দেশে সাম্প্রতিক সময়ে গণপিটুনিতে যেভাবে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে তা এক ভয়াবহ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। ছেলেধরা গুজবে রাজধানী ঢাকার বাড্ডায় নির্মমভাবে তাসলিমা বেগম রেনুকে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনা একটি অসুস্থ ও বর্বর সংস্কৃতির পরিচায়ক। রেনু একজন সিঙ্গেল মাদার। তার স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে। যে দায়িত্বটা রেনুর শিশুসন্তান তোবার বাবার পালন করা উচিত ছিল, সে দায়িত্বটা পালন করছিলেন রেনু। ওই নারী মানসিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে নির্যাতনের শিকার। তার জীবনটা স্বাভাবিক নয়। এ রকম একটি লড়াকু মানসিকতার নারীকেই কিনা গণপিটুনিতে প্রাণ হারাতে হলো। এটা কীসের লক্ষণ? আমাদের সমাজ আজ যে অবস্থায় চলে গেছে, সেই সমাজের সভ্যতা ও সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এই দায়ভার রাষ্ট্র ও সমাজ এড়াতে পারবে না।
দুর্ঘটনায় অপমৃত্যু হলে তা মেনে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এভাবে পিটিয়ে মানুষকে হত্যা করা যায়? এখন কোনো প্রাণীকে হত্যা করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এমনকি সাপকেও পিটিয়ে মারা উচিত নয় বলে অনেকে মনে করছেন। কেননা, এখানে পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার ব্যাপারটি সংশ্লিষ্ট। সেখানে একজন জলজ্যান্ত মানুষকে হত্যা? না জেনে, না শুনে অহেতুক সন্দেহে এভাবে মানুষকে হত্যা করা যায়? এই ঘটনায় যারা জড়িত তাদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি প্রদান করতে হবে। শুধু যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এই হত্যাকান্ডের প্রকৃত শাস্তি হবে না। আমার মতে, তাদের মৃত্যদণ্ড দিতে হবে। আর এই বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। না হলে এরকম ঘটনা আরও ঘটতে থাকবে। শুধু তাই নয় রেনুর সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সে তার বাচ্চার খোরপোষ দিয়েছে কি না সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে।
বাংলাদেশে নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। নুসরাত থেকে মিন্নি, সবগুলো ঘটনায় আমরা দেখতে পাই নারীরা কীভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের লালসা এবং আধিপত্যের শিকার হচ্ছে। মিন্নিকে তো মনে হয়েছে সে পরিস্থিতির শিকার। শুধু মিন্নি একা নয়, রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে মফস্বল এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও নারীরা অহরহ এরকম পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। আর শারীরিক সৌন্দর্যের অধিকারী নারী হলে তো কথাই নেই। সে যদি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়, তাহলে অনেকেই তাকে এমনভাবে দেখবে যে ওই নারীর মনে হবে তাকে তারা নগ্নভাবে প্রত্যক্ষ করছে। এমনকি ওই নারীরা যদি কোনো নির্যাতনের প্রতিকার চাইতে থানায় হাজির হয়, তাহলে কর্তব্যরত অনেক পুলিশ কর্মকর্তাও তাকে ওই দৃষ্টিতেই দেখেন। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে নারী পুলিশ সদস্যরা তাদের সহকর্মী এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের লালসার শিকার হচ্ছেন। এই হচ্ছে দেশের নারীদের সার্বিক চিত্র। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে শুধু পুরুষ নয়, অনেক নারীও পুরুষের মতো প্রভুসুলভ আচরণ করে থাকে। এটা আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নারীদের আচরণের ক্ষেত্রে। গৃহকর্মী নির্যাতন এর জ¦লন্ত উদাহরণ।
আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে আমার কাছে মনে হয়েছে অনেকটা ‘ফুটবলের মতো’। ফুটবলকে যেমন একেকজন লাথি মেরে একেক জায়গায় ঠেলে দেয়, মিন্নির ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটছে। তাকে নিয়ে একেকজন একেকভাবে ইচ্ছামতো খেলছে। যে নয়ন বন্ডের কথা বলা হচ্ছে, সেও তো পরিস্থিতির শিকার। তাকে সামনে দিয়ে নেপথ্যে অনেকে খেলা করেছে। যেদিন নয়ন বন্ডকে বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারে হত্যা করা হলো, সেদিনই বোঝা গেছে গোটা ব্যাপারটাকে আড়াল করার জন্য এটা করা হয়েছে। মূল হোতাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখার জন্যই এটা করা হয়েছে। পুলিশের সম্পৃক্ততা যাতে ফাঁস না হয়ে যায়, সে জন্য তারা তাকে এভাবে হত্যা করেছে।
ক্রসফায়ার কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা সংঘটিত করা রাষ্ট্রে আইনের শাসনের অনুপস্থিতির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। আর পুলিশ মাদক পাচার রোধের নামে যেভাবে মানুষ হত্যা করছে তা বিচারহীনতার সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ। যারা ক্রসফায়ারের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটাচ্ছে তাদেরও বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। যারা মাদক পাচারের মূল হোতা তারা তো ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। তাদের নাগাল কেউই পাচ্ছে না। তারা লোকচক্ষুর আড়ালে বড় ধরনের অপরাধ অব্যাহত রাখছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসন তাদের পক্ষেই কাজ করছে। মাদকের একটি বড় অশুভ চক্র সবসময়েই তৎপর। আর মাদক যতদিন বন্ধ না হবে ততদিন সমাজে এ রকম অপরাধ ঘটতেই থাকবে। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করলেও সরকারের কথা ও কাজের মধ্যে বিস্তর ফাঁক থেকেই যাচ্ছে। বরগুনা বলুন বা টেকনাফই বলুন কিংবা কক্সবাজারকেই ধরুন না কেন, মাদকের অশুভ হাত সর্বত্র বিরাজ করছে। কক্সবাজার তো আন্তর্জাতিক মাদকপাচারের অন্যতম ট্রানজিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কক্সবাজারে যে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা অবস্থান করছে, তাদের নারীরা এই মাদক পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পাশাপাশি নারীদের দেহব্যবসার জন্যও পাচার করা হচ্ছে। মাদক এখন ভয়ংকর পর্যায়ের মুনাফালাভকারী ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
মাদক পাচারসহ অনেক অপরাধের জন্য আইন করা হলেও ট্রাইব্যুনাল করা হয়নি। মাদক পাচার, মানব পাচারের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা থাকলেও সেগুলো দৃশ্যমান নয়। এমনিতেই আদালতে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ বাড়তি বোঝা হিসেবে প্রতিপন্ন হচ্ছে, সেখানে এই অপরাধগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া কীভাবে শুরু করা যাবে? আর যথাযথ বিচার না পেলে তো মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলবে। বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর আস্থা হারাবে। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এখানে প্রত্যক্ষ হয়। যার ফলে জনগণ এই প্রক্রিয়ায় আস্থা পোষণ করেন না। কথায় আছে,‘বিলম্ব বিচার মানেই বিচারের নামে প্রহসন।’ এই ধরনের পরিস্থিতিতে হতাশা ব্যক্ত করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। একজন বাংলাদেশি হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে এই দায় আমার ওপরও বর্তায়। মাদকের উৎসমূল যদি নির্মূল করার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়, তাহলে গোটা রাষ্ট্রেই অনেক ওলট-পালট হয়ে যাবে। একদম ওপরের তলার অনেকের পায়ের তলায় মাটি সরে যাবে। গণপিটুনির ঘটনা সমাজের এক গভীর ক্ষত হিসেবেই বিবেচিত হয়, এটা সামগ্রিক অবক্ষয়ের নির্দেশক। এই কয়দিনে গুজবের কথায় কতজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। এরকম একেকটি গুজব ছড়াবে আর তার শিকার হবে কয়েকজন নিরপরাধ মানুষ। এ পরিস্থিতি সভ্য সমাজের পরিচায়ক নয়। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনেক সদিচ্ছা রয়েছে; তিনি নিঃসন্দেহে একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ। তিনি এগুলোর পরিসমাপ্তি নিশ্চয়ই প্রত্যাশা করেন। কিন্তু তিনি তো একা এত বড় কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন না। আমাদের দেশটা ছোট হতে পারে, কিন্তু জনসংখ্যা অনেক, সমস্যাও অনেক। একা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তো এত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
এখানে আরেকটা বিষয় এসে যায়। সেটা হলো গণতন্ত্রের প্রশ্ন। গণতন্ত্র টেকসই না হলে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। জবাবদিহিতার অভাবেই এসব ঘটনা বারবার ঘটতে থাকে। সে জন্য নারীবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠে না। এখানে নারীরা যখন যৌন হয়রানির শিকার হয়, তখন তারা এটাকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। এমনকি উত্ত্যক্ত করলেও নারীরা নীরব থেকে বিষয়টিকে এড়ানোর চেষ্টা করেন। এমনকি এ রকম সময়ে যে পরিবার তার পাশে সম্পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার কথা, সেই পরিবারও তাকে জেরার মধ্যে ফেলে। পরিবার তাকে বাল্যবিবাহের মতো ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। মিন্নির ক্ষেত্রেও এরকম অনেক বিরূপ পরিস্থিতি কাজ করেছে। মিন্নি যদি অপরাধী হয়েও থাকে, তাহলে কারা তাকে অপরাধী করে তুলেছে, কারা তাকে এই পথে নামতে বাধ্য করেছে, সেটাও খুঁজে বের করা দরকার।
অবশ্য এক্ষেত্রে নুসরাত একটা উদাহরণ তৈরি করে গিয়েছে। তার পরিবারও একটা উদাহরণ। নুসরাত আমাদের শিখিয়ে গেছে, কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। নুসরাত সাহসিকতার জ্বলন্ত উদাহরণ। তার মতো মেয়েদের আজ বড় দরকার। আমার তো মনে হয় নুসরাতের একটা ভাস্কর্য নির্মাণ করা দরকার। আমি যদি সুযোগ পেতাম, তাহলে নুসরাতের নামে একটা ‘অ্যাওয়ার্ড’ বা ‘সম্মাননা’ চালু করতাম। যেসব নারী নুসরাতের মতো সাহসিকতা দেখাবে, তাদের স্মরণে একটা সম্মাননা দেওয়া হবে। ওর প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রশাসন পর্যন্ত যেসব অন্যায় করা হয়েছে তার সবটুকু বর্ণনা করে গেছে নুসরাত। তার সমস্ত দেহ পোড়ানো হয়েছিল, কিন্তু সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমায় মুখটাকে পোড়াতে পারেনি। সুতরাং, তার কণ্ঠটাকে স্তব্ধ করা যায়নি। সেই কণ্ঠ দিয়ে সে বলে গেছে তার ওপর কী ধরনের অন্যায় হয়েছে। এরকম অন্যায় বাংলাদেশে অনেক নারীর ওপরই সংঘটিত হয়, কিন্তু সেগুলো জানা যায় না। কিন্তু নুসরাত সাহসিকতার সঙ্গে দেশবাসীকে এই অন্যায় জানিয়ে গেছে। তার শিক্ষা আমাদের চিরপাথেয় হয়ে থাকবে।
দেশে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা অনেক। আলিয়া মাদ্রাসাও রয়েছে বেশ কয়েকটি। এখন মেয়েদের জন্য মাদ্রাসাও করা হয়েছে। কিন্তু এসব মেয়েদের মাদ্রাসায় অনেক পুরুষ শিক্ষক যে নির্যাতন ওই শিশু ও কিশোরীদের ওপর চালায় তা বর্ণনাতীত। এই কয়েকদিনে এরকম বেশ কয়েকটি ঘটনা আমাদের সামনে প্রকাশিত হয়েছে। এই সব মাদ্রাসাতে কোনো ধরনের যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে বলতে পারি, এরা প্রকৃত অর্থে কোনো ধর্মীয় রীতি বা জীবনাচার অনুসরণ করে না। ধর্মের সঙ্গে এদের কোনো সংযোগ নেই। ধর্ষণ বা নারী নিপীড়নের ঘটনাকে একটি দুর্ঘটনা হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। দুর্ঘটনা ঘটলে যেমন ওষুধ খেলে ও মলম ব্যবহার করলে তা থেকে নিরাময় হওয়া যায়, তেমনি ধর্ষণকেও সেভাবে বিবেচনা করতে হবে। না হলে, এর ভয়াবহতা নিয়ে কেউ যদি ট্রমাগ্রস্ত থাকে এবং নীরব থেকে কাউকে কিছু না জানতে দেয়, তাহলে তো অপরাধীরা পার পেয়ে আরও বাড়বাড়ন্ত অবস্থান প্রদর্শন করবে। পরিবারকেও এক্ষেত্রে সহযোগী হয়ে ভিকটিমের সর্বাত্মক সমর্থনে এগিয়ে আসতে হবে।
উচ্চ আদালত সম্প্রতি নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে নির্দেশনা দিয়েছে। এই নির্দেশনা কোনো নতুন আইন প্রবর্তন করেনি। যে আইন আছে তার যথার্থ প্রয়োগের জন্যই এটা দেওয়া হয়েছে। নারীরা যেন তাদের প্রতি সংঘটিত সহিংসতার প্রকৃত বিচার পায় সেই ব্যবস্থা সর্বাগ্রে করতে হবে। থানায় কিংবা পুলিশের হেফাজতে ভিকটিমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সাক্ষীদেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নারীবান্ধব প্রসিকিউটর নিয়োগ দিতে হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের এই বিষয়ক কমিটিকে তৎপর হয়ে উচ্চ আদালতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে এগোতে হবে। তাই এই মন্ত্রণালয়কে ভূমিকা গ্রহণ করতে হলে একে ঢেলে সাজাতে হবে। আমাদের এখন শুধু জিরো টলারেন্স দেখালেই চলবে না, আরও বড় পদক্ষেপের দিকে অগ্রসর হতে হবে। কেননা আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আর তা করতে পারলেই দেশে নারীবান্ধব পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখক
মানবাধিকার আইনজীবী
