গণপিটুনিতে হত্যার উল্লাস রুখবে কে

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৯, ১০:৫৯ পিএম

‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’। কামিনী রায়ের এই কবিতা কি এখন শুধুই কিতাবের কথা। আমরা যে শুনে বড় হয়েছি, বাংলাদেশের মানুষ মানবিক! এখানে সবাই সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ! এমন গালভরা গল্পের দিন কি তবে শেষ? যে দেশে একেবারেই অপরিচিত একজন মানুষ, যার সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত রাগ, ক্ষোভ, চাওয়া-পাওয়া, শত্রুতাÑ কিছু নেই, তাকেও দল বেঁধে উল্লাস করতে করতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, সে দেশকে কী করে একটি সভ্য মানবিক রাষ্ট্র বলা যায়! ঢাকার বাড্ডায় মেয়েকে স্কুলে ভর্তির খোঁজ নিতে আসা তাসলিমা বেগম রেনুই হোক আর সিদ্ধিরগঞ্জের বাক্প্রতিবন্ধী সিরাজ কিংবা সারা দেশে গত সাড়ে ছয় মাসে যে ৪৩ জন মানুষকে নানাভাবে গণপিটুনিতে হত্যা করা হলো এর কোনোটি দেখেই কি আর দাবি করার সুযোগ আছে, এ দেশ একটি মানবিক রাষ্ট্র, সভ্য রাষ্ট্র! এই দেশ মানবিক দেশ! আমরা মানবিক মানুষ! এখানে সুযোগ পেলে আমরা অনেকেই অমানবিক, দানব হয়ে উঠি। এ দেশে ক্রসফায়ারের নামে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়; অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা হত্যা করে নিরস্ত্রকে। আর এখন দেখা যাচ্ছে, সেই নিরস্ত্র সাধারণ মানুষও হত্যা করে আরও সাধারণ, নিরীহ কাউকে।

বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি এই দেশে লগি-বইঠা দিয়ে প্রকাশ্যে উল্লাস করে সাপের মতো পিটিয়ে মানুষ মেরে পার পাওয়া যায়; বাসে-ট্রাকে পেট্রল বোমা মেরে পুড়িয়ে মানুষ মেরে পার পাওয়া যায়। প্রকাশ্য দিবালোকে চাপাতি দিয়ে কোপাতে কোপাতে মানুষ মেরেও পার পাওয়া যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হত্যাকারীর বিচার হয় না, এসব নিয়ে টুকটাক কিছু নাগরিক প্রতিবাদ হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। এই প্রতিবাদহীন স্বেচ্ছাচারের দেশ কেমনে মানবিক রাষ্ট্র হবে!

এই যে এক দিনে শুধু গুজবে কান দিয়ে অন্তত তিনজন মানুষকে দল বেঁধে উল্লাস করে পেটাতে পেটাতে হত্যা করল, তারাও তো কারও সন্তান। চার দিনেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সাতজনকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। দেশের শীর্ষ মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে এ বছরের প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে অন্তত ৩৬ জন মানুষ গণপিটুনিতে মারা গেছে। জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে এসে চার দিনে সাতজন মিলিয়ে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ৪৩!

এই যে রেনু নামের যে মেয়েটিকে শুধুই সন্দেহের বশে পেটাতে পেটাতে মেরেই ফেলা হলো, সেও তো কারও সন্তান, সেও কারও বোন, কারও মা। তার জন্য ওই ঘাতকদের কারও মায়া হয়নি। ওখানে কি একজনও মানুষ ছিল না? কেউ কাছে এসে ঘাতকদের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে বলতে পারল না, তোমরা থামো। কেউ আহত মেয়েটির কাছে গিয়ে বলতে পারল না, মা তোর কষ্ট হচ্ছে! বেদম প্রহারে রক্তাক্ত ওই অবসন্ন নিথর অবয়ব কাউকে ব্যথিত করেনি! কেউ ছিল না যে জিজ্ঞেস করতে পারে, বোন একটু পানি খাবে! রেনু বা সিরাজদের জন্য মায়া দেখাতে যে মানুষ হতে হয়! সে মানুষ কই এই সমাজে! তাসলিমা ওই স্কুলের সামনে হয়তো অপরিচিত। তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলল। যারা তাকে হত্যা করল তারাও তো আরেক জায়গায় গিয়ে অপরিচিতই। সেখানে তাদেরও যদি এভাবে সন্দেহের বশে অন্য কেউ পিটিয়ে মারে! ভাবা যায় একজন নিরস্ত্র মানুষকে অনেকগুলো মানুষ পিটিয়ে যাচ্ছে মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত! একবার নিজেকে ওই আক্রান্ত মানুষটির জায়গায় ভাবুন তো! কিন্তু আমরা কেন এমন অসভ্য, অমানবিক ও নৃশংস হয়ে উঠছি? কেন মানুষ আইন তার নিজের হাতে তুলে নেয় এই দেশে? এর দায় কার? অনেকেই বলছেন, হতাশা, ক্ষোভ ও আস্থাহীনতার সমন্বিত বহিঃপ্রকাশ হলো গণপিটুনি দিয়ে মানুষ হত্যার মতো নৃশংস পৈশাচিকতা। তারা দেখছে, রাষ্ট্রীয় সংস্থা দীর্ঘমেয়াদি বিচারের অপেক্ষায় না থেকে তাৎক্ষণিক বিচারের নামে ক্রসফায়ারে দিচ্ছে ‘অপরাধীকে’। জনগণ কেন তবে আস্থাহীন দীর্ঘমেয়াদি বিচারের অপেক্ষায় থাকবে! তার সঙ্গে আছে মিথ নিয়ে কুসংস্কার; যার ফলে গুজবে বিশ্বাস করানো এতটাই সহজ।

আজকে যে গুজবের কারণে ছেলেধরা আতঙ্ক ও গণপিটুনি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, তাও আজ নতুন নয়। বাংলাদেশে অতীতেও বড় কোনো স্থাপনা, পুকুর, দিঘি, সেতু করার সময় শিশুর মাথা বা মানুষ বলি দিতে হবে বলে বহুবার গুজব উঠেছে এবং তাকে কেন্দ্র করে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এখন থেকে ২২ বছর আগে আজকের মতোই শুরু হয়েছিল গণপিটুনিতে হত্যার তাণ্ডব। তার পেছনেও ছিল ছেলেধরার গুজব। ১৯৯৭ সাল। যমুনা সেতুর উদ্বোধন হবে। গুজব ছড়িয়ে পড়ল, ৩০০ শিশুর মাথা না হলে যমুনা সেতু চালু করতে পারবে না। তখন ফেইসবুক, ইউটিউব, টুইটার ছিল না। তবুও গুজব ছড়িয়ে পড়ে বাতাসের আগে। শিশুর মাথা সংগ্রহে ছেলেধরারা মাঠে নেমেছে বলে চাউর হয়ে গেল। জুন মাসেই টাঙ্গাইলের করটিয়া, ঢাকার উত্তর বাড্ডা, সুইপার কলোনি, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ সারা দেশে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে মারা হলো অনেককে। কতজন সেই সুযোগে শত্রুতার শোধ নিল। ঝরে গেল কত প্রাণ। ১৬ জুন টাঙ্গাইলের করটিয়ায় যে দুজনকে ছেলেধরা সন্দেহে হত্যা করা হলো, জানা গেল তারা বিদেশ যাওয়ার জন্য এক আদম ব্যবসায়ীকে টাকা দিয়েছিল। তাদের বিদেশ তো নেয়ইনি, উল্টো ছেলেধরা অপবাদ দিয়ে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। সে বছর ১৬ জুন গাজীপুরে দুজন, ২৫ জুন উত্তর বাড্ডায় তিনজনকে হত্যা করা হয় একই সন্দেহে। বাড্ডার তিনজনের দুজনকে আবার পুড়িয়ে ফেলা হয়। সাভারে একজন এমবিবিএস চিকিৎসক ও একজন শিশুও শিকার হয়েছিল গণপিটুনির।

সে সময় কাজ করি ভোরের কাগজে। আমি ও মুজাহিদুল ইসলাম আকাশ অ্যাসাইনমেন্ট নিই সে গুজব ও নৃশংসতার বিষয় নিয়ে কাজ করার। কয়েক দিন খোঁজখবর নিয়ে আমরা তৈরি করি ‘ধোলাই তাণ্ডবে ছেলেধরা’ উপাখ্যান। লিড স্টোরি হিসেবে ছাপা হয়েছিল ‘মেলা’ পাতায়। লেখা পড়ে ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলেন মেলা সম্পাদক গায়ক সঞ্জীব চৌধুরী। কয়েক দিন ধরে আমরা আক্ষেপ করেছি মানুষের পশুত্ব ও হিংস্রতা নিয়ে। ২২ বছর পর আবার একই ধরনের গুজব। তাণ্ডব। নৃশংসতা। হত্যা। আরও ভয়াবহ। ২২ বছর পর আবার লিখতে হচ্ছে একই রকম কষ্ট নিয়ে। আমরা তো মানুষ হতে পারলাম না! এই ২২ বছর কি গণপিটুনিতে হত্যা বন্ধ ছিল? না, তা ছিল না। এখন তা একটা গুজবের কারণে ব্যাপকতা পেয়েছে বলে আবার একটু হইচই হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের হিসাবে ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ১০ বছরে গণপিটুনিতে হত্যার শিকার মানুষের সংখ্যা ১ হাজার ১১৫ জন। এ বছর প্রথম ছয় মাসেই এমন নৃশংসতায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৩৬ জন। আর আহত অগণিত। এত গণপিটুনির ঘাতকদের কেন ধরা হয়নি?

যদি ওইসব হত্যার বিচার হতো, যদি হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনা হতো, তাহলে এমন একটা নৃশংস হত্যার উৎসব বছরের পর বছর এভাবে চলতে পারত না। গণপিটুনিতে যাকে মারা হয় সে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হত্যাকারীদের অচেনা। তার সঙ্গে কোনো শত্রুতা নেই। কোনো দেনা-পাওনা নেই। কেউ মবটা তৈরি কয়ে দেয় শুধু। ব্যস। অন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের হয়তো তখন আর হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। নিজের কন্ট্রোল নিজের হাতে থাকে না। পাশবিক উল্লাসে শামিল হয় হত্যার উৎসবে। কিন্তু সে যদি জানত, তারা যদি দেখত, গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করেও পার পাওয়া যায় না। শাস্তি পেতেই হয়। তাহলে হয়তো কমে আসত এই পৈশাচিকতা। অনেকের হয়তো মনে থাকবে, আট বছর আগে ২০১১ সালের জুলাই মাসে ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশি গ্রামে ‘ডাকাত সন্দেহে’ গণপিটুনিতে ছয় ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছিল। ওই ঘটনা নিয়ে তখন সারা দেশে তুমুল আলোচনা হয়েছিল। তার কি বিচার হয়েছে? সংবাদমাধ্যমে এসেছে, সে ঘটনায় আসামি ৬০ জনের সবাই জামিনে আছে। এমন নৃশংস পৈশাচিক হত্যাকারীরা জামিনে থাকে কী করে! ২০১১ সালের ২৭ জুলাই নোয়াখালীতে নিরীহ কিশোর মিলনকে চোর বানিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল পুলিশের সামনেই। তখন সে হত্যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। তার কি বিচার হয়েছে? এই যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, এই যে ঘাতকদের আইনের আওতায় না আনার প্রবণতাÑ এসব কি গণপিটুনিতে হত্যার ধারা অব্যাহত রাখতে কোনো ভূমিকা রাখছে না? তার সঙ্গে আছে আস্থাহীনতা। পুলিশের ওপর আস্থাহীনতা, বিচারের প্রতি আস্থাহীনতা এ দেশে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। মানুষের মনে বিভিন্ন বিষয়ে হতাশা বাড়ছে, ক্ষোভ বাড়ছে। বিচারহীনতার সুযোগে মানুষের হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশের পথ হিসেবে তারা বেছে নিচ্ছে গণপিটুনিতে হত্যার মতো অমানবিক নৃশংস পথ।

সেতু স্থাপনের জন্য, দীঘি খননের জন্য, বড় পুকুর খননের জন্য মানুষের প্রাণ বা মাথা প্রয়োজন এরকম গুজবের সংস্কৃতি দেশে অনেক আগে থেকেই চালু আছে। এ গুজবগুলো মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা পায়। অনেক উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেটধারীদেরও দেখা যায় এসব মিথে বিশ্বাস করতে। কিন্তু এসব গুজব যাতে ছড়াতে না পারে সে দায়িত্বটাও কি আমাদের প্রশাসন, মিডিয়া, রাজনীতিবিদরা, আমরা যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছি?

লেখক

চিকিৎসক ও কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত