প্রথমেই বলা নেওয়া ভালো, একেবারে আইন করে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো শিক্ষকই রাজনীতি করার অধিকার রাখেন এবং এটি একান্তই ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার। রাজনীতি করা শিক্ষক মানেই অযোগ্য, নীতিহীন বা ফাঁকিবাজ নন! অনেক মেধাবী শিক্ষক রাজনীতিতে এসে জীবনের অর্জন ও লক্ষ্য স্থির করেছেন ভিন্নমাত্রায়; পৌঁছাতে চেয়েছেন ক্ষমতার শিখরে, পড়াশোনা ছেড়েছেন এবং শিক্ষকতার জায়গাটিই করেছেন সংকুচিত! আবার এমন অনেক শিক্ষক রয়েছেন যারা রাজনীতিও করছেন, দেশ-বিদেশে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, গবেষণা করেছেন এবং শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান ও করছেন। বিসর্জন দেননি নিজেদের স্বপ্ন বা পেশাগত প্রতিশ্রুতি। অনেকেই রাজনীতিতে এসে গতানুগতিক পরিবেশ এবং কাজের ধরনেও এনেছেন ইতিবাচক পরিবর্তন। নীতির চর্চা করেছেন এবং মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। কিন্তু ব্যক্তিগত অর্জনই একজন শিক্ষকের পেশাগত সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। কেননা শিক্ষকতা একটি সামাজিক পেশা এবং মনে করা হয়, শিক্ষকরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হয়ে উঠবেন। প্রত্যেক শিক্ষক নিজের জীবনাচরণ, সততা ও আদর্শের অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস এবং মতামতকে প্রভাবিত করতে সক্ষম; ‘টিচার্স অন্টোলজি’ বা ‘শিক্ষক তত্ত্ববিদ্যা’ অন্তত তাই বলে। প্রত্যেক নাগরিকের মতোই শিক্ষকেরও কোনো মতাদর্শ সমর্থনের অধিকার আছে। ফলে শিক্ষককে নিরপেক্ষ হতে হবে এমন কথা নেই। কিন্তু অনেক সময় একটি দলের পক্ষ নিতে গিয়ে ‘মিথ্যে না বললেও কখনো কখনো সবটুকু সত্যি না বলার যে কৌশল’ অনেকে অবলম্বন করেন, তাতেই একজন শিক্ষকের সামাজিক অবস্থান বা ব্যক্তিত্বের যে ক্ষতি হয়, তা অপূরণীয়। খোদ শিক্ষাঙ্গনেই বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে-বিপক্ষে কাজ করা বা কথা বলা শিক্ষকতার সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিকই শুধু নয়, ব্যক্তিগত দুর্বলতা প্রকাশের শামিল!
সত্যিকার রাজনৈতিক আদর্শের চর্চা হতেই পারে। শুরুর দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি অনেকটা তাই-ই ছিল। মূলধারার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনের রাজনীতিরও আমূল পরিবর্তন এসেছে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতার হাত ধরে শিক্ষক রাজনীতিও এখন শুধুই ব্যক্তিগত অর্জন এবং প্রশাসনিক পদ বা ক্ষমতা লাভের কলাকৌশলেই সীমাবদ্ধ। প্রতিনিয়ত প্রকাশ্যে ব্যক্তিস্বার্থ আর আনুগত্য প্রদর্শন করে কি নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া যায়? অধুনা যে শিক্ষক রাজনীতি আমরা দেখছি, তা বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ ও কর্মপরিবেশে নানা বৈষম্য তৈরি করছে। শিক্ষকদের এমন রাজনীতির প্রভাব সবার আগে পড়ে সহকর্মীদের ওপর; হঠাৎ করে কোনো একজন শিক্ষক রাজনীতিতে যোগ দিয়েই যোগ্যতার মাপকাঠি এড়িয়ে রাতারাতি অন্যান্য সিনিয়র-জুনিয়র শিক্ষকের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে যান। সহসাই শিক্ষা ও প্রশাসন সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য এবং কাজের সুযোগপ্রাপ্তিতে এগিয়ে যান অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ বা যোগ্য শিক্ষকদের চেয়ে। একই সঙ্গে ন্যায্য-অন্যায্যভাবে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নেওয়াও অনেক সহজ হয়ে যায় দলীয় রাজনীতি করা শিক্ষকের জন্য। যার গল্প বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রায়ই শুনি। এতে যে অন্যদের অধিকার ক্ষুণœ হয় বা নিয়ম ভঙ্গ করে অন্যদের বঞ্চিত করা হয়, সেটা কি তারা ভাবেন?
রাজনৈতিক বিবেচনায় বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা নিজেদের অযোগ্যতা ছাপিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা বা যেকোনো কিছু ‘ম্যানেজ’ করে ফেলার আত্মবিশ্বাস এবং সাধারণের ‘নিশ্চিত সমীহ’ পাওয়ার সংস্কৃতিই কর্মক্ষেত্রে ভয়ংকর এক বৈষম্য তৈরি করে। দলীয় রাজনীতি করা শিক্ষকরা এসব উপভোগ করেন। এটি মূলত কাজের পরিবেশ ও সমতা নষ্ট করে এবং অন্যরাও একই রীতি অনুসরণে উদ্বুদ্ধ হয়! কেউ কেউ প্রতিবাদী বা বিদ্রোহীও হন এবং এতে করে সামগ্রিক নিয়মকানুন মেনে চলাটাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সেই সঙ্গে ভিন্নমতাবলম্বী বা ভিন্ন আদর্শের সহকর্মীদের বঞ্চিত করা, হেনস্তা করা বা বিপদে ফেলার মতো বিষয়ও প্রায়ই প্রতীয়মান। যদিও শিক্ষক রাজনীতিতে ক্ষমতার মেরুকরণ খুবই মজার; রাজনীতি করা শিক্ষকরা যে দলেরই হননি কেন, কেন্দ্রীয়ভাবে নিজেদের মধ্যে বেশ লিয়াজোঁ রাখেন এবং বিরোধী শিবিরে থাকলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে অন্তত অ-রাজনীতিবিদ শিক্ষকদের চেয়ে এগিয়ে থাকেন! শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি শুধু সহকর্মী শিক্ষকদের ওপরই প্রভাব ফেল তা নয়, ছাত্রছাত্রীদের ওপর শিক্ষক রাজনীতির প্রভাব এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণিকক্ষে আচার-আচরণ সম্পর্কিত বৈষম্য এবং পরীক্ষায় মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নিয়ম ভঙ্গ ও পক্ষপাতিত্বের বাইরেও আরও কিছু সমস্যা এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয়। অনেক ক্ষেত্রেই ছাত্রছাত্রীরাও থিসিস বা রিসার্চের কাজ করার জন্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার চেয়েও তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ও পরে বিভিন্ন নিয়োগ বোর্ডে সুবিধা দিতে পারার যোগ্যতা এবং সম্ভাবনাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ২০০২ সালের ২৩ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে পুলিশি নির্যাতনের ঘটনা খুবই আলোচিত হয়েছিল এবং এর প্রতিবাদে তীব্র ছাত্র-আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছিল। ওই ঘটনায় হলের প্রভোস্ট যে সাধারণ ছাত্রীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহার করেছেন, সেটি হয়তো তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বড় কোনো অর্জন ছিল কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ওপর ভরসা করে ছেলেমেয়েদের হলে পাঠানো অভিভাবকরা কি পেরেছেন সেই শিক্ষককে ক্ষমা করতে? ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক অতি-উৎসাহী শিক্ষকরা অনেক সময় নিজেদের মধ্যে স্বার্থের প্রতিযোগিতায় বোধ-বুদ্ধি হারিয়ে উল্টো সরকারকেই বিপদে ফেলেন। বিএনপি আমলে শামসুন্নাহার হলে পুলিশি নির্যাতনের ঘটনা কিংবা বর্তমান আওয়ামী লীগ আমলের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মৈত্রী হলের ঘটনায় সরকার সমর্থক শিক্ষকদের ব্যর্থতা অন্তত তাই প্রমাণ করে।
উপাচার্য হওয়ার প্রতিযোগিতা এবং সরকারের বিভিন্ন কর্তাব্যক্তিদের কাছে দৌড়-ঝাঁপের সংস্কৃতি; এর কোনোটিই কি শিক্ষক সমাজের জন্য সম্মানজনক না শিক্ষার্থীদের জন্য কল্যাণকর? বর্তমান সময়ে রাজনীতির চর্চা করা শিক্ষকরা কি পেরেছেন সব শিক্ষার্থীকে সব সময় সর্বোচ্চ সহায়তা দিতে বা নিজেদের চেয়েও বড় শিক্ষক-গবেষক হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখাতে, অনুপ্রেরণা দিতে? বিভিন্ন শিক্ষক ফোরামের নেতারা কি পেরেছেন দলীয় বা ব্যক্তিস্বার্থের বাইরে গিয়ে শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া পূরণ করতে বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেলসহ ন্যায্য সুবিধাগুলো আদায় করতে? দু-একজন ব্যতিক্রম বাদে গত কয়েক দশকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যদের প্রায় সবাইকেই শেষমেশ দুর্নীতিসহ বিভিন্ন কারণে অব্যাহতির দিতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তি বা ফোরামের নেতারা তাই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো বিশেষ শর্তপূরণ সাপেক্ষে কর্র্তৃপক্ষ ও শিক্ষক সমাজ কর্র্তৃক নির্বাচিত হওয়াই শ্রেয়। অবশ্যই শিক্ষাঙ্গনের বাইরে মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে শিক্ষকরা জড়িত থাকতে পারেন, কিন্তু তার প্রভাব যেন শিক্ষাক্ষেত্রে না পড়ে সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
