সত্য নাদেলা : যার কাছে পৃথিবীটাই কম্পিউটার

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৯, ১১:১৮ পিএম

মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলার মতে, পুরো পৃথিবীটাই একটি কম্পিউটার। ৫২ বছরের জীবনের ২৭টি বছরই তিনি উৎসর্গ করেছেন প্রিয় প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটে। সাধারণ কর্মী থেকে বর্তমানে বিশ্বখ্যাত এই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদে অবস্থান করছেন তিনি। একজন ভারতীয় হিসেবে এমন উচ্চতায় পৌঁছাতে তাকে বহু পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। সত্য নাদেলার সাফল্যযাত্রা নিয়ে লিখেছেন আন্দালিব আয়ান

ভারত থেকে আমেরিকা

পুরো নাম সত্যনারায়ণ নাদেলা। ১৯৬৭ সালের ১৯ আগস্ট ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের হায়দ্রাবাদে এক তেলুগু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম। বাবা বুক্কাপুরাম নাদেলা ছিলেন সরকারি প্রশাসনিক কর্মকর্তা। পড়াশোনা করেছেন হায়দ্রাবাদ পাবলিক স্কুলে। সে সময় ক্রিকেটের ভীষণ ভক্ত ছিলেন তিনি। খেলতেন স্কুল ক্রিকেটেও। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ১৯৮৪ সালে নাদেলা ভর্তি হন ম্যাঙ্গালোর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কর্নাটক তথা দক্ষিণ ভারতের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিদ্যাপীঠ মনিপাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে। ১৯৮৮ সালে তড়িৎ কৌশলের ওপর স্নাতক সম্পন্ন হওয়ার পর উচ্চশিক্ষার্থে আমেরিকায় পড়ার সুযোগ পান তিনি। সেই বছরই যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-মিলওয়াকি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানের ওপর পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯৯০ সালে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

আমেরিকা যাওয়ার পর থেকেই করপোরেট জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখতেন নাদেলা। কিন্তু এই জগতে টিকে থাকতে প্রকৌশল বিদ্যার সঙ্গে ব্যবসার জ্ঞানটাও জরুরি। তাই শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিখ্যাত বুথ স্কুল অব বিজনেস থেকে এমবিএ শেষ করে চাকরিযুদ্ধের জন্য নিজেকে ভালো করেই প্রস্তুত করে নেন তিনি।

চাকরি জীবনের শুরুর দিক

নাদেলার প্রথম কর্মস্থল হয় বিখ্যাত সান-মাইক্রোসিস্টেম। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই মাইক্রোসফট থেকে আসে বহুল কাক্সিক্ষত ডাক। ১৯৯২ সালে সিলিকন ভ্যালিতে অবস্থিত মাইক্রোসফটে একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে যোগ দেন তিনি এবং উইন্ডোজ এনটি’র উন্নয়ন নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। কাজের শুরু থেকেই তিনি দুর্দান্ত কর্মদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছিলেন। কর্মক্ষেত্রের এই সফলতা তাকে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে নিয়ে যায়। ১৯৯৯ সালে তিনি মাইক্রোসফটের ‘বি-সেন্ট্রাল স্মল বিজনেস সার্ভিস’ বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। ঠিক তার দুই বছরের মাথায় তিনি হয়ে গেলেন মাইক্রোসফট বিজনেস সলিউশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট।

মাইক্রোসফট নিজেদের ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের ফলে গড়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্লাউড ভিত্তিক ব্যবস্থা মাইক্রোসফট অ্যাজিউর। এর নেপথ্যে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন সত্য নাদেলা। ২০০৭ সালে তিনি মাইক্রোসফটের অনলাইন সার্ভিসের গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান। চার বছর পর ২০১১ সালে মাইক্রোসফটের সার্ভার ও টুল বিজনেস বিভাগের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর মাইক্রোসফটের মোট তহবিলে সবচেয়ে বেশি রাজস্বদায়ী খাত হিসেবে পরিণত হয় এই বিভাগ। ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন নাদেলা। পরে তিনি মাইক্রোসফটের ক্লাউড কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্মের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। মাইক্রোসফট অনলাইন সার্ভিসে ক্লাউড ওএস স্ট্র্যাটেজি গড়ে তুলেছিলেন তিনি। এই ক্লাউড সিস্টেম বিং, স্কাইড্রাইভ, এক্সবক্স লাইভ ব্রডব্যান্ড গেমিং নেটওয়ার্ক, উইন্ডোজ সার্ভার, অফিস থ্রিসিক্সটি ফাইভ, ভিজুয়াল স্টুডিওসহ বিভিন্ন মাইক্রোসফট সেবার অবকাঠামো তৈরিতে মূল ভূমিকা রাখে।

