যন্ত্রণায় কান্নাকাটি করছিল পাঁচ মাসের শিশু সিনথিয়া। গত ১৩ জুলাই প্রথমে জ¦র দেখা দেয়। সাধারণ জ¦র ভেবে এলাকার ফার্মেসি থেকে জ¦রের সিরাপ খাওয়ান বাবা-মা। অবস্থার উন্নতি না হলে পরদিন ভর্তি করা হয় কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে। সেখানে চার দিন থাকার পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। এখানেই পরীক্ষায় ডেঙ্গুজ¦র ধরা পড়ে ওই শিশুর।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য বিশেষ ওয়ার্ডের ৭ নাম্বার বেডে সিনথিয়ার পাশে বসেছিলেন মা হোসনে আরা খাতুন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, খুব কষ্ট পাচ্ছে মেয়েটা। প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় রক্ত দিতে হয়েছে। ১০ দিন পার হয়েছে। কিন্তু এখনো সুস্থ হচ্ছে না। খুব চিন্তা হচ্ছে।
চিকিৎসকরা অবশ্য সিনথিয়ার ব্যাপারে এখন কিছুটা উদ্বেগমুক্ত। ওই ওয়ার্ডে কর্তব্যরত মেডিকেল অফিসার ডা. শাহিন রেজা বলেন, সিনথিয়ার অবস্থা ভালো। দুয়েক দিনের মধ্যেই ওকে ছেড়ে দেব। প্লাটিলেট ঠিক হয়ে এসেছে। জ¦রও কমছে।
তবে একই ওয়ার্ডের সিনথিয়ার পাশের বেডের ১০ মাসের তন্ময়কে নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন চিকিৎসকরা। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছেলেটা গত তিন আগে ভর্তি হলেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। প্লাটিলেট দ্রুত ওঠানামা করছে। জ¦রও কমছে না। এ অবস্থায় তাকে আইসিইউতে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
কেবল ঢাকা শিশু হাসপাতালই নয়, ডেঙ্গু রোগীদের এ চিত্র এখন রাজধানীর প্রায় সব হাসপাতালেই। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর ভিড়। ডেঙ্গুর মৌসুম শুরুর সময় এসব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কর্নার বা বিশেষ ওয়ার্ড খোলা হয়েছিল। কিন্তু এ মাসের শুরু থেকেই ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকলে এখন সে বিশেষ ব্যবস্থাতেও কাজ হচ্ছে না। নির্দিষ্ট ওয়ার্ড তো বটেই, ডেঙ্গু রোগীদের সাধারণ বেডে রেখেও চিকিৎসা দিতে বাধ্য হচ্ছেন চিকিৎসকরা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকালও ঘণ্টায় ছয়জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। আগের দিন গত মঙ্গলবার এ সংখ্যা ছিল ঘণ্টায় চারজন। মেডিসিন বিভাগের ওয়ার্ডগুলোতে রোগী সংকুলান না হওয়ায় পাশের অন্য বিভাগের ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে ডেঙ্গু রোগীদের। ঢাকা শিশু হাসপাতাল ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দিতে নয় শয্যার বিশেষ ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করেছিল। এখন সেই নয় শয্যায় কাজ হচ্ছে না। ৫০০ শয্যার হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে এখন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাই দাঁড়িয়েছে দেড় শতাধিক। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৩, ৪ ও ৭নং ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়। মোট শয্যা ১০০। এখন সেখানে চিকিৎসাধীন ১৩০ জন।
এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীতে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কিছুটা হলেও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগীদের। একদিকে যেমন ভুল চিকিৎসার খবর পাওয়া গেছে, তেমনি শয্যা পেতে বেগ পেতে হচ্ছে রোগীদের। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসায় সরকারি গাইডলাইন না মানার অভিযোগ এসেছে। এমনকি এসব হাসপাতাল ঘুরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সরকারি তথ্যের সঙ্গে বেসরকারি তথ্যের গরমিল দেখা গেছে। এসব হাসপাতালে এ পর্যন্ত যত মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে সেগুলোর একটিও সরকারিভাবে প্রচার করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) পরামর্শক ও সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, এ বছর ডেঙ্গুর ধরন পাল্টানোয় হাসপাতালে ভর্তির হার খুব বেশি। তবে আক্রান্তের সংখ্যা গণনার চেয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থাপনা ও মশা নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এবার ডেঙ্গুতে মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, লিভার ও কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গ আক্রান্ত হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন রেকর্ড করা এবং কতদিনে প্লাটিলেট কমছে সেই তথ্য সংগ্রহ করা। এছাড়া হার্টে ট্রোপোনিনের মাত্রা এবং রক্তে এসজিপিটি ও ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা কী হচ্ছে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এসব তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। তারপর চিকিৎসা গাইডলাইন বদলে সেভাবে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আমাদের খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এগুলো করতে হবে। ব্যবস্থাপনার দিক থেকে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিশেষজ্ঞ মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য আক্রান্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ঢাকার সব এলাকা ডেঙ্গু আক্রান্ত নয়। এসব এলাকায় (আক্রান্ত এলাকাগুলোতে) আমাদের পদক্ষেপ বাড়াতে হবে। এটার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। একে অন্যকে দোষারোপ না করে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
গতকালও নতুন রেকর্ড : এমন অবস্থায় গতকালও এক দিনে সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগীর ভর্তির নতুন রেকর্ড হয়েছে। গত মঙ্গলবার যেখানে দেশের হাসপাতালগুলোতে ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছিল ২০ জন, গতকাল তা ২৩ জনে পৌঁছেছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে নতুন করে ৫৬০ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে এ মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৬ হাজার ৪২১ জনে। গতকাল তা ৮ জন বলে জানানো হয়। যদিও বেসরকারি হিসেবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি।
এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট চিকিৎসা নিয়েছেন ১৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী। এদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ৪৪ জনকে।
শিশুদের নিয়ে উদ্বেগ বেশি : ঢাকা শিশু হাসপাতালে ডেঙ্গুর রোগীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ বেশি বলে জানালেন চিকিৎসকরা। হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, গত ১ জানুয়ারি গতকাল পর্যন্ত এ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২২৪ জন শিশু চিকিৎসা নিয়েছে, এর মধ্যে মারা গেছে দুই শিশু। বর্তমানে ৬৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ও সহকারী অধ্যাপক ডা. রিজওয়ানুল আহসান বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। তাছাড়া ডেঙ্গুর ধরন বদলে গেছে। তাই ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে সহজে বোঝার উপায় নেই। ফলে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এ বছর অন্য যেকোনো বয়সের চেয়ে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে জানিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, অন্য বয়সের মানুষে এটা শারীরিক সক্ষমতা দিয়ে সামলাতে পারে। কিন্তু একজন শিশুর সেই সক্ষমতা থাকে না এ কারণে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। যে শিশু দুটি মারা গেছে তাদের অবস্থা গুরুতর হয়ে যাওয়ার পর হাসপাতালে আনা হয়েছে। ফলে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার সময় পাওয়া যায়নি।
এই চিকিৎসক আরও জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত যত রোগী আসছে এদের সবার প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে, সবাই শকে চলে যাচ্ছে। আগে সামান্য চিকিৎসায় ডেঙ্গু ভালো হতো । এবার সবারই রক্ত লাগছে। এই পরিস্থিতিতে জ¦র হলে গাফিলতি না করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ভুল চিকিৎসাও হচ্ছে : ডেঙ্গুজ¦রে আক্রান্ত হয়ে গত ছয় দিন ধরে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের শয্যায় যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছেন দেলোয়ার হোসেন। গত বৃহস্পতিবার জ¦র ও বুকে যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। জ¦র কমলেও কমছে না বুকের ভেতরের যন্ত্রণা। উদ্বিগ্ন স্ত্রী শায়লা জানান, দেলোয়ার হোসেন (৩৪) মিরপুর-১ নবাবের বাগ পাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকেন। সেখানেই একটি ওয়ার্কশপে কাজ করেন তিনি। গত ১৬ জুলাই কাজ করা অবস্থায় মাথা ঘুরে পড়ে যান। পরে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রক্ত পরীক্ষা করে রক্তে ইনফেকশন হয়েছে বলে তাকে ওষুধ দেওয়া হয়। দুদিন পর অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকলে তাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এখানে টেস্টের পর ডেঙ্গু ধরা পড়ে।
হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে ব্যবস্থাপনা বাড়েনি। ফলে ভুল চিকিৎসা হতে পারে। তাই জ¦র হলেই দ্রুত সরকারি হাসপাতালে চলে আসা উচিত।
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ড. উত্তম কুমার বড়ুয়া বলেন, এবার ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় রোগীদের চিকিৎসা দিতে কিছুটা হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবুও আমরা চেষ্টা করছি রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়া। আমরা সব ডেঙ্গু রোগীর জন্য বিছানার ব্যবস্থা করেছি। ক্রিটিক্যাল হলে আলাদা বেডে নিয়ে অবজারভেশনে রাখা হচ্ছে। আমাদের এখানে ইমার্জেন্সি সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে।
ঢামেকে মৃত্যু ৪ : ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) মোট চারজন মারা গেছেন। এদের মধ্যে তিনজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ডেমরার রাজু (২০) ২০ জুলাই, কামরাঙ্গীরচরের হাবিবা বেগম (৬১) ১৯ জুলাই, ফরিদপুরের রাবেয়া (৫০) ২৬ জুন মারা যান।
গতকাল হাসপাতালের নতুন ভবনের চার, পাঁচ ও ছয়তলায় মেডিসিন বিভাগের ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। মেডিসিন আর শিশু বিভাগগুলোর কেবিন, ওয়ার্ড, বারান্দাÑ সব স্থানেই ডেঙ্গু রোগী ভর্তি। গত মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে বুধবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। সব মিলে এখন চিকিৎসাধীন ৪০৬ জন। মোট ১ হাজার ২০৯ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, মূলত তিন থেকে আট বছরের শিশুরা বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। দেড়-দুই বছরের শিশুরাও আসছে, কিন্তু তাদের সংখ্যা কম।
এ বিষয়ে ঢামেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসিরউদ্দিন বলেন, প্রতিদিনই অসংখ্য রোগী হাসপাতালের আউটডোরে আসছেন। যাদের অবস্থা খারাপ মনে করছি, আমরা তাদের সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি করছি। বিশেষ করে এ মাসে রোগীর চাপ বেশি। এটা আমাদের জন্য বাড়তি বোঝা। তবে আমরা আমাদের মতো পরিস্থিতি ম্যানেজ করছি।
মোট শয্যার এক-তৃতীয়াংশ বেডেই ডেঙ্গু রোগী : হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৫০০। এর মধ্যে ১৬০টিতে ভর্তি আছেন ডেঙ্গু রোগী। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, গত ১ মে হাসপাতালে প্রথম ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। গত ৭ জুলাই পর্যন্ত মোট ২২২ ডেঙ্গু রোগী ছিলেন। অথচ গত মঙ্গল থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত ৫৫ রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে এখানে চিকিৎসাধীন ১৬০ রোগী।
