প্রথমবারেই এসে বাজিমাত। প্রজ্ঞা পারমিতা সেনগুপ্তা হয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আবৃত্তি মঞ্চের নবম আয়োজন ও উৎসবের সেরা। তাকে নিয়ে লিখেছেন ফজলে রাব্বী। ছবি তুলেছেন মৃত্তিকা চক্রবর্তী
নাম তার প্রজ্ঞা পারমিতা সেনগুপ্তা। জন্ম চট্টগ্রাম জেলায়, বোয়ালখালী উপজেলায়, পশ্চিম খিতাপচর গ্রামে। বাবা প্রকাশ সেনগুপ্ত বেসরকারি ‘ডামকো শিপিং লাইন’র কার্যনিবাহী কর্মকর্তা। তাই শহরের অলংকার মোড়ে থাকেন তারা। প্রকাশ ও হেলেন সেনগুপ্তার একমাত্র মেয়ে প্রজ্ঞা। লেখাপড়ায় ভালো। চট্টগ্রাম ল্যাবরেটরি স্কুল থেকে ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে ২০১৬ সালে সিজিপিএ ‘৫’ পেয়ে মাধ্যমিক এবং সরকারি কমার্স কলেজ থেকে দুই বছর পর জিপিএ ‘৪.৬৭’ উচ্চ মাধ্যমিক। এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। ব্যবসায় থেকে কেন সাংবাদিকতায়? হেসে দিলেন, ‘আমারও ইচ্ছে ছিল ব্যবসায় প্রশাসনের কোনো এক বিভাগে পড়ব। তবে সমাজ অনুষদ থেকে সাংবাদিকতায় এলাম। ছোট থেকে আবৃত্তি করি বলে এই শখ ও ভালোবাসা বিভাগটিতে পড়লে কাজে লাগানো যাবে বলে এখানেই চলে এলাম।’
আবৃত্তির প্রতি ভালোবাসা দিয়েছেন তাকে বাবা। প্রকাশ এক সময়ের থিয়েটারকর্মী। কবিতার প্রতি ভালোবাসা আছে। ভালো, শুদ্ধ করে উচ্চারণের ইচ্ছে খুব। কথা বলার ভঙ্গিটি সুন্দর। তার থেকে আবেগ, ভালোবাসা দিয়ে বলা, শুদ্ধ ও সাবলীল, আবেগময় উচ্চারণে কথা বলার ভঙ্গিতে আগ্রহ হলো একমাত্র সন্তানের। মেয়েকে শেখালেন কীভাবে আবৃত্তি করতে হয়। ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবৃত্তির সিডিগুলো প্রজ্ঞার ছোটবেলা থেকে সঙ্গী। ওপার বাংলার আবৃত্তিশিল্পী ব্রততী রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকুমার ও শঙ্খ ঘোষের কবিতার বিশিষ্ট আবৃত্তিকার। সেগুলো শুনেই আবৃত্তির প্রাথমিক পাঠ হয়েছে তার। সেই শেখা ও বাড়িতে বসে চর্চার ফলে তাদের কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে টানা তিনবার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়ে সবার সামনে নিজেকে সেরা প্রমাণ করেছেন।
মা হেলেন এই ভুবনে তার সবচেয়ে সহায়। নিজে মেয়ের মতো আবৃত্তির অনুষ্ঠান, সিডিগুলো শোনেন। সেগুলোতে কী বলা হলো মেয়েকে জানান, আবৃত্তিকারদের কৌশলগুলো আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানেও নিয়ে আসেন। প্রজ্ঞা বললেন, ‘মায়ের সাহায্য ছাড়া আবৃত্তিতে এগুতেই পারতাম না।’ এরপর জানালেন, ‘যা শিখেছি তা থেকে বলতে গেলে আবৃত্তিতে ভালো করতে চাইলে সবার আগে উচ্চারণে নজর দিতে হবে। কবিতা পড়লেই হলো না, বারবার ভালো করে পড়ে, আবৃত্তি করে উপলব্ধি করতে হবে ভেতরের ভাব, অনুভবও করতে হবে। কীভাবে আরও ভালো করা যায়, বোঝার চেষ্টা করতে হবে। ভালো করে শেখার জন্য সে জন্য স্কুল আছে।’ তাই ২০১৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষার পর বসে না থেকে ‘বোধন আবৃত্তি স্কুল’-এ ছয় মাসের বুনিয়াদি কোর্স করেছেন। সেই প্রশিক্ষণে শিখেছেন, ‘আগে মনে করতাম আবৃত্তি সম্পর্কে ভালো জানি, কিন্তু বোধনে এসে অনেক কিছু শিখেছি। নতুন যারা আবৃত্তি শিখতে চায়, তারা এ ধরনের কোর্স করলে মূল বিষয়গুলো যেমন উচ্চারণ, শুদ্ধ করে প্রমিত ভাষায় কথা বলা, মাইক্রোফোনের ব্যবহার ও উপস্থাপনা শিখতে পারবে।’ মনোযোগ দিয়ে শিখেছেন বলে কোর্স সমাপনী পরীক্ষায় পঞ্চম হয়েছেন। বোধনের শিক্ষক মাইল আযম চৌধুরীর বোধ, প্রকাশভঙ্গি, অনুপ্রেরণায় তাতে জড়িয়ে আছেন। বোধন থেকে তার মঞ্চের জীবন শুরু। তাদের হয়ে নানা অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করেন বছর দুই ধরে। নতুনদের বলেন, ‘আবৃত্তিতে ভালো করতে বেশি বেশি কবিতা পড়তেই হবে। অনেকেই পড়েন, কিন্তু মাহাত্ম্য বা ভেতরের অনুভূতি উপলব্ধি করতে চান না। আর উচ্চারণ, স্বরের নামা-ওঠা, আবেগের দিকে নজর দিতে হয়। তারা আবৃত্তিতে চর্চার ওপর অনেক গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবৃত্তি সংগঠন ‘চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় আবৃত্তি মঞ্চ’, অনেক সুনাম আছে। এবারও তারা আয়োজন করেছিলেন ‘শ্রাবন্তী সেন স্মরণে একক আবৃত্তি প্রতিযোগিতা-২০১৯’। এটি তাদের চতুর্থ আয়োজন। স্লোগান ‘শাশ্বত সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান কবিতা।’ প্রতিযোগিতার বিষয়Ñ ‘বাংলাদেশ (ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, প্রকৃতি ও দেশপ্রেম)’। প্রতিযোগিতার জন্য ৫০ টাকা ফেইসবুকে ও ওয়েবসাইটে শেষদিন রাতে রেজিস্ট্রেশন করলেন প্রজ্ঞা। আগে গলায় তোলা ছিল, চেনা কবিতাগুলো তাকে ভালো ফল করাবে জানতেন। প্রতিযোগিতার আগের দিন বাসায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা টানা অনুশীলন করলেন। পরদিন ১২ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের একটি কক্ষে সকাল ১১টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত বাছাই হলো। বাছাই পর্বে প্রিয় কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ আবৃত্তি করলেন। এরপর ১৪ জুলাই কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার মিলনায়তনে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত মূল প্রতিযোগিতা হলো। ৩২ জনের একজন ছিলেন তিনি। প্রিয় ক্যাম্পাসের মঞ্চে প্রথম আবৃত্তিতে কেমন লাগছিল? প্রজ্ঞা বললেন, ‘বিচারকদের সামনে আবৃত্তি করতে একটু বিচলিত হয়েছিলাম। তবে নিজের সেরা চেষ্টা করেছি। আত্মবিশ্বাস থাকলেও বিশ্বাসই করতে পারিনি প্রথম হব।’ এরপর বললেন, বিচারকরা একটি কবিতা আবৃত্তি করতে বলেছিলেন। বাতাসে লাশের গন্ধ আবৃত্তি করা কঠিন। তারা আমার আবৃত্তিতে খুব খুশি হয়েছিলেন।’ ‘কোন বিষয়ে খেয়াল রেখেছেন?’ ‘সবসময় খেয়াল রাখি যা পড়ছি, বলছি, জানাচ্ছি; দর্শকরা যেন বুঝতে পারেন। উচ্চারণ, স্বরের নামা-ওঠা, টান এসব তো খেয়াল করতেই হয়। ভালো আবৃত্তি করতে কবিতার বোধ, অনুরাগ, কবির মনের ভাব ও দর্শকের সঙ্গে বোধের কবিতাটিকে মিলিয়ে দিতে হয়। কারণ আবৃত্তিকার কবির হয়ে শব্দে পাঠকের সামনে নানা দৃশ্য ও কবির কল্পনা তুলে ধরেন।’ ভবিষ্যত কী? ‘দেশের প্রতিষ্ঠিত আবৃত্তিশিল্পী হতে চাই। এজন্য জানি অনেক চর্চা করতে হবে। সাংবাদিকতার ছাত্রী হিসেবে এই বিষয়টি ভালো করে পড়তে চাই ও ভবিষ্যতে গণমাধ্যমকর্মী হতে চাই।’
তবে তার দুঃখ, ‘আবৃত্তির চর্চাকে এখনো আমাদের দেশে ভালো চোখে দেখা হয় না। পড়ালেখায় সবাই খুব গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি যে আরও কিছু করতে হবে, সেটি ভালোভাবে নেওয়ার ইচ্ছে এখনো সবার দেখি না।’ ‘মেয়ে হিসেবে আবৃত্তিতে কোনো বাধা?’ মা-বাবাসহ সবাই আমার আবৃত্তিকে ভালোভাবেই নেন। কাকা ভালো আবৃত্তিকার।’ এখনো তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আবৃত্তি ছড়ায়নি বুঝেছেন প্রজ্ঞা ‘সহপাঠীদের বলতে শুনি আবৃত্তি করে কী হবে? কেন করি? আমার সহ-আবৃত্তিকারদের অনেকেই বলেন, নানা বাধা ও প্রশ্ন পেরিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছেন।
মেয়েরা বলেছেন, তাদের আবৃত্তি চর্চা মা-বাবা, সমাজ ও পরিবার ভালোভাবে নেন না। অনুষ্ঠানের আগের দিন অনেক সময়ই সবাইকে রাত ৯টা-১০টা পর্যন্ত অনুশীলন করতে হয়। ছেলেদের সমস্যা না হলেও অনেক পরিবারই মেয়েদের এত রাত পর্যন্ত ঘরের বাইরে থাকতে দিতে রাজি নন। তারপরও তারা ভালোবেসে আবৃত্তিতে আছেন।’ প্রজ্ঞার আরও দুঃখ হয়Ñ অন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোর মতো আবৃত্তিতে তেমন দর্শক থাকেন না, নাচ-গানের মতো জমাট হয় না। তারপরও আলাদা দর্শক ও শ্রোতা আছেন তাদের। মা-বাবারা তার অভিভাবকদের মতো ছেলেমেয়েদের আবৃত্তির স্কুলে ভর্তি করাচ্ছেন। চট্টগ্রামে আবৃত্তির ভালো একটি স্কুলও আছে, নতুন হচ্ছেও। তাতে চর্চা ও ভালো আবৃত্তিকারের জন্ম হচ্ছে ।
আবৃত্তির পাশাপাশি প্রজ্ঞা গানও গান। ছয় বছর ধরে গাইছেন। উচ্চাঙ্গ ও রবীন্দ্রসংগীত শিখছেনও। বললেন, ‘গান আমাদের পরিবারেই আছে। এক দিদি খুব ভালো গান করেন। তার কাছেই হাতেখড়ি। ভালোবাসি বলে কবিতার মতো ভালোবেসেই গান করি। গান আবৃত্তিতে নানাভাবে সাহায্য করে। গানের টোন, স্বর ওঠা-নামা আবৃত্তিতে কাজে লাগাতে পারি। ফলে সহজে ভালো আবৃত্তিকার হতে পারছি।’ শুধু আবৃত্তি করে, গান না গেয়ে সাফল্যটি পাওয়া সম্ভব হতো? প্রজ্ঞার উত্তর, ‘যে কোনো কাজ মনোযোগ দিয়ে বেশি বেশি চর্চা করলে অবশ্যই ভালো করা যায়। সেভাবে আবৃত্তিতেও ভালো করতে পারতাম। তবে আরও অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হতো।’
বলাই হয়নি, তাদের চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় আবৃত্তি মঞ্চ ২৪ ও ২৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদে ‘৯ম আবৃত্তি উৎসব’ করেছে। সেটির নাম দিয়েছেন তারা ‘পতিত মানবতায় আবৃত্তির আবাদ’। সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে চলেছে বিকাল পাঁচটা। সবার জন্য উন্মুক্ত উৎসব ছিল। শহরের ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২শ আবৃত্তিকার অংশ নিয়েছেন। উদ্বোধন করেছেন বিখ্যাত সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। আরও ছিলেন বিখ্যাত আবৃত্তিকার, অভিনেতা জয়ন্ত চট্টোপ্যাধ্যায়। প্রথম দিন প্রজ্ঞাকে একক আবৃত্তি প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কারের ক্রেস্ট তুলে দিয়েছেন সেলিনা হোসেন।
পরে বাংলাদেশের এই বিখ্যাত সাহিত্যিক জানিয়েছেন, ‘কবিতাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে আবৃত্তিকার আবৃত্তি করেন। মানুষের মধ্যে শিল্পবোধ গড়ে তোলেন। এই ধরনের অনুষ্ঠানে আবৃত্তিকে ছড়িয়ে দেওয়া সহজ হয়। আবৃত্তির ভালো ভবিষ্যতের জন্য বেশি বেশি সংগঠন ও আয়োজন করতে হবে। তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। তাদের মা-বাবাকে আরও সচেতন এবং মেয়েদের এই অনুষ্ঠানগুলোতে অংশ নিতে উৎসাহ দিতে হবে। দেশের সব জায়গায় আবৃত্তি সংগঠন হলে তাতে এই শিল্পের খুব উন্নয়ন হবে। অনেক শ্রোতা-দর্শক আসবেন।’