মাইক্রোসফটের শীর্ষপদে অভিষেক

ধারাবাহিক সফলতা এবং দূরদর্শিতার গুণে তিনি মাইক্রোসফটের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে আস্থাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। ২২ বছরের একনিষ্ঠ কর্মপ্রচেষ্টার

স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী (সিইও) হিসেবে মনোনীত হন। সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস ও স্টিভ বলমারের পর মাইক্রোসফটের ৪০ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে তিনিই তৃতীয় সিইও। তার পরামর্শদাতা হিসেবে এগিয়ে এসেছিলেন স্বয়ং বিল গেটস।

তিনি যখন দায়িত্ব নিলেন, তখন মাইক্রোসফট ২২ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের ব্যালেন্সশিট নিয়ে এক লাভজনক কোম্পানি। কিন্তু লাভে থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলো ততদিনে মাইক্রোসফটকে টপকে গেছে। অ্যাপল ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো পেছনে ফেলে দিয়েছে মাইক্রোসফটকে। নোকিয়ার হ্যান্ডসেট ব্যবসা বিভাগ অধিগ্রহণ করেছিল মাইক্রোসফট। তাই পিছিয়ে পড়া মাইক্রোসফটকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফিরিয়ে আনাই ছিল নতুন সিইও সত্য নাদেলার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শীর্ষপদে সফলতার পাঁচ বছর

চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি মাইক্রোসফটের সিইও হিসেবে পাঁচ বছর পূর্ণ করেন নাদেলা। সিইও হয়েই তাকে ৭.২ বিলিয়ন ডলারে নোকিয়া করপোরেশনের মোবাইল ফোন ব্যবসা কার্যক্রম অধিগ্রহণ সম্পন্নের পুরো প্রক্রিয়া তদারক করতে হয়। আর এই কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে ২০১৪ সালের এপ্রিলে মাইক্রোসফটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কর্মী ছাঁটাই সংঘটিত হয়। সেবার প্রায় ১৮ হাজার কর্মী ও কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এত বিপুল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাইয়ের জন্য কিছুটা সমালোচনার মুখে পড়লেও আখেরে তা কোম্পানির জন্য ভালো সিদ্ধান্ত ছিল। সিইওর দায়িত্ব নেওয়ার পরই মাইক্রোসফটের ব্যবসা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন নাদেলা।

২০১৪ সালে নাদেলা যখন সিইও হন, তখন বৈশ্বিক হার্ডওয়্যার বাজারে পিছিয়ে পড়েছিল মাইক্রোসফট। দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যবসায় গুরুত্ব দেন। ক্লাউড প্রযুক্তি খাতে অ্যামাজনের বিপরীতে বড় ধরনের সাফল্য আসে মাইক্রোসফটের। ব্যবসায় বৈচিত্র্য আনতে জোর দিয়ে আসছেন নাদেলা। ফলে উইন্ডোজ, এক্সবক্স কনসোল ও সারফেস সিরিজের পণ্য থেকে প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব আয় বাড়ছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী বাড়ছে ক্লাউড প্রযুক্তির ব্যবহারও।

নাদেলা তার বইয়ে লিখেছেন, স্মার্টফোন কিংবা পিসি মাইক্রোসফটের প্রধান ব্যবসা নয়। তার মতে, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আরও বেশি আয়ে সহায়তা দেওয়াই মাইক্রোসফটের প্রধান লক্ষ্য।

নাদেলার আগে স্টিভ বলমার যখন সিইও ছিলেন সে সময় প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছিল। নাদেলা দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বছরেই মাইক্রোসফটের শেয়ারদর বাড়ে ১৪ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছর শেষে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর আরও ২১ শতাংশ বাড়ে।

ভবিষ্যতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবসায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। এমন আশাবাদ থেকে এরই মধ্যে এআই নিয়ে কার্যক্রম জোরদার করেছে মাইক্রোসফট।

দায়িত্ব নেওয়ার পর শুধু ক্লাউড কম্পিউটিং কিংবা এআই খাতেই নয়, চুক্তি ও অধিগ্রহণেও অধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছেন নাদেলা। এরই অংশ হিসেবে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির ওয়েবসাইট লিংকডইন অধিগ্রহণ করেছে মাইক্রোসফট। যা রাজস্ব বাড়াতে ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। নাদেলার নেতৃত্বে গিটহাব নামে আরও একটি প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করেছে মাইক্রোসফট। ডেভেলপার কমিউনিটিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয় এই প্রতিষ্ঠান।

নাদেলার নেতৃত্বে ডেস্কটপের পাশাপাশি মোবাইল ডিভাইসের অ্যাপ বাজারেও ভালো করছে মাইক্রোসফট। মোবাইল প্লাটফর্মের জন্য এরই মধ্যে বেশকিছু অ্যাপ এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। যেগুলো প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাপলের আইফোন অ্যাপের চেয়ে অনেকাংশে উন্নত এবং কার্যকর। বিশ্বব্যাপী এসব অ্যাপের ব্যবহারকারী কয়েক মিলিয়ন ছাড়িয়েছে।

পাঁচ বছরে আমূল বদলে গেছে চিত্র। সেরা ক্লাউড কম্পিউটিং সেবাদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মাইক্রোসফট। গত ডিসেম্বরে ক্ষণিকের জন্য হলেও অ্যাপলকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দামি প্রতিষ্ঠানের তকমা পেয়েছিল। কর্মী, গ্রাহক, সফটওয়্যার নির্মাতাÑ সবার চোখেই এখন মাইক্রোসফট সেরা। মাইক্রোসফটজুড়ে এখন পরিবর্তনের হাওয়া। এই পরিবর্তন এনেছেন নাদেলা। তবে দু-একটা সিদ্ধান্ত বাদ দিলে কেউই মোটা দাগে মাইক্রোসফটের সত্য নাদেলা আমলের সমালোচনা করেনি, কিংবা পারেনি।

কত আয় করেন নাদেলা?

এবার আসা যাক আয়ের প্রসঙ্গে। ১৯৯২ সালে মাইক্রোসফটে সাধারণ কর্মী হয়ে কাজ শুরু করা নাদেলার বর্তমান আয় কত, তা নিয়ে অনেকেরই কৌতূহল রয়েছে। জানা গেছে, সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম বছরটিতেই বিশেষ প্যাকেজ হিসেবে তিনি আয় করেছিলেন ৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৭০ কোটি টাকা। তিনি কোম্পানি থেকে যে আয় করেন তার প্রতিষ্ঠানটির যেকোনো মধ্যম সারির কর্মীর চেয়ে তা ১৫৪ গুণ বেশি। ২০১৮ অর্থবছরে সত্য নাদেলাকে মাইক্রোসফট দিয়েছে ২ কোটি ৫৮ লাখ মার্কিন ডলার। তার সর্বমোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

স্ত্রীর জন্য মার্কিন গ্রিনকার্ড ত্যাগ

তের বছর বয়সে হায়দ্রাবাদের স্কুলে পড়ার সময়ই পরিচয় হয়েছিল অনুপমার সঙ্গে। অনুপমা ছিলেন নাদেলার বাবার সহপাঠী ভেনুগোপালের মেয়ে। কৈশোরেই তাদের প্রেমের শুরু। ১৯৯২ সালে মাইক্রোসফটে যোগ দিয়েই প্রায় এক দশকের প্রেমিকা অনুপমাকে বিয়ে করেন নাদেলা। ‘হিট রিফ্রেশ’ নামে আত্মজীবনীমূলক একটি বইয়ে নাদেলা জানান, বিয়ের পর স্ত্রীকে ভারত থেকে আমেরিকায় নিয়ে যেতে সমস্যার মুখোমুখি হন। এমন পরিস্থিতিতে তিনি অনুভব করলেন অনুপমাকে ছাড়া তার স্বাভাবিক কাজকর্ম সম্ভব নয়। তাই মাইক্রোসফটের চাকরিটা ছেড়ে ভারতেই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্র্তৃপক্ষের কাছে তিনি তার গ্রিনকার্ড ফিরিয়ে দেন। তবে শেষ চেষ্টা হিসেবে ‘এইচ-ওয়ান বি’ ভিসায়ও আবেদন করেন। কারণ এই ভিসা পেলে স্ত্রীকে সহজেই আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। সৌভাগ্যক্রমে তার এই প্রচেষ্টা সফল হয় এবং অনুপমাকে আমেরিকায় নিয়ে যান তিনি। মনোযোগ দেন কাজে।

দুই কন্যা ও এক পুত্র নিয়ে এখন নাদেলার পরিবার ওয়াশিংটনের বেলভিউয়ে থাকেন। নাদেলার পুত্র জইনের বয়স এখন ২৩। জন্মের সময় থেকেই মস্তিষ্কের পক্ষাঘাতে আক্রান্ত জইন। এমনকি চোখেও তিনি দেখতে পান না। চলাফেরা করতে হয় হুইল চেয়ারে। জইনের জন্মের কথা স্মরণ করে নাদেলা এক ব্লগে লিখেন, ‘সে সময়টা ছিল ১৯৯৬ সাল। অনুর (অনুপমা) তখন ২৫ বছর বয়স, আর আমার ২৯। সে সময় অনুর প্রথম গর্ভধারণ ছিল আমাদের কাছে বিরাট উত্তেজনার।’

নাদেলা লিখেন, ‘গর্ভধারণের ৩৬ সপ্তাহ পর এক রাতে অনু খেয়াল করল, তার পেটে বাচ্চার নড়াচড়া আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। তাই আমরা বেলভিউয়ের একটি হাসপাতালে জরুরি বিভাগের শরণাপন্ন হলাম। ভাবছিলাম এটা হয়তো একটি রুটিন চেকআপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু জরুরিভিত্তিতে সিজারের মাধ্যমে ১৩ আগস্ট ভূমিষ্ঠ হয় জইন।’

জন্মের পর থেকেই চলৎশক্তিহীন ছিলেন জইন। তবু তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয় নাদেলা আর অনুপমার সংসার, কর্মচাঞ্চল্য। বর্তমানে ২৩ বছরের জইন সবসময় আমোদ উল্লাসেই তার পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসেন। জইনের পর নাদেলার আরও দুই কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। এর মধ্যে ছোট কন্যার মাঝেও কথা বলায় আড়ষ্টতা রয়েছে। কিন্তু এসব কোনো কিছুই জীবনকে উপভোগ করার জন্য নাদেলা পরিবারের বাধা নয়।

নাদেলার অনুপ্রেরণা

 প্রতিনিয়ত নিজেকে বদলান : এক সাক্ষাৎকারে নাদেলা বলেন, ‘কীভাবে ব্যবসার পদ্ধতি স্বয়ংক্রিয় করা যায়, যোগাযোগব্যবস্থাকে উন্নত করা যায় এসব ছিল আগের প্রজন্মের ভাবনায়। এখন সময় বদলেছে। এখন আমরা ডেটাসেন্টার, বিগ ডেটা, স্টোরেজ নিয়ে কথা বলছি।’ তিনি মনে করেন, টিকে থাকতে হলে নিজেকে বদলাতে হয়।

দলকে অনুপ্রাণিত করুন : নাদেলা বলেন, নেতৃত্বের একটা বড় শিক্ষা তিনি পেয়েছেন ছেলেবেলায় ক্রিকেট খেলার সময়। একসময় ক্রিকেটে নাদেলা ক্রমাগত খারাপ করছিলেন। এক ম্যাচে ব্যাটিং অর্ডারে নাদেলার জায়গা দখল করে নিলেন দলের অধিনায়ক। জয়ের একদম কাছাকাছি পৌঁছে তিনি ঠিকই নাদেলাকে ব্যাট করার সুযোগ দিয়েছিলেন। সেদিনের কথা স্মরণ করে আজকের মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘কেন তিনি এই কাজ করলেন, আমি কখনো জিজ্ঞেস করিনি। তবে এতটুকু জানি, সেদিন মাঠে নামতে না পারলে আমার আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে পড়ত।’ ওই ঘটনার পরই তিনি ভালো খেলতে শুরু করেন। সত্য নাদেলা মনে করেন, খারাপ সময়ই নেতার উচিত কর্মীর পাশে দাঁড়ানো।

পরিকল্পনা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা : ২০০৮ সালে নাদেলাকে যখন মাইক্রোসফটের ‘সার্চ, পোর্টাল ও অ্যাডভার্টাইজিং প্ল্যাটফর্ম’ দলের প্রধান করা হলো, তখন অনেকেই তাকে অনভিজ্ঞ ভেবেছিল। দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথমেই তিনি তার এক বছরের পরিকল্পনা, লক্ষ্য লিখিতভাবে কর্মীদের

প্রতিটা দিনই নতুন : ২০০০ সাল থেকে পিছিয়ে পড়তে শুরু করেছিল মাইক্রোসফট। গুগল, আইফোন তখন নতুন নতুন প্রযুক্তি বাজারে আনতে শুরু করেছে। ২০১৪ সালে প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নাদেলা বললেন, ‘আমরা হব একটা ডে ওয়ান কোম্পানি’। ডে ওয়ান কোম্পানি বলতে তিনি এমন একটা প্রতিষ্ঠান বুঝিয়েছেন, যেখানে প্রতিটি দিনই হবে নতুন।

ধীরে ভাবুন, পদক্ষেপ দ্রুত নিন : সত্য নাদেলা সময় নিয়ে ভাবতে ভালোবাসেন। প্রয়োজন অনুভব করার আগে থেকেই আপনাকে ভাবা শুরু করতে হবে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে সেটা কার্যকর করতে হবে দ্রুত। কারণ, নতুনকে স্বাগত জানাতে হলে, এগিয়ে থাকতে হলে সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সময় নেওয়া যাবে না। নাদেলা মনে করেন, ৮০ শতাংশ আত্মবিশ্বাসও কাজে নেমে পড়ার জন্য যথেষ্ট। মাইক্রোসফট যেমন ‘ক্লাউড’ সেবা চালু করে দিয়েছিল খুব দ্রুত। এখন এই সেবা থেকেই তাঁদের ৩২ শতাংশ আয় হচ্ছে।

‘সব জানি’ নয়, ‘সব জানতে চাই’ : নাদেলা মনে করেন, প্রতিষ্ঠানে একটা জয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলার অর্থ এই নয় যে আমরা সব জানি। বরং আমরা সব শিখতে চাই এমন একটা পরিবেশ গড়ে তোলা। শেখার আগ্রহই প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে রাখে। অতএব শেখার ক্ষুধা থাকা জরুরি। নাদেলা বলেন, ‘যখন পেছনে ফিরে তাকাই, বুঝতে পারি আমার সাফল্য দাঁড়িয়ে আছে ব্যর্থতার শিক্ষার ওপর।’

অন্যের জায়গায় নিজেকে দেখা : প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর করার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা বিষয়েও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন নাদেলা। কারণ, তিনি শুধু আবিষ্কার করেই সন্তুষ্ট নন, গ্রাহকের জুতো পায়ে গলিয়ে তিনি অপর প্রান্ত থেকেও নিজেকে দেখতে চান। একে বলে সমানুভূতি। সত্য নাদেলা মনে করেন, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে শুধু দেখা যায়, আমার পণ্যটা কেমন। কিন্তু গ্রাহকের জায়গায় নিজেকে বসালে বোঝা যায়, পণ্যটা কেমন হওয়া উচিত।

দলে ‘আমি’ বলে কিছু নেই : ‘আমরা অনেক সময় উন্নয়নের জন্য আমরা কী করা উচিত সেটা না ভেবে অন্যদের কী করা উচিত, তা নিয়ে বেশি ভাবনায় সময় ব্যয় করি। এ ধারা বদলাতে হবে।’ বলেন সত্য নাদেলা। তিনি মনে করেন, অন্যের দিকে আঙুল না তুলে বরং দল হিসেবে এগোনো উচিত।

প্রতিযোগী ও নিজের শক্তি সম্পর্কে জানা : প্রতিযোগী হিসেবে অ্যামাজন বা গুগল কী করছে, সে ব্যাপারে সব সময় নজর রাখেন সত্য নাদেলা। আবার একই সঙ্গে নিজের শক্তির জায়গাটা সব সময় মাথায় রাখেন। স্বকীয়তা বজায় রেখেই এগোতে চান মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত