জিনের ভয় দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে ইমাম গ্রেপ্তার

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০১৯, ০২:০৫ এএম

জিনের ভয় দেখিয়ে একাধিক নারীকে ধর্ষণ ও অপকৌশলে ছেলেশিশুদের বলাৎকারের অভিযোগে রাজধানীর দক্ষিণখান এলাকা থেকে ইদ্রিস আহমেদ (৪২) নামের এক ইমামকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। ইদ্রিস ধর্ষণ বা বলাৎকারের দৃশ্য নিজের মোবাইলে ধারণ করে ভুক্তভোগীদের জিম্মি করে আবার ধর্ষণ করত বলে র‌্যাব জানিয়েছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মিডিয়া সেন্টারে ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম। তিনি জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গত রবিবার রাতে ইদ্রিসকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে দক্ষিণখানের একটি মসজিদে ইমামতি করে। তার বাড়ি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে। র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক বলেন, ‘এই ব্যক্তি (ইদ্রিস) এলাকায় এতটাই প্রভাবশালী যে, তাকে গ্রেপ্তার করে আনার সময় স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে তার কুকর্মের প্রমাণসহ তুলে ধরায় তারাও অবাক হয়েছেন। এমনকি কেউ কেউ চিৎকার করে কেঁদে বলেছেন, “কার পেছনে এত দিন নামাজ পড়েছিলাম আমরা!”’

র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক বলেন, মসজিদে নামাজ পড়ানোর পাশাপাশি একটি মাদ্রাসায়ও শিক্ষকতা করত ইদ্রিস আহমেদ। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সে এলাকায় প্রচার করতে থাকে যে, তার কাছে জিন বন্দি আছে। জিন দিয়ে রোগ সারানো হয়। এমন তথ্য প্রচার হওয়ার পর এলাকার নারীরা বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য তার কাছে যাতায়াত শুরু করেন। চিকিৎসার জন্য আসা বেশ কয়েকজন নারী ও কিশোরীকে জিনের ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করে ইদ্রিস। আর ধর্ষণের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করাত অন্য সহযোগীদের দিয়ে। পরে সেই সহযোগীকে দিয়েও ধর্ষণ করাত ইদ্রিস। এ কারণে যে ভিডিও করত, সে আর বাইরে কারও কাছে অভিযোগ করার সাহস পেত না।

সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, ঠিক কত নারীকে ধর্ষণ করেছে ইদ্রিস ও তার সহযোগীরা তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা না পেলেও চার-পাঁচজন নারীকে যে একাধিকবার ধর্ষণ করেছে, সেগুলোর ভিডিও ইদ্রিসের মোবাইলে পাওয়া গেছে। যদিও এসব নারী সামাজিক অবস্থান ও মান-সম্মানের ভয়ে কারও কাছে কোনো অভিযোগ করার সাহস পাননি। তিনি আরও বলেন, ইদ্রিস দক্ষিণখানের মসজিদসংলগ্ন মাদ্রাসায়ও শিক্ষকতা করত। মাদ্রাসায় পড়তে আসা ১০-১২ বছরের কমপক্ষে ১২ শিশুকে সে দফায় দফায় বলাৎকার করেছে। শুধু তা-ই নয়, ভিডিও ধারণ করে মাদ্রাসা ও মসজিদে থাকা খাদেমদেরও জিম্মি করে বলাৎকার করেছে। ইদ্রিসকে গ্রেপ্তারের পর ওই সব খাদেম অকপটে র‌্যাবকে বিষয়টি জানিয়েছেন। বলাৎকারের শিকার ছাত্রদের মধ্যে একজনকে পাঁচ বছর ধরে সে বলাৎকার করে আসছিল।

ইদ্রিসের কৌশল নিয়ে র‌্যাবের কর্মকর্তা বলেন, মসজিদের একটি বিশেষ কক্ষে ঘুমাত ইদ্রিস। তার সব অপকর্ম ওই কক্ষেই করত। আর সেই অপকর্মের ভিডিও তার বিশ্বস্ত খাদেমদের দিয়ে ধারণ করাতে বাধ্য করত। যেসব নারী একবার তার অপকর্মের শিকার হওয়ার পর আর তার কাছে যেতে চাইত না, তাদের সে জিন দিয়ে ক্ষতি করাবে বলে হুমকি দিয়ে আবার ধর্ষণ করত। যেসব শিশু বা শিক্ষার্থী তার নির্যাতনের পর আর পড়তে যেত না, তাদের অভিভাবকদের ইদ্রিস বলত, যদি তারা না যায়, তাহলে আর কখনো ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করতে পারবে না। জিন দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমন ভয় দেখানোর পর ওই সব শিশুকে ফের তার কাছে পড়তে পাঠানো হতো।

ইদ্রিসকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, এই ধর্ষক প্রতিটি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে। জিন নিয়ে সে যে প্রচারণা চালিয়েছে, তার সত্যতাও স্বীকার করেছে।

র‌্যাবের ভাষ্য, ইদ্রিস সিলেটের একটি মাদ্রাসায় পড়ার পর কোম্পানীগঞ্জের একটি মসজিদে ইমামতি ও মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করে। ২০০২ সালে ঢাকায় এসে দক্ষিণখানে একটি মসজিদের ইমাম নিযুক্ত হয়। ১৮ বছরের বেশি সময় ধরে ওই মসজিদে ইমামতি করে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করে তাকে দক্ষিণখান থানায় সোপর্দ করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত