সারা দেশে গণপিটুনি ও ছেলেধরা আতঙ্ক

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৯, ১২:৪৭ এএম

শরীয়তপুর জেলা স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সজীব গত বৃহস্পতিবার স্কুলে যাচ্ছিল। হঠাৎ শুনতে পায় ‘ছেলেধরা ছেলেধরা, কল্লা কেটে নিয়ে যাবে’ এবং এই সময় বিভিন্ন বয়সী মানুষ স্কুলের মোড় থেকে সামনের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। পরিচিত একজন সজীবকে বলছে, তাড়াতাড়ি বাড়ি যা। সে ভয়ে স্কুলে না গিয়ে বাড়ি চলে যায়। সেই থেকে সজীবের পরিবার থেকে ওকে স্কুলে আনা-নেওয়া করা হচ্ছে। তারপরও ওই শিক্ষার্থীর ভয় কাটেনি। অল্প শব্দ হলেই সে ভয় পাচ্ছে। একা কোথাও খেলতে যায় না। এমনকি বাড়ির উঠোনে যেতেও ভয় পাচ্ছে।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে সজীবের মা এবং তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তার চাচা রাহাত পদ্মা সেতুর একটি প্রকল্পে মালামাল সরবরাহ করেন। পদ্মা সেতুতে কতগুলো মাথা লাগবে এবং কত সময়ের মধ্যে এই মাথা নেওয়ার কাজ শেষ হবেÑ তা সজীবের মা তার দেবরের কাছে জানতে চান। সজীবের মা বলেন, জেলা শহর এবং গ্রামেগঞ্জে

 নতুন নতুন ছেলেধরা নেমেছে। সবাই এখন তাদের ১৫-১৬ বছরের বাচ্চাকেও একা ছাড়ছেন না। পুরো এলাকায় সবাই ছেলেধরার আতঙ্কে রয়েছেন বলে এ প্রতিবেদককে জানান তিনি।

আমাদের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুতে ‘বাচ্চা ছেলেমেয়ের মাথা লাগবে’ এই গুজবে আতঙ্কিত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, গত এক সপ্তাহে গ্রামের স্কুলগুলোতে শিশুদের উপস্থিতি কমে গেছে। আবার ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির আতঙ্কও সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা বলেন, পথেঘাটে সব জায়গায় একই আলোচনা ছেলেধরা এবং গণপিটুনির আতঙ্ক।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিভিন্ন জেলা এবং উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে তাদের কাছে তথ্য এসেছে, গত এক সপ্তাহে গ্রাম এবং শহরের স্কুলগুলোতে উপস্থিতির হার কমছে। আর অভিভাবকরা প্রায়ই এসে ছেলেধরা গুজবের কথা বলছেন। মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। আর বেশিরভাগ স্কুলের সামনে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো গণপিটুনি বা ছেলেধরা সন্দেহে বাগ্বিত-া চলছে। ওই কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি আমলে নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। সব উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে স্কুল পরিদর্শন করে সচেতন করতে বলা হয়েছে।

এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষকদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। মাউশির এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ছেলেধরাবিষয়ক গুজবে দেশের বিভিন্ন স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও নিরীহ লোকজনকে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) ড. আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ধরনের ঘটনা রোধে সতর্ক থাকতে হবে। মাউশির নির্দেশনায় বলা হয়, ‘সতর্ক করা যাচ্ছে যে, কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থীদের কেন্দ্র করে যাতে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, তার জন্য সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে।’

এদিকে ছেলেধরার গুজবে সারা দেশে গত ১৫ দিনে গণপিটুনিতে নারী ও প্রতিবন্ধীসহ ছয়জনের বেশি নিরপরাধ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন তার অনেকগুণ বেশি মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্কুল চত্বর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টিরও আহ্বান জানানো হয়েছে। এর আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ছেলেধরা গুজবের বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক করে দিয়ে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। এ ধরনের গুজবের ঘটনায় সন্দেহভাজন কাউকে ধরে পুলিশের হাতে না দিয়ে পিটিয়ে হতাহত করা আইনের দৃষ্টিতে মারাত্মক অপরাধ উল্লেখ করে বিবৃতিতে এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

গত সোমবার পুলিশ সদর দপ্তরে বিষয়টি নিয়ে বৈঠক হয় এবং বৈঠক থেকে দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পাড়া, মহল্লাগুলোতে মাইকিং করে ও গণপিটুনির ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং শাস্তির আওতায় আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কাউকে সন্দেহ হলে আইন যেন কেউ নিজের হাতে তুলে না নেয় সেজন্য পুলিশ ৯৯৯ নাম্বারে সহযোগিতার জন্য পরামর্শ দিয়ে প্রচার চালায়। জানা গেছে, গত ৯ জুলাই থেকে পদ্মা সেতুতে মাথা লাগার গুজবটি ছড়িয়ে পড়ে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা সামাজিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। এটাকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে হবে। না হয় অনেকে নিজেদের স্বার্থে এই ছেলেধরা এবং গণপিটুনিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। তিনি বলেন, গণপিটুনির সঙ্গে আরও দুয়েকটি বিষয় জড়িত। এর অন্যতম হলো গুজব। আর এ গুজবের সঙ্গে যে বিষয়টি জড়িত, তা হচ্ছে মানুষের প্রাগৈতিহাসিক মনস্তত্ত্ব। এটি অনেকটা গণপিটুনির মনস্তত্ত্বের মতোই।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, একটা সমাজে যখন সামাজিক বাঁধনগুলো দুর্বল হয়ে যায় তখন দেখা যায়, মানুষ আর এ ধরনের ঘটনার যে মানবিক একটা দিক আছে, তারা যে অন্য একজন মানুষকে হত্যা করছে তা ভাবে না। কারণ ইতোমধ্যে বিভিন্নভাবে, আইনবহির্ভূতভাবে হত্যার এক ধরনের বৈধতা তৈরি হয়েছে। তবে উন্নতবিশ্বে মানুষকে এত সহজে গুজবে আকৃষ্ট হতে দেখা যায় না। বাংলাদেশের মানুষের মনস্তত্ত্বেব এখনো পূর্বসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস বিরাজমান। যে কারণে ঝাড়ফুঁক, পানিপড়াসহ অসংখ্য উদ্ভট মানসিকতা এখনো প্রচলিত।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারা এ ছেলেধরার গুজব ছড়াল এবং গণপিটুনির মতো বিষয়ে উসকানি দিচ্ছে তা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাড়া-মহল্লায় সতর্কবার্তা দিচ্ছে। তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর মতো বড় কাজ এবং দেশের উন্নয়ন যারা চায় না তারাই এ ধরনের ঘটনায় উসকানি দিচ্ছে। ইতোমধ্যে গণপিটুনির ঘটনায় বিভিন্ন স্থানে মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। ইন্ধনদাতাদেরও খুঁজে বের করা হবে। একটি মহল সারা দেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত