দেশের ইস্পাত শিল্পে প্রথমবারের মতো বিশে^র সর্বাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে আগামী সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন ইস্পাত সামগ্রীর উৎপাদনে আসছে জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের বৃহত্তর নতুন একটি শিল্পকারখানা। সীতাকু-ের কুমিরায় ১৫০ একর জায়গায় স্থাপিত এই কারখানার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ১০ লাখ টন এবং এতে বিনিয়োগের পরিমাণ ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এছাড়া অত্যাধুনিক এই ইস্পাত কারখানায় দেশের সবচেয়ে বড় অক্সিজেন উৎপন্নকারী ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এতে দৈনিক ২২০ টন তরল অক্সিজেন উৎপন্ন হবে। কারখানার চাহিদা মিটিয়ে বাদবাকি উদ্বৃত্ত
এক-তৃতীয়াংশ অক্সিজেন স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হবে। কারখানাটি চালু হলে এতে সরাসরি সাড়ে ৩ হাজার লোকের এবং পরোক্ষে আরও ৫ হাজার মিলিয়ে সাড়ে ৮ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। সরকার বার্ষিক রাজস্ব পাবে ২৬০ কোটি টাকা।
জিপিএইচ ইস্পাতের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম গত রবিবার নতুন এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ইউনিট ঘুরে ঘুরে দেখানোর পর এসব তথ্য অবহিত করেন। নতুন এই কারখানায় উৎপাদিত ইস্পাত পণ্যের সর্বোচ্চ মান নিয়ন্ত্রণ করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের ইস্পাত কারখানাগুলোতে উৎপাদন ক্ষেত্রে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার হচ্ছে। কেবলমাত্র এ কে এস (আবুল খায়ের স্টিল) ইস্পাত সামগ্রী উৎপাদনে ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তবে জিপিএইচের নতুন এই ইস্পাত কারখানায় ইলেকট্রনিক আর্ক ফার্নেসের চেয়েও উন্নততর কোয়ান্টাম আর্ক ফার্নেস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা বিশে^ দ্বিতীয়, প্রথমটি হয়েছে মেক্সিকোতে।
এই প্রযুক্তির সুফল সম্পর্কে জিপিএইচ ইস্পাতের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম জানান, স্টিল উৎপাদনে কোয়ান্টাম প্রযুক্তিটি বিদ্যুৎসাশ্রয়ী এবং পরিবেশ দূষণকারী কার্বন নিঃসরণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনে। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কারখানায় উৎপাদন পর্যায়ে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, তাতে অন্তত ৪০ হাজার পরিবারকে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া যাবে। অন্যদিকে কারখানায় শতভাগ উৎপাদনকালে বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে কার্বন নিঃসরণ ১০ মিলিগ্রামের মধ্যে থাকবে।
জানা যায়, এই ইস্পাত কারখানায় প্রতিদিন বিদ্যুৎ ব্যবহার হবে ৮০ মেগাওয়াট। এজন্য কারখানার কম্পাউন্ডে ২৩০ কেভি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া ইস্পাত কারখানাটিতে উৎপাদন চলাকালে মেশিনারিজ শীতল রাখতে প্রতি ঘণ্টায় আড়াই লাখ লিটার পানি ব্যবহার হবে। এজন্য কারখানার বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডের পাশে ভূ-গর্ভে একটি অতিকায় পানি সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হয়েছে। এতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হবে। এই পানি উৎপাদন প্ল্যান্টগুলোতে রি-সাইক্লিং হয়ে পুনঃ পুনঃ ব্যবহার হবে। যার এক ফোঁটাও কারখানার বাইরে যাবে না এবং কোনো ধরনের দূষণের কারণ হবে না।
জিপিএইচ ইস্পাতের নতুন শিল্পকারখানার একই বাউন্ডারিতে চালু আছে বার্ষিক এক লাখ টন উৎপাদন ক্ষমতার আরেকটি ইস্পাত কারখানা। নতুন এই শিল্পকারখানা গড়ার পেছনে কী কারণ নিহিতÑ জানতে চাইলে চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশের অর্থনীতি ক্রমেই বড় হচ্ছে। তাতে সরকার অবকাঠামো উন্নয়নে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। অবকাঠামোর উন্নয়নে ইস্পাত, সিমেন্ট অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাতে এই দুই পণ্যের চাহিদা বিপুলভাবে বেড়ে চলেছে। আগামী ২৫ বছর ধরে এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আমাদের জরিপ বলছে। তবে অবকাঠামো বিনির্মাণে গুণগত পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। না হয় এসব অবকাঠামো একটা সময়ে ধসে পড়ে বিপর্যয় ঘটাতে পারে। আমরা তাই শতভাগ রিফাইন্ড (উৎকর্ষ) স্টিল উৎপাদনে এসেছি এবং এক্ষেত্রে পণ্যের গুণগত মান সুরক্ষা ও উৎপাদন ব্যয় হ্রাসে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করেছি।
এর আগে এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমূল বলেন, এই প্রকল্পে আমরা উন্নত পর্যায়ের সর্বশেষ প্রযুক্তি ও অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরির সরঞ্জাম ব্যবহার করেছি। এতে উৎপাদিত পণ্যের মান নিশ্চিত হবে। অপরদিকে জ¦ালানির ব্যবহার হ্রাস পেয়ে উৎপাদন খরচ কম হবে। এ কারণে ইস্পাত সামগ্রী আমদানি খাতে বৈদেশিক মুদ্রারও বড় সাশ্রয় হবে। উৎপাদিত হবে সর্বোচ্চ মানের স্টিল। চালু হতে যাওয়া নতুন এই ইস্পাত শিল্পকারখানা নিয়ে আলোচনাকালে আরও উপস্থিত ছিলেন জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের মিডিয়া অ্যাডভাইজার ওসমান গণি চৌধুরী, প্রকৌশলী আসিফ উল হক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বৃহৎ এই নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী ড. সাঈদ সুমন বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বলেন, স্টিল উৎপাদনে কোয়ান্টাম আর্ক ফার্নেস প্রযুক্তিটি বিশে^ দ্বিতীয় এবং বাংলাদেশে প্রথম। এই প্রযুক্তিতে স্ক্র্যাপ লোহার যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা সাফ হয়ে একই প্রক্রিয়ায় ফিনিশড গুডস (মানসম্মত পণ্য) উৎপাদন হবে। উৎপাদিত ইস্পাত সামগ্রীর মধ্যে থাকবে বিলেট ও রিবার ডায়াসহ অ্যাঙ্গেল, চ্যানেল ও যেকোনো গ্রেডের ইস্পাত পণ্য। আছে দেশের সবচেয়ে বড় অক্সিজেন উৎপাদনকারী প্ল্যান্ট।
