪৭ অব্দে ক্লিওপেট্রা একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। যার নাম রাখা হয় টলেমি সিজার।

ক্লিওপেট্রার হাতে মিসরের শাসনভার দিয়ে সিজার তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে এশিয়া মাইনরের দিকে অগ্রসর হন এবং পথে অনেক অঞ্চল জয় করে খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ অব্দের জুলাই মাসে বিজয়ীর বেশে তিনি রোমে প্রবেশ করেন।

নির্মম হত্যাকান্ড

খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ অব্দে নির্মম হত্যাকার শিকার হন সিজার। অন্তত ৬০ জন রোমান সিনেটর তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। সিনেটর গেইয়াস ক্যাসিয়াস লঙ্গিনাস এবং মার্কাস জুনিয়াস ব্রুটাসের নেতৃত্বে রোমের পম্পেই থিয়েটার সংলগ্ন একটি স্থানে ৩৫ বার ছুরিকাঘাত করে সিজারকে হত্যা করা হয়।

রোমে ফিরে বিভিন্ন সংস্কার কাজে হাত দিয়েছিলেন সিজার। তিনি দরিদ্রদের ভূমি পুনর্বণ্টন করেন, পুলিশ বাহিনী তৈরি করেন, ঐতিহাসিক কারথ্যাজ নগরী পুনর্নির্মাণ করেন এবং ট্যাক্স সিস্টেম তুলে দেন। তিনি প্রায়ই সিনেটদের মতামতের তোয়াক্কা না করেই আইন প্রয়োগ বা পরিবর্তন করে ফেলতেন। এভাবে ধীরে ধীরে তার শক্তি বৃদ্ধি হতে থাকে। ফলে সিনেট এবং বিরোধীদলীয়রা বুঝতে পারে যে, এভাবে চলতে থাকলে সিজার একসময়  সিনেট বাতিল করে নিজেই সম্রাট বা রাজা হিসেবে এককভাবে শাসন করতে শুরু করবেন। তাই তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়।

হত্যাকান্ডের আগে ষড়যন্ত্রকারীরা একে অন্যের বাড়িতে মিলিত হতেন। আলোচনা হতো কোথায়, কখন, কীভাবে হত্যাকা-টি ঘটানো যায়। ষড়যন্ত্রকারীদের বেশির ভাগের অভিমত ছিল তাকে সিনেটে হত্যা করা। কারণ সিনেট অধিবেশনের দিন শুধু সিনেটরদেরই ভেতরে যেতে দেওয়া হবে। সেদিন সিনেটররা তাদের ধারালো ড্যাগার আলখেল্লার ভেতর লুকিয়ে ঢুকে পড়তে পারবেন সহজেই।

সিজারকে যেদিন খুন করা হয় সেদিন তার চিকিৎসক ছাড়াও স্ত্রী ক্যালপুর্নিয়া নানা কারণে সিনেটে যেতে মানা করেছিলেন। আগের রাতে ক্যালপুর্নিয়া একটি ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, সিজারকে কারা যেন হত্যা করেছে। আর তার লাশের পাশে প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এমন আশঙ্কার কথা তিনি হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ঘনিষ্ঠ বন্ধু ব্রুটাসের কথামতো সিনেটের উদ্দেশে রওনা হন তিনি।

৪৪ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দের ১৫ মার্চ। এই দিনটি ছিল রোম সাম্রাজ্যের বিশেষ একটি দিন। রোমান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এই দিনে নববর্ষ পালন করা হতো। উৎসবে মেতে উঠত সাধারণ প্রজা থেকে শুরু করে অভিজাত শ্রেণি। এই দিনটিতে ধর্মীয় অনেক আচারও পালন করা হতো। দেবতা জুপিটারের উদ্দেশে এই দিনে ভেড়াসহ অনেক সামগ্রী উৎসর্গ করা হতো।

বিশেষ ওই দিনটিতে সিজার যখন সিনেটে প্রবেশ করেন, তাকে দেখে সিনেটররা সম্মান জানানোর জন্য উঠে দাঁড়ান। যারা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা দাঁড়িয়েছিলেন সিজারের কাছাকাছি। তার ঠিক ডান পাশে এসে দাঁড়ান সিনেটর টিলিয়াস কিম্বার। কিম্বারের ভাইকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন সিজার। কিম্বার তার ভাইয়ের একটি পিটিশন নিয়ে সিজারের কাছে দেন। এ সময় অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারী তার পাশে এসে দাঁড়ান কিম্বারের সমর্থনে। এ সময় হঠাৎ করে কিম্বার সিজারের ঘাড় ধরে ফেলেন এবং সিজারের জ্যাকেট টেনে খুলে ফেলেন। সিজার তখন চিৎকার করে কিম্বারের উদ্দেশে বলেন, ‘কেন এই সন্ত্রাস?’ এ সময়ে বাকিরা সবাই তাদের ড্যাগার বের করে ফেলেন এবং সিজারের ওপর হামলে পড়েন। প্রথমেই সার্ভিলিয়াস কাসকা সিজারের বাম কাঁধে কলার-বোনের ওপরের দিকটায় ছুরি দিয়ে আঘাত করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তার এই আঘাত লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। সিজার দাঁড়িয়ে তা প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। হাত দিয়ে ছুরির আঘাত ঠেকাতে সচেষ্ট হন। কাসকা তখন চিৎকার করে নাম ধরে তার ভাইকে সাহায্যের জন্য ডাকেন। তার ভাই ডাক শুনে এসে তার তরবারি সিজারের পাঁজরে ঢুকিয়ে দেন। এক মুহূর্ত পর ক্যাসিয়াস সিজারের মুখ ছুরি দিয়ে বারবার আঘাত করতে থাকেন। এতে তার মুখ ফালি ফালি হয়ে কেটে যায়। ব্রুটাস সিজারের শরীরের এক পাশে ছুরি ঢুকিয়ে দেন। যখন ক্যাসিয়াস মার্কাস সিজারকে মুষ্টাঘাত দিতে চেষ্টা করেন, তখন তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মার্কাস ব্রুটাসের হাতে লাগে। মিনিউকাসও সিজারকে আঘাত করেন। সবাই মিলে যেন এক সিজারের বিরুদ্ধেই মল্লযুদ্ধ করছিল। এক সময় আঘাতের পর আঘাত পেয়ে তিনি পড়ে গেলেন পম্পেইয়ের মূর্তির পায়ের নিচে। মনে হচ্ছে, সবাই যেন চেয়েছিলেন এই খুনে অংশ নিতে। ফলে ষড়যন্ত্রকারীদের এমন কেউ বাকি ছিলেন না, যারা তাকে আঘাত করেননি। ছুরির ৩৫টি আঘাতের পর সিজার মারা যান।

ঘটনাস্থলে সিজারের মৃতদেহ পড়েছিল প্রায় ৩ ঘণ্টা। এরপর অন্য কর্মকর্তারা এসে তার লাশ সরিয়ে নেন। এই হত্যাকা-ের পর কী ঘটবে সে উপলব্ধি ছিল না হত্যাকারীদের মধ্যে। সিজারের মৃত্যুর ফলে রোম প্রজাতন্ত্রের দ্রুত অবসান ঘটার অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। রোমান মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের মধ্যে সিজার খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। সিনেটরদের একটি অভিজাত গোষ্ঠী সিজারকে হত্যা করায় তারা ক্ষুব্ধ হয়েছিল। সিনেটর এন্টনি রোমান জনগণের এই অসন্তোষকে ব্যবহার করে রোমে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হন। এদিকে সিজার তার ভাইপোর ছেলে গেইয়াস অক্টাভিয়ানকে একমাত্র উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে গিয়েছিলেন। উইলের মাধ্যমে সিজার তাকে সবকিছু দিয়ে রোমান প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে সম্পদশালী নাগরিক করে তুলেছিলেন।

সিজারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য তৈরি মঞ্চ, লাশ পোড়ানোর জন্য সংগৃহীত কাঠ বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে। ফলে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। জনতা ব্রুটাস ও ক্যাসিয়াসের বাড়িতেও হামলা চালায়। এ ঘটনা লিবারেটরদের গৃহযুদ্ধে স্ফুলিঙ্গ ছড়ায়।

ব্রুটাস ও ক্যাসিয়াসের প্রচুর সৈন্য ছিল গ্রিসে। তাদের দমাতে এন্টনির প্রয়োজন ছিল সৈন্য ও নগদ অর্থ। এরপর মার্ক এন্টনি মিত্রতা গড়ে তোলেন মিসরের রূপকথাতুল্য সম্পদের অধিকারী ক্লিওপেট্রার সঙ্গে। যিনি ছিলেন সিজারের প্রেমিকা। গৃহযুদ্ধ বাধলে এক পক্ষে থাকেন অক্টাভিয়ান এবং অপর পক্ষে থাকেন এন্টনি ও ক্লিওপেট্রা। শেষ এই যুদ্ধে এন্টনির পরাজয় হয়। এর ফলে অক্টাভিয়ান স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় আরোহণ করেন। তিনি হলেন রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট এবং তিনি তখন নাম ধারণ করেন সিজার অগাস্টাস। এই নাম ধারণের পর তার মর্যাদা দেবত্ব পর্যায়ে ওঠে।

ক্লিওপেট্রা আশা করেছিলেন, সিজার তার পুত্র টলেমি সিজারকে পিতৃপরিচয় দিয়ে নিজের উত্তরাধিকারী মনোনীত করবেন। কিন্তু সিজার তার প্রপৌত্র গ্যাইয়াস অক্টাভিয়ানকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেন। তবে স্ত্রী ক্যালপুর্নিয়া থাকা সত্ত্বেও ক্লিওপেট্রা ও তার পুত্রকে কিছুদিনের জন্য রোমে নিয়ে এসে তাদের আলাদা প্রাসাদে রাখেন সিজার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত