মালিঙ্গাকে বাংলাদেশের বিদায়ী উপহার

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৯, ০২:০৯ এএম

শ্রীলঙ্কা দল কথা রেখেছে। দেড়টা দশক ধরে তাদের পেস বোলিংয়ের নেতৃত্ব দিয়ে আসা সিøঙ্গার ফাস্ট বোলার লাসিথ মালিঙ্গাকে গতকাল কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে স্মরণীয়ভাবেই বিদায় জানিয়েছে তারা। আবার একটু ঘুরিয়ে বললে বাংলাদেশের বিস্রস্ত বোলিং, ফিল্ডিং ও আত্মঘাতী প্রবণতার ব্যাটিং কি মালিঙ্গাকে এমন এক বিদায়ী উপহার দেয়নি? হয়তো বা। তাতে ৩ ম্যাচের সিরিজের প্রথমটি ৯১ রানে জিতে ১-০ তে লিড নিল স্বাগতিকরা। ২২৬ ম্যাচে ৩৩৮ উইকেট নিয়ে ওয়ানডেতে মালিঙ্গা অধ্যায়ের ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’ এখানেই।

শ্রীলঙ্কার ৮ উইকেটে ৩১৪ রানের জবাবে বাংলাদেশ অল আউট ৪১.৪ ওভারে ২২৩ রান তুলে। হেরেছে ৯১ রানে। ৩৫ বছরের মালিঙ্গার শেষ ম্যাচের বোলিং ফিগার ৯.৪-২-৩৮-৩। শেষ উইকেটও তার। মালিঙ্গার হাতেই শুরু ও শেষ বাংলাদেশের। ২৮ তারিখে একই মাঠে অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় ওয়ানডে এখনই বাংলাদেশের জন্য সিরিজ বাঁচানোর।

লাসিথ মালিঙ্গা ওয়ানডের শেষ অধ্যায়ের শুরুটা কী অসাধারণ। প্রথম চার বলে কোনো রান না দিয়ে তামিম ইকবালের স্টাম্প উপড়ে দেওয়া। এ রকম একটা ডেলিভারি যেকোনো খেলার টোন টেনে দিতে জানে। এটা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন কোচ খালেদ মাহমুদ সুজনের ৪৮ পূর্ণ করা জন্মদিন। কিন্তু ৪০ হাজার মানুষ কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে মালিঙ্গাকে স্মরণীয় বিদায় দিতে এসেছে। আর ফিল্ডিংয়ে নামার সময় গার্ড অব অনার পেলেন মালিঙ্গা। পঞ্চম বলে শূন্য হাতে তামিমকে বোল্ড করে স্টেডিয়ামে তুলে দিলেন সমুদ্রের প্রবল গর্জন।

লক্ষ্য ৩১৫। এই সেদিন বিশ্বকাপে ৩২২ করে ৪২তম ওভারে জিতেছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩৩৩-ও আছে। কিন্তু দলে যে নেই বিশ্বকাপের সেরা অল রাউন্ড পারফর্মার সাকিব আল হাসান। চোটে শেষটায় হারাতে হয়েছে উজ্জীবনী মন্ত্র ছড়িয়ে কঠিন ম্যাচেও জয় বের করে আনতে জানা মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা।

তা প্রেমাদাসায় বাংলাদেশ আগে কখনো জেতেনি। এখানে ২০১২ সালে স্বাগতিকদের ২৮৬ রান টপকে ভারতের জয় এখনো সর্বোচ্চ তাড়ার রেকর্ড। বাংলাদেশ ২০০৬ সালে শ্রীলঙ্কার ২১২ রান টপকে জিতেছিল বগুড়ায়। তা হলে এই ম্যাচে বোলিং ইনিংসেই তো হেরে বসে থাকে বাংলাদেশ!৮ উইকেটে ৩১৪। কুশল পেরেরার অসাধারণ সেঞ্চুরি। দুটি জুটি। মালিঙ্গাকে স্মরণীয় বিদায় দিতে লঙ্কানদের পারফেক্ট ব্যাটিং।

এই পরিস্থিতিতে ১২ ওভারের মধ্যে ৩৯ রানে ৪ উইকেট পড়ে গেলে তারপর কী বাকি থাকে? তিন নম্বরে প্রস্তুতিতে আশা জাগানো মোহাম্মদ মিঠুন (১০) নুয়ান প্রদীপের শিকার। মালিঙ্গা অন্য প্রান্ত থেকে ইয়র্কারে সৌম্য সরকারকে (১৫) জানান বিদায়। বিদঘুটে এক শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে ফেরেন অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহ। স্রেফ আত্মহত্যা। এবং বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে শুরুর দিকে কেমন যেন এক ভীতির ছায়া ছিল স্পষ্ট।

ফ্লাডলাইটের ঔজ্জ্বল্য লঙ্কান চার পেসার বাড়িয়ে দেন শুরুতে। উইকেটও হাত বাড়ায় তাদের দিকে। এর মধ্যে প্রতিরোধের দেয়াল তুলতে থাকেন ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ মুশফিকুর রহিম ও সাব্বির রহমান। ১১১ রানের জুটি দলকে দেড়শোতে নেয়। কিন্তু ৫৬ বলে ৭ চারে ৬০ রান করা সাব্বিরের আউটটাও পরিস্থিতির সঙ্গে যায় না। যেমন যায় না আবারও ভরসা হারাতে থাকা মোসাদ্দেক হোসেনের (১২) রান আউট।  দোষটা হয়তো ক্রিকেটীয় বিবেচনায় মুশফিকের কাঁধে যায়।

বিশ্বকাপে ৩৬৭ রান করে আসা দারুণ ফর্মে থাকা মুশফিক কীভাবে লেজের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে দুর্গম গিরি পার হবেন? তার ৩৬তম ফিফটিটা হয়। ১৮২ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর এই ম্যাচে জয় আশা করা যায় না। তা হয়ও না। ধুঁকে ধুঁকে আত্মসমর্পণ। ৬ হাজার রানের সঙ্গে ৮ রানের দূরত্ব রেখে ৮৬ বলে ৫ চারে ৬৭ রান করে যেভাবে ফিরেছেন সেটাও ঠিক তার সঙ্গে যায় না। যেমন যায় না গত চার বছরে দারুণ উন্নতি করতে থাকা বাংলাদেশের এমন ছন্নছাড়া পারফরম্যান্স।

প্রচণ্ড উষ্ণতা ও আর্দ্রতা। আগে ব্যাট করার জন্য আদর্শ উইকেট। রাতের আলোতে পেসারদের সামলানো আরও কঠিন। এমনসব সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের ১৪তম অধিনায়ক তামিম ইকবালের জন্য টস জেতা খুব জরুরি ছিল। কিন্তু ৪৯ হাজার কণ্ঠের মিলিত ‘মালি-মালি’ ধ্বনির মাঝে দিমুথ করুনারতেœকে ক্রিকেটদেব টস জিতিয়ে দিলেন।

বাংলাদেশের একাদশে চমক শফিউল ইসলামের ২১ মাস ফেরা। এবং শেষে ৩ উইকেট নিয়ে ইনিংসের সেরা বোলার তিনি। নতুন বলে পুরনো সমস্যা অবশ্য তাতে কাটেনি। যদিও আভিস্কা ফার্নান্দোকে (৭) তৃতীয় ওভারেই শিকার করে শফিউল ব্রেক থ্রু দিলেন।

এরপর অধিনায়ক করুনারতেœ ও এই ম্যাচে বিস্ফোরক সেঞ্চুরির ইনিংস উপহার দেওয়া কুশল পেরেরা যেন ব্রেক ছাড়া ট্রেন। প্রথম চার ওভারে ১৩ ছিল। ১০ ওভার শেষে ৭৭/১। ৯৭ রানের জুটি। পেরেরা বাউন্ডারির পর বাউন্ডারি হাঁকিয়ে চলেন। বোলার বাছতে হিমশিম খান তামিম। বেসামাল লাইন-লেন্থ ভোগাতে থাকে বাংলাদেশকে। ১৫তম ওভারের শেষ বলে করুনারতেœকে মেহেদী হাসান মিরাজ তুলে নেওয়ার পর স্বস্তির আশা করেছিল বাংলাদেশ।

কিন্তু পেরেরা দারুণ মুডে। আম্পায়ারের দেওয়া আউট থেকে রিভিউ নিয়ে বেঁচেছেন। এরপর ব্যক্তিগত ৬৭ রানের সময় বোলার মোস্তাফিজুর রহমান তাকে রান আউট করার সুযোগটাও হারিয়েছেন। বিশ্বকাপ থেকে বয়ে আনা বাজে ফিল্ডিংয়ের নজিরে বাড়তি রান দেওয়ার অভ্যাস রয়ে গেল।

২৫তম ওভারে লাকি বোলার সৌম্য সরকারকে আক্রমণে আনা হলো। তার দ্বিতীয় ওভারে ২৮ রানে থাকা মেন্ডিস আকাশে বল তুললেন। মাহমুদউল্লাহর মতো অভিজ্ঞ ফিল্ডারও এমন সহজ ক্যাচ কীভাবে মিস করেন! এরপরই মোসাদ্দেককে মিড উইকেট দিয়ে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে মালিঙ্গার শেষ ম্যাচে তাকে দুর্দান্ত সেঞ্চুরিটা উৎসর্গ করেন পেরেরা। ৮২ বলে ১৭ চার ও ১ ছক্কায় ক্যারিয়ারের পঞ্চম ও বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিতীয় সেঞ্চুরি তার।

ওই সময় বোলাররা কিছুটা চাপে রেখেছিলেন ব্যাটসম্যানদের। রান উঠছিল কম। ৩৩ ও ৩৪তম ওভার বাংলাদেশকে ম্যাচে ফেরার সুযোগ করে দেয়। সৌম্যকে সুইপ করে পেরেরা শর্ট ফাইন লেগে ফিজের হাতে বল তুলে দিয়ে ফেরেন। ৯৯ বলে ১১১। আর খরুচে রুবেল হোসেন কিংবা উইকেটকিপার মুশফিকুর রহিম কিছু বুঝলেন না। আম্পায়ারও আউট দেননি। আবেদন হয়নি। মেন্ডিস সবাইকে চমকে ক্রিকেটকে এখনো ভদ্রলোকের খেলা প্রমাণ করে ‘ওয়াক’ করেন। টিভি রিপ্লেতে পরে দেখা গেল, বলটা সামান্য ছুঁয়ে গেছে ব্যাট। মেন্ডিস ৪৩ রান করেছেন। পেরেরার সঙ্গে জুটিটা ১০০ রানের।

বাংলাদেশের বোলাররা সøগ ওভারে নিয়মিত ভালো করেন। ৪০ ওভারে ২৪৫/৪ লঙ্কার। আরও ৪টি উইকেট পড়ল বটে কিন্তু রান এলো ৬৯। পাঁচ ওভারে ১৭ রানে ১ উইকেট শিকার এবং তিনটি ক্যাচ নেওয়া সৌম্যকে কেবল বোলিংয়ে একটু ভিন্ন লাগল। বাকিদের কথা না বলাই ভালো। অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস ৪৮ ও লাহিরু থিরিমানে ২৮ করেছেন। মালিঙ্গা জীবনের শেষ ওয়ানডেতে ১০০ স্ট্রাইক রেটে রান এ বলে ৬ রানে ‘নটআউট’।

এবং বোলিংয়ে নেমে প্রথম ওভারেই আনপ্লেবল এক স্লিঙ্গার ইয়র্কারে প্রতিপক্ষ অধিনায়ককে মাটিতে ভূপাতিত করেন। ওদিকে উইকেট উপড়ে বাতাসে ভাসে। তামিমকে এভাবে লঙ্কান ইনিংসের মাত্র পঞ্চম বলে উড়িয়ে দিয়ে বীরোচিত বিদায়ের গল্পের শেষের শুরুটা ৩৫ বছরের মালিঙ্গা যেন নিজেই করে দিলেন। হার বাংলাদেশের তবু বিদায় বেলায় জয়তু কিংবদন্তি মালিঙ্গা। একজন ক্রিকেটারের আদর্শ বিদায় তো এমনই হওয়া উচিত।

শ্রীলঙ্কা : ৩১৪/৮ (৫০ ওভার)

বাংলাদেশ :২২৩ (৪১.৪ ওভার)

ফল : শ্রীলঙ্কা ৯১ রানে জয়ী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত