পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছেন, ‘পদ্মা সেতুতে মাথা লাগার’ গুজব ছড়ানো হয়েছে দুবাই থেকে। এ ঘটনা যে ঘটিয়েছিল তার ব্যাপারে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। সে সরকারবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। গুজব ও গণপিটুনির ঘটনায় ৩১টি মামলায় ১০৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৬০টি ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট, ২৫টি ইউটিউব লিঙ্ক এবং ১০টি ওয়েবপোর্টাল বন্ধ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, এসবির প্রধান মীর শহীদুল ইসলাম, সিআইডির প্রধান শফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত আইজিপি (অর্থ) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম, এআইজি (প্রশাসন) মিলন মাহমুদ, এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা, সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা এ কে এম কামরুল আহছান প্রমুখ।
আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, ‘একটি স্বার্থান্বেষী মহল সুপরিকল্পিতভাবে দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে এ ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে। এ সংক্রান্ত একটি পোস্ট আমাদের নজরে আসে, সেটি ছিল দুবাই থেকে। তাকে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি সরকারবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে আমরা জানতে পেরেছি। তার পোস্টের পর দেশের ভেতরে কেউ না বুঝে হুজুগে গুজব ছড়িয়েছে, গুজবের পোস্টগুলোতে শেয়ার করেছে, মন্তব্য করেছে। আবার কেউ পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়েছে। এই গুজবে আতঙ্কিত হয়ে দেশে যেসব গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে, সেসব ঘটনায় ৩১টি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০৩ জনকে।’
তিনি বলেন, ‘একটি মহল আন্দোলনসহ নানা উপায় অবলম্বন করে ব্যর্থ হয়ে এখন গুজব ছড়াচ্ছে। তারা দেশের বাইরে থেকেও গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছে। এসব ঘটনায় এ পর্যন্ত যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের কয়েকজনের সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের লিঙ্ক পেয়েছি। এদের মধ্যে সরকারের সমর্থক কেউ আছে কি না, সেই তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। জড়িতদের প্রোফাইল তৈরির কাজ চলছে। কোন পোস্ট দিয়ে গুজবের শুরু হয়েছে, তা পুলিশ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ৬০টি ফেইসবুক আইডি, ২৫টি ইউটিউব লিঙ্ক এবং ১০টি অনলাইন পোর্টাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনেকে না বুঝেই এগুলো শেয়ার করে গুজব ছড়াচ্ছে। অথচ আমরা গণপিটুনির ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখলাম, এতে যে আটজন মানুষ মারা গেল তাদের সবাই নিরপরাধ। তাদের কেউই ছেলেধরা ছিল না।’
সাম্প্রতিক কয়েকটি গণপিটুনির ঘটনার তথ্য তুলে ধরে পুলিশপ্রধান বলেন, ‘নেত্রকোনায় এক শিশুর মাথাকাটাসহ একজনকে ধরে গণপিটুনি দিয়েছিল স্থানীয়রা। এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তি রবিন ছিল একজন মাদকাসক্ত। মাদকাসক্ত কেন্দ্রেও ভর্তি হয়েছিল। সে কয়েকবার তার স্ত্রীর গলা কাটতে চেয়েছিল। পারিপার্শ্বিক ঘটনার বিশ্লেষণে আমরা বলতে পারি, শিশুটিকে রবিন প্রথমে বলাৎকারের চেষ্টা করে, এরপর শিশুটি এর প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে হত্যা করে। বাড্ডায় নারী নিহতের ঘটনাটিও ছেলেধরা ছিল না। ওই নারী তার মেয়েকে স্কুলে ভর্তির জন্য স্কুলে গিয়েছিল। একইভাবে যাত্রাবাড়ী ও কেরানীগঞ্জের ঘটনাটিও ব্যক্তিগত বাকবিতণ্ডায় ছেলেধরা বলে চিৎকার করার কারণে ঘটেছে। এরূপ প্রতিটি ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে প্রত্যেককে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।’
এর আগেও গুজব ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হয়েছে উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, ‘আমাদের দেশে ‘সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে’ এমন গুজবও ছড়িয়েছিল। আমাদের মানুষ খুব সহজ সরল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পোস্ট হলে, আর সেটি যদি নেগেটিভ হয় তাহলে খুব দ্রুত শত শত লাইক-শেয়ারে ভরে যায়। এই ঘটনাগুলো পুলিশ সদর দপ্তরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
গুজব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারিও দেন জাবেদ পাটোয়ারী। তিনি বলেন, ‘গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে আপনি হত্যা মামলার আসামি হয়ে যাচ্ছেন। হত্যা মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হয়ে থাকে। যেখানেই থাকুন না কেন, আমরা আপনাকে খুঁজে বের করব এবং কঠোর শাস্তির জন্য আইনের হাতে তুলে দেব।’
জনগণের উদ্দেশে জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, ‘আমাদের ওপর আস্থা রাখুন, সঠিক বিষয়গুলো বের করব। কেউ যদি এ রকম ঘটনা (ছেলেধরা) দেখতে পান বা জানতে পারেন, কাউকে যদি সন্দেহ হয় তাহলে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশের টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাবে।’ গুজব প্রতিরোধে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতি জেলার এসপি, মেট্রোপলিটন পুলিশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন হাট-বাজারে ছোট ছোট আকারে সভা করেছে। প্রতিটি স্কুল-মাদ্রাসার বাইরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং সাদা পোশাকে পুলিশ রাখা হয়েছে।’
পুলিশপ্রধান বলেন, আজ থেকে এক সপ্তাহ দেশজুড়ে গুজববিরোধী সচেতনতা সপ্তাহ পালন করা হবে। এর অংশ হিসেবে প্রতিটি জেলা, থানা ও মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ সদস্যরা উঠান বৈঠক করবেন। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় গিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে গুজবে আতঙ্কিত না হওয়ার প্রচার চালাবেন। তিনি বলেন, ‘সচেতনতার অংশ হিসেবে আগামী শুক্রবার জুমার নামাজের খুতবার সময় ইমামদের গুজববিরোধী বয়ান করতে বলা হবে। এ ছাড়া পুলিশের চৌকস অফিসাররা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের আতঙ্কিত হতে নিষেধ করবেন।’
শিশুদের উদ্দেশে আইজিপি বলেন, ‘পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজে শিশুদের মাথা লাগবেÑ এটি স্রেফ গুজব। তোমরা নিশ্চিন্তে পদ্মা সেতুর স্থাপনা, নির্মাণকাজ ঘুরে আস। পদ্মা সেতু দেশের অন্যতম বৃহৎ স্থাপনা, যা দেশি-বিদেশি শ্রমিকরা দিনের আলোতে নির্মাণ করছে। ইতোমধ্যে এই সেতুর ৭২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। যে কেউ কাজগুলো দেখে আসতে পার, ঘুরে আসতে পার। তোমাদের বাড়িগুলো যেমন ইট-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি, একইভাবে পদ্মা সেতুও ইট-সিমেন্ট দিয়ে বানানো হচ্ছে। পদ্মা সেতু নিয়ে কেউ তোমাদের বাজে কথা বললে ভয় পাবে না। কাউকে সন্দেহ হলে যে কারও মোবাইল নিয়ে জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে কথা বলবে। এতে কোনো টাকাও খরচ হবে না।’
