জীবন যখন গুবরে পোকার যুক্তিহীন আশা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০১৯, ১১:১৬ পিএম

হৃদপিণ্ডে একটা তীক্ষ সুচ বিঁধে থাকলে যে-রকম কষ্ট হওয়ার কথা, অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ পড়ার সময় ঠিক তেমনই অনুভূতি হয়। এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তি মেলে না। সর্বোচ্চ সুখ নিয়ে কাজ করে যে মন্ত্রণালয়, এই নিদারুণ অসুখ সারানোর উপায় তার জানা আছে কি?

উত্তর খুঁজতে চলে যেতে হয় আনজুম কিংবা আফতাবের গল্পে। কবরস্থানের একটি প্রাচীন বৃক্ষের মতো যার জীবন। বাস্তবিকই, কবরস্থানেই তার বসবাস। আনজুম/আফতাব আমাদের চেনা গণ্ডির কেউ নয়। তার পুরো অস্তিত্বই সাধারণ পাঠকের কাছে এক অজানা জগৎ। দিল্লির শাহজাহানবাদে এক সচ্ছল মুসলমান পরিবারে যে কিনা বাবা-মায়ের পরম আকাক্সিক্ষত সন্তান। তিন মেয়ের পর জন্ম নেওয়া শিশু আফতাবকে প্রথমে ছেলে বলেই বিশ্বাস করে ধাত্রী থেকে শুরু করে সবাই। তবে খানিকপরেই তার মা আবিষ্কার করে সত্যিটা। আফতাব যতখানি পুরুষ, তার চেয়েও বেশি নারী। শারীরিকভাবে পুরোপুরি যদি নাও হয়, মানসিকভাবে অনেকটাই। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই মানসিক দ্বন্দ্ব তীব্র হতে থাকে, ঔপন্যাসিক যাকে ইন্দো-পাক যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কোমল, সংবেদনশীল, সংগীতপ্রেমী আফতাবকে আঁচড়ে কামড়ে রক্তাক্ত করে তোলে সমাজ। আনজুম নাম নিয়ে সে পালিয়ে বাঁচতে চায় হিজড়াদের নিজস্ব সমাজে। হ্যাঁ, তৃতীয় লিঙ্গ বা এরকম অন্য কোনো বিবেচক নামের চেয়ে নিজেকে হিজড়া বলে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে আনজুম। এই নামের সঙ্গে সম্পর্কিত তাচ্ছিল্য, ঘৃণা আর যন্ত্রণাকে গ্রহণ করেছে গর্বিত সততায়। জীবনের অকারণ নিষ্ঠুরতায় বাকরুদ্ধ হয়ে একসময় সেই সমাজ থেকেও পালায় আনজুম। বেছে নেয় বৃক্ষ জীবন। নিঃশব্দ, নিশ্চল, তবু একটা স্থির প্রশান্তি আছে সে জীবনে। শুধু আনজুম না, আটমোস্ট হ্যাপিনেসের প্রধান চরিত্রগুলোর প্রত্যেকের জীবনেই রয়েছে সান্ত্বনাহীন কোনো বিপর্যয়। যে বিপর্যয় তাদের পুরো অস্তিত্বকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। যেমন তিলোত্তমা। যেমন মুসা। যেমন সাদ্দাম, রেবতী। এরা কেউই আমাদের আশপাশের কোনো পরিচিত মানুষের মতো নয় একেবারেই। আমরা যাকে স্বাভাবিক বলে জানি, সেরকম কোনো জীবন এদের মেলেনি। তিলোত্তমা বড় হয়েছে তার পালক মায়ের কাছে, যে কিনা আসলে তার গর্ভধারিণীও বটে। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বাইরে জন্ম দেওয়া শিশুকে অনাথ আশ্রমে রেখে আসতে বাধ্য হয় মা। কিন্তু মাস কয়েকের মধ্যেই নিজের মাতৃত্বের শক্তিতে সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখানোর সাহস অর্জন করে। সরাসরি সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তি ছিল না, তাই কিছুটা ছলনার আশ্রয় নিতেই হয়। নিজের গর্ভজাত সন্তানকেই দত্তক নিতে হয় তাই।

 

তিলোত্তমা বেড়ে ওঠে প্রচলিত সমাজের সব নিয়মের বিপরীতে মূর্তিমান এক অ্যান্টিথিসিস হয়ে। গায়ের রং কালো, পাখির বাসার মতো চুল, রূপচর্চা কিংবা পোশাক নিয়ে একেবারেই সচেতন না তিলোত্তমা, তবু সে প্রবলভাবে টানে তার পুরুষ বন্ধুদের। তবে তিলোত্তমার আত্মার সম্পর্ক গড়ে ওঠে মুসার সঙ্গে। কাশ্মীরের ছোট্ট এক শহর থেকে দিল্লিতে আর্কিটেকচার পড়তে আসা মুসা, যে আদতে একজন শিল্পী। কী কারণে তিলোত্তমা আর মুসার সম্পর্ক বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় না, তা পরিষ্কার করেননি ঔপন্যাসিক। একটা অমীমাংসিত, সম্ভবত মীমাংসার অযোগ্য, ধাঁধার দুটো খণ্ড হিসেবে তাদের বর্ণনা করেছেন তিনি। পরস্পরের সঙ্গে খাপে খাপে মিলে গেলেও জীবনের বাকি অংশগুলোর সঙ্গে মেলাতে পারা যায় না। মুসাকে চিনতে চেয়েই কাশ্মীরকে চেনে তিলোত্তমা। নতুন করে বর্ণমালা শেখে। শিক্ষার এ নতুন পদ্ধতির জন্ম দিয়েছে যুদ্ধ। যেখানে ‘এ’ ফর আজাদি, অ্যামিউনিশন, আর্মি, অ্যাটাক; ‘বি’ ফর বডি, বিএসএফ, বর্ডার, ব্লাস্ট, বুলেট, বার্বড ওয়্যার; ‘সি’ ফর ক্রসফায়ার, ক্যাম্প, কারফিউ, ক্র্যাকডাউন, কাস্টডিয়াল কিলিং।

 

অসম এই যুদ্ধে জেতার সরল পদ্ধতি হিসেবে জিহাদকেই বেছে নেয় মুসা। যখন তার তিন বছরের মেয়ে, যে কিনা নিজেকে ‘মিস জেবিন’ ছাড়া অন্য নামে ডাকতে দিতে রাজি ছিল না কখনো, ভারতীয় সেনার বিচ্ছিন্ন এক বুলেটে মারা যায়। বাবার কাছে রোজ রাতে গল্প শোনার বায়না ধরত মিস জেবিন। বলত, ‘আখ দালিলা ওয়ান’Ñ একটা গল্প শোনাও। তবে তা হতে হবে সত্যিকার গল্প। এক ছিল ডাইনির বদলে তাই মিস জেবিনের গল্প শুরু হতো এভাবেÑ এক ডাইনি ছিল না, সে জঙ্গলেও থাকত না। অর্থহীন এই শিশুতোষ বাক্যই তার এপিটাফে খোদাই করে রাখে মুসা। উষ্ণ হৃদয়, কিন্তু ঠাণ্ডা মাথার এই যুবক একসময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে ত্রাস হয়ে ওঠে, যার মাথার দাম বেড়ে চলে ক্রমেই। কাশ্মীরের ডাল লেকে, পুরনো এক হাউসবোটে তিলোত্তমাকে লিওনার্ড কোহেনের গান বাজিয়ে শোনায় মুসা। তার মনে হয় লিওনার্ড কোহেন নিজেও হয়তো একজন কাশ্মীরি, তা না হলে মুসার জীবনের গল্প কীভাবে এত নিখুঁতভাবে নিজের গানে তুলে আনলেন? মুসাকে নামাজ পড়তে দেখে অস্বস্তি বোধ করে না তিলোত্তমা। কৌতূহলী হয় কেবল, যে ঈশ্বরের সন্ধান সে নিজে পায়নি, মুসা কি তাকে খুঁজে পেয়েছে?

 

উপন্যাসের অন্য আরও চরিত্র রেবতী, সাদ্দাম কিংবা তিলোত্তমার মা মারিয়াম আইপে, এদের প্রত্যেকের গল্প ধারালো ব্লেড হয়ে, নরম মাংসে সিগারেটের জ্বলন্ত ছ্যাঁকা হয়ে, উন্মত্ত জনতার এলোপাতাড়ি মার হয়ে, আইসিইউতে মৃত্যুযন্ত্রণার মধ্যে কড়া সিডেটিভের ঘোর হয়ে পাঠকের মননকে আক্রান্ত করে। আর আছে আমরিক সিং। মুসা যদি গল্পের নায়ক হয়, তাহলে নিষ্ঠুর, ক্রুর আর স্যাডিস্ট আমরিক খলনায়ক। ডিভাইন জাস্টিসের শর্ত মেনে খলনায়কের অবধারিত পরিণতি মৃত্যুই বরণ করে আমরিক সিং। তবে নায়ক মুসার হাতে সরাসরি তার মৃত্যু দেখাননি ঔপন্যাসিক। আমরিক মারা যায় তার কৃতকর্মের অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে। আমেরিকায় নতুন জীবন শুরু করেও যে অনুশোচনা তাকে পাগল করে তোলে, আজীবন অত্যাচারী আমরিক তার স্ত্রী-সন্তানকে গুলি করে মেরে নিজেও আত্মহত্যা করে। আনজুম, মুসা কিংবা তিলোত্তমার গল্পের কোনো সুখের সমাপ্তি নেই। তাদের এই গল্পে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে না পেলেও, তাদের ভেতরের যন্ত্রণাটুকু নিশ্চিতভাবেই আমাদের সবার জন্যই ভীষণ প্রাসঙ্গিক।

‘আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ না, এই উপন্যাস আসলে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ‘গুঁড়ো গুঁড়ো’ হয়ে যাওয়া জীবনের গল্প। যার পরিসমাপ্তি ঘটে উলটে থাকা এক গুবরে পোকার যুক্তিহীন আশায়। সান্ত্বনাহীন এক নির্মম পৃথিবীতে আমরা প্রত্যেকেই হয়তো এই গুবরে পোকার মতোই। আমরা গুবরে পোকা হয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে অসহায় হাত-পা ছুঁড়ছি। আর আশা করছি, সব ঠিক হয়ে যাবে।

 

বই : দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস

লেখক : অরুন্ধতী রায়

লেখক

কবি ও সাংবাদিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত